একুশের গল্প: বাংলা মিস

প্রথম প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ১, ২০১৮ সময়ঃ ২:০৯ পূর্বাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ২:০৯ পূর্বাহ্ণ

ব্যস্ত নগরী ঢাকায় নতুন এসেছে জেসমিন, একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের বাংলার শিক্ষক হয়ে। আনুষ্ঠানিক শিক্ষকতা পেশার শুরু এখান থেকেই। প্রথমদিন তাই বেশ অস্বস্তিতে আছে। সেখানকার ছেলেমেয়েরা কেমন তা নিয়ে বেশ দু:চিন্তায় আছেন তিনি। অফিসের প্রথম দিনকার নিয়ম কানুন সব বুঝিয়ে তারপর এলো শিক্ষকদের বসার রুমে। সবার কৌতূহলী চোখ জেসমিনের দিকে। কেউ জানতে চায় কোথা থেকে এল, কেউ বলে কোথা থেকে পড়েছো, আবার কারো প্রশ্ন নিজ শহর ছেড়ে কেন এত দূরে এল? জেসমিনের স্বামী ঢাকা শহরের একটি ব্যাংকে চাকরী করে; তাই এই অচেনা অজানা শহরে তার পা রাখা।

জেসমিন শিক্ষকতা পেশায় একেবারে নতুন আর অনভিজ্ঞ। তাই এখানকার শিক্ষকদের নানান পরামর্শ খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো। ইংরেজির শিক্ষক রুজানা। ভালোভাবে বাংলায় কথা বলতে পারেন না। তবুও বাংলার শিক্ষক বলে বাংলায় কথা বলবার চেষ্টা করেছেন, “শুনুন মিস জেসমিন আপনি নতুন বলে বলছি; এই বড়লোকের ছেলেপুলেগুলো টুমাছ আদর পেয়ে বাদর হয়ে গেছে। তাই আই উইল রিকুয়েস্ট ইউ প্লিজ এদের সাথে পারসোনালিটি রেখে কথা বলবেন।

এরই মধ্যে জেসমিন মিসের বাংলা ক্লাসের সময় হয়ে গেছে। চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের পড়াতে হবে। কোনদিকে যেতে হবে জেনে নিয়ে ক্লাস শুরুর পাঁচ মিনিট আগেই দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। দরজার ওপরের অংশে গ্লাস লাগানো; নিচের অংশ কাঠের। জেসমিন মিস বাইরে থেকে ক্লাসের টিচারের পড়ানো দেখছে; আর ছাত্রছাত্রীরা মহা উৎসাহে জেসমিন মিসের দিকে তাকিয়ে হাসছে আর কী যেন বলাবলি করছে। মাথামুন্ডু কিছুই শোনা যাচ্ছে না। ক্লাসের ভেতরের মিস বিষয়টি দেখতে পেয়ে ওদের সবাইকে একটা ধমক দিলো। সবাই হোহো করে হেসে উঠলো। বাইরে থেকে এ দৃশ্য দেখে জেসমিন মিস বেশ বিরক্ত হলেন। আচ্ছা ওদের হাসার মতো কী হলো বুঝলাম না। চিটার দিল ঝাড়ি আর ওরা কিনা হেসেই যাচ্ছে! আল্লাহ ভালো জানে কাদের পড়াতে এলাম। ইংরেজির মিসটা দেখছি মিথ্যা বলেনি। সামলাবো কী করে কে জানে! টংটংটং করে ঘন্টা বেজে উঠলো। জেসমিন মিসের মনে হল তার হার্টবিট বেড়ে গেছে। ধুকুধুক ধুকধুক…

ক্লাসের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন মিস আনিকা। বললেন, মিস আপনিতো বাংলার নতুন টিচার।
জেসমিন মিস: জি
আনিকা: গুড লাক
জেসমিন মিস: ধন্যবাদ
জেসমিন মিস আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে একটি ইংরেজি কথাও বলবে না। যেহেতু তিনি বাংলার শিক্ষক তাই একথা মেনে চলবেন কঠোরভাবে। ক্লাসের ভেতরে ঢুকতেই ছেলেমেয়েরা হাসতে হাসতে বলে উঠে, গুড মর্নিং মিস…

টেবিলে ব্যাগ, ডেইলি প্ল্যানার রেখে প্রতমে নিজের পরিচয় দিলেন, “আমি জেসমিন। তোমাদের বাংলার শিক্ষক”।
এদিকে ছেলেমেয়েরা সবাই একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে বলে,“ভাং..লার শিক্ষক”!
জেসমিন মিস ওদের বাঁকা কথার জবাবে দৃঢ়ভাবে বললো, “এটাকে ভাংলা বলে না বাংলা বলে”!
স্টুডেন্টরা: অবিয়াসলি মিস। এই বলে আবারও হাসির রোল, চোখাচুখি।
জেসমিন মিস: তোমরা কোন ক্লাসে যেন পড়?
স্টুডেন্টরা: ফোর প্লাস মিস। আবারও হাসির রোল।
জেসমিন মিস বেশ হাড়েহাড়ে টের পেয়ে গেছে কাদের পড়াতে এসেছে! কিন্তু তার সাথে যে আচরণ করছে এরকম আচরণ কি সব নতুন টিচারের সাথে করে নাকি তার সাথেই করছে? এবার জেসমিন মিস বললো, “তোমরাতো দেখছি বেশ সুন্দর করে হাসতে পারো! বাহ্ খুব ভালো। আমিও যখন তোমাদের মতো ছোটো ছিলাম তখন এরকম মজা করতাম। সত্যিই খুব মজার। নতুন শিক্ষকদের সাথে করলে সবচেয়ে মজা লাগতো। যেমন তোমাদের মজা লাগছে”।
এবার ক্লাসের একটি ছাত্র বেশ অবাক হয়ে বলে উঠলো, “মিস আপনিও করতেন”!
একথা শুনে জেসমিন মিসের মনে হল মাছ বড়শিতে আসার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। তিনি হেসে বললেন, “হ্যাঁ করতাম। আরে তোমরা যে দুষ্টুমি করছো তা তো কিছুই না। আমি ছিলাম মহা দুষ্টু”।
এবার আরেকটি ছাত্র বললো, “মিস কী ধরণের দুষ্টুমি করতেন”?
কথাটা শুনে জেসমিন মিসের মনে মনে বেশ হাসি এল। বুঝলো, মাছ একেবারে কাছে এসেছে। শুধু খাবারটা মুখে দিলেই টুক করে ধরে ফেরবে। তারপর বললো,“কী আর বলবো, টিচারের সামনে দেখাতাম ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানি না। সরে-অ ভদ্র টাইপ। যা বলতেন শুধু মাথা নেড়ে বলতাম, “জি ঠিক বলেছেন”। আমরাতো পড়াশোনা করেছি বাংলা মিডিয়ামে। একটু এদিক সেদিক হলেই এ্যাং ছ্যাচা ব্যাং।
বেশ কয়েকজন একসাথে চ্যাঁচিয়ে উঠে, “মিস এ্যাং ছ্যাচা ব্যাং মানে কী”?
জেসমিন মিস: দশটাকা দিয়ে কতগুলো বেত পাওয়া যেতো। ঐ চিকন বেতগুলো দিয়ে একটু মারলেও ব্যথা বেশি লাগতো। আমরা উল্টাপাল্টা কিছু করলে ঐ চিকন বেতগুলো দিয়ে ইচ্ছেমতো মারতো; হাতের তালুতে, পিঠে যেকানে খুশি সেখানেই।
ছাত্রছাত্রীরা একসাথে বলে: মিস বাংলা মিডিয়ামে এভাবে মারতে পারে কিন্তু ইংরেজি মিডিয়ামের ছেলেমেয়েকে কখনওই এভাবে মারতে পারে না।
জেসমিন মিস: ঠিক বলেছো। মার খেয়েছি বলেইতো মনোযোগ দিয়ে পড়া শিখতে বাধ্য ছিলাম। আর পড়া শিখেছি বলেই আজ তোমাদের শিক্ষক হয়ে পড়াতে এসেছি। সেদিন শিক্ষকরা না মারলে হয়তো শুধু দুষ্টুমিতেই ব্যস্ত থাকতাম। পড়ালেখা আর হতো না।
টংটংটং করে ঘন্টা বেজে উঠলো। সবাইকে সেদিনের মতো বিদায় জানিয়ে ক্লাস থেকে বের হয়ে এল জেসমিন মিস। টিফিন আওয়ার হওয়াই ক্যান্টিনে গেলেন খাবার খেতে। খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছেন কোন খাবারটা খাওয়া যায়। ইতোমধ্যে পিঁপড়ার মতো হুড়হুড় করে সব ছেলেমেয়েরা এল টিফিনের সন্ধানে। পেছন থেকে একটা ছাত্র বললো, “মিস আপনি আমাদের সাথে বসে খাবেন”?
জেসমিন মিসের তড়িৎ জবাব, “অবশ্যই”। এই বলে বিশ টাকা দিয়ে দুটো ডিমের চপ কিনে ওদের বাসে গিয়ে বসলেন। এই কথা সেই কথা কথা যেন আর ফুরায় না। সবার চোখেমুখে হাজারো কৌতূহল, প্রশ্নেরও শেষ নেই। তবে জেসমিন হাসিমুখে সব কথার জবাব দিয়ে যাচ্ছেন একে একে। আবারও বেজে উঠলো ঘন্টা ডংডংডং। সবাই মিসকে বিদায় দিয়ে দৌঁড়ে ক্লাসে চলে যায়। এদিকে টিফিন বিক্রেতা জেসমিন মিসকে বলে, “মিস আপনাকেতো আগে দেখিনি। নতুন মনে হচ্ছে। তবে যাই বলেন বাচ্চাদের অবস্থা দেখে পুরোনোই মনে হচ্ছে”।
মিস মুচকি হেসে বলে,“ঠিক বলেছেন আজই যোগ দিলাম বাংলার শিক্ষক হিসেবে। আর বাচ্চাদের কথা বলছিলেন না, ওরাতো ছোট; একটু আদর পেলে ছুটে আসে”।
বলেই জেসমিন মিস শিক্ষকদের রুমের দিকে চলে গেল। রুমে ঢুকতেই সব টিচারের এক কথা, “কী খবর মিস, বাচ্চারা কেমন বিরক্ত করলো”?
জেসমিন মিস: ওদের দেখে মনে হল বাসা থেকে তেমন কোনো খেয়াল রাখে না। ওদের সাথে বাবা-মা সময় কাটায় না। এটাই মূল সমস্যা? স্কুলের উপর নির্ভর করেতো বাচ্চা মানুষ করা যাবে না।
রুমের শিক্ষকরা: ওরাতো মনে করে লাখ টাকা খরচ করে এখানে পড়াচ্ছি। তাই সব দায় স্কুলের টিচারদের।

সেদিনের মতো আবারও কেঁপে উঠলো বাতাস ডংডংডং শব্দে। জেসমিন মিস বাসায় যাওয়ার জন্য বের হতেই গেইটে দেখে সারি সারি কার অপেক্ষা করছে। কোনোটা ছাত্রদের, হয়তো কোনোটা শিক্ষকদের। এত এত কার’কে পাশ কাটিয়ে রিকশা খোঁজার জন্য একটু সামনে চলে গেলেন। একটা দেখতেই, “এই রিকশা যাবে”। প্রথমদিনের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা খুব একটা খারাপ মনে হচ্ছে না তার। যদিও বাচ্চারা একটু ঝামেলা পাকানোর চেষ্টা করেছিলো। তবে শেষ পর্যন্ত তা আর হল না। এভাবে প্রতিদিন চলছে শিক্ষকতার ব্যস্ততা। বাংলার শিক্ষক হিসেবে ইংরেজি শব্দ এড়িয়ে গিয়ে সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় এখনও পর্যন্ত কথা বলে চলেছেন জেসমিন। ধীরে ধীরে ক্লাসের সম্পূর্ণ পরিবেশ বাংলা বান্ধব করে তুললেন।

‘গুড মর্নিং’ না বলে সবাই এখন বলছে ‘শুভ সকাল’। বাই বাই মিস না বলে, ‘বিদায় মিস। আবার দেখা হবে’ বলছে। পরিস্থিতি বেশ কিছুটা জেসমিসের নিয়ন্ত্রণে। এমনই এক সকালে প্রথম ক্লাসটা ছিল বাংলা। জেসমিন মিস শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করতেই ছেলেমেয়েরা দাঁড়িয়ে ‘শুভ সকাল মিস। কেমন আছেন মিস’? কদিন আগেও এরা টিচার ক্লাসে ঢুকলে বসে বসে বলতো, ‘গুড মর্নিং’। আজ নতুন একটা বাঙালি মেয়ে এসেছে দেশের বাইরে থেকে। থাকতো যুক্তরাজ্যে(ইংল্যান্ড)। বাবার ব্যবসার কারণে তাদের আবারও দেশে ফিরতে হলো।

তাকে এদেশ কেমন লাগছে একথা বলতেই বিরক্ত কন্ঠে বলে, “দিস ইজ ডাস্টি কান্ট্রি। ভেরি নেস্টি এ্যানভাইরনমেন্ট। আই হেইট বাংলাদেশ”। কথাটা শুনে বাংলা মিসের বেশ কষ্ট লাগলো। তবুও তিনি রেগে না গিয়ে বললো, “তাই”। এবার সবার উদ্দেশ্যে বললো, “আচ্ছা বলতো দেখি তোমাদের আম্মু যদি দেখতে খুব বিচ্ছিরি হতো তাহলে কি তোমরা ঘৃণা করতে? বলতে পারতে, “আই হেইট ইউ আম্মু”? বেশ কয়েকজন চিৎকার করে বলে, “কী বলছেন মিস উনি আমার আম্মু। সুন্দর দিয়ে কী হবে”?
আরেকজন বলে, “আম্মুকে কি আই হেইট ইউ বলা যায়”?

জবাবে মিসের পাল্টা প্রশ্ন, “কেন বলা যাবে না? বিচ্ছিরি হলেতো বলতেই পারো”!
জারিফ নামের একটি ছেলে বেশ রেগে গিয়ে বলে,“অসম্ভব মিস উনি আমাদের আম্মু। আমাদের জন্ম দিয়েছেন”।
জেসমিন এতক্ষণে আসল উত্তরটা ওদের মুখ থেকে বের করতে পেরে বেজায় খুশি। তারপর বলে,“ঠিক তাই। আম্মু আমাদের জন্ম দিয়েছেন, কত কষ্ট করে বড় করছেন; এজন্যই তিনি বিশ্রি হলেও আমরা তাকে ভালবাসবো। এদেশটাতে যেহেতু আমাদের আম্মুরা জন্মেছে, আমরা জন্মেছি, তোমরা জন্মেছো। সেজন্যই এদেশটাও ঠিক আমাদের মায়ের মতো। আমাদের দ্বিতীয় মা। তাই যত বিশ্রিই হোক না কেন আমরা ঘৃণা করতে পারি না। ‘ডাস্টি নেস্টি’ বলতে পারি না। তাহলে এদেশও আমাদের মায়ের মতো কষ্ট পাবে”।
কথাগুলো শুনে ইংল্যান্ড থেকে আসা নতুন মেয়েটি বলে, “সরি মিস। আর বলবো না”।
জেসমিন মিস খুব স্বাভাবিকভাবেই নতুন মেয়েটিই মাথায় হাত রেখে বলে,“আমরা ইংরেজি মাধ্যমে পড়বো বিদেশে যাওয়ার জন্য; এটা দোষের কিছু না। ঐ দেশে থেকে যেতে চাও তাও ঠিক আছে। শুধু বুকের মধ্যে বাংলাদেশের পতাকাটা এঁকে নেবে। কোনোদিন এদেশকে ভুলে যাবে না। এ ভাষাকে কখনও অসম্মান করবে না। তাহলেই এদেশ খুব খুশি হয়ে যাবে। তোমাদের হয়তো মুখে বলতে পারবে না। তবে একটু খেয়াল করে দেখলে বুঝতে পারবে কত খুশি হবে আমাদের এই ‘দ্বিতীয় মা’। আর যদি পারো এই ডাস্টি দেশটাকে ক্লিন করার ব্যবস্থা কোরো। নিজের রক্তকে কি কেউ কখনও ভুলে যেতে পারে? এদেশ আমাদের। এই মাটিতেই আমরা খেলেছি, কত দুষ্টুমি করেছি। তাকেতো নেস্টি না বলে আমাদেরই একে সুন্দর করে তুলতে হবে; যার যতটুকু সামর্থ ততটুকু”।

সেদিন থেকে জেসমিন মিসের ক্লাসে আর কখনও ‘হেউট দিজ কান্ট্রি, ডাস্টি, নেস্টি’ শব্দগুলো শুনতে হয়নি। জেসমিন মিস মনে মনে বিড়বিড় করে বলে, “এই বাচ্চাদের কোনো ভুল নেই, কোনো দোষ নেই। তাদের কেউ এভাবে বোঝাতে যায়নি। না ঘরে না স্কুলে। শুধু আদর দিয়ে, ইচ্ছেমতো খেলতে দিয়ে আর অনবরত পড়ালেই কিছুতেই হবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের মনের জন্য নৈতিক শিক্ষার বন্দবস্ত করা না হবে, ততক্ষণ এই বাচ্চারা শুধু বেড়ে উঠবে। তবে মনের দিক থেকে নয় দেহের দিক থেকে। অনেকটা রোবটের মতো।

 

 

আরো সংবাদঃ

মন্তব্য করুনঃ

পাঠকের মন্তব্য

0cc0