মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হাওরের কান্না শুনতে পাচ্ছেন কি?

প্রকাশঃ এপ্রিল ১৯, ২০১৭ সময়ঃ ১২:০৪ পূর্বাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৯:৪৮ পূর্বাহ্ণ

গোলাম রসূল:

বৈশাখ মাস এসেছে দিন কয়েক হল। এসময়টা হাওর এলাকার মানুষের জন্য ব্যাপক উৎসবের। কারণ তাদের সারা বছরের খোরাক বা খাবারের ব্যবস্থা হয় এসময়ে; পাকা বোরো ধান কাটার মাধ্যমে। বৈশাখের এ সময়টার আনন্দ কৃষকের কাছে ঈদ, পূজা বা অন্য যেকোনো উৎসবের আনন্দের চেয়ে হাজারগুণ বেশি। কিন্তু এবার হাওরের মানুষের মনে সে আনন্দ নেই। আনন্দ থাকার কোনো কারণও নেই। কারণ প্রতি বৈশাখে ধান কেটে ফসল ঘরে তোলার মাধ্যমে তারা যে আনন্দ পান; পাহাড়ি ঢলের অকাল বন্যার পানি কৃষকদের সেই সোনার ফসল পানিতে ডুবিয়েছে। ফলে হাওর এলাকার হাজার হাজার হেক্টর জমির আধাপাকা ও কাঁচা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। সর্বশান্ত হয়ে গেছে অনেক গরিব কৃষক। বিশেষ করে বর্গাচাষীরা। সারা বছরের খোরাক হারানোর পাশাপাশি মাথার উপর চেপে আছে ব্যাংক ও মহাজনের চক্রবৃদ্ধি সুদ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে ঈশ্বর যেন বাস করে উজান এলাকায়, এই চির অবহেলিত পিছিয়ে পড়া হাওরের বিশাল জনপদে তাঁকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলবীবাজার-এই জেলাগুলোর সমন্বয়ে হাওর জনপদ গড়ে উঠেছে। দেশের সবচেয়ে নিম্নাঞ্চল হওয়ায় সারা বছরে একটি মাত্র ফসল হয় হাওরে। আর সেটি হল বোরো ধান। দেশের বোরো ধানের সিংহভাগ উৎপাদন হয় এই বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে। সেকথা বিবেচনা করেই সরকার হাওরের ফসল রক্ষার জন্য কয়েকটি স্থানীয় নদী ও খালের সাথে সমন্বয় করে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। কিছু কিছু বাঁধ নির্মিতও হয়েছে। আবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কতিপয় অসৎ, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের কারণে বাঁধ নির্মিত হয়নি। হাওর সুরক্ষার টাকা তারা লুটপাট করে নিজেদের বউ-ছেলেমেয়ে নিয়ে মহা আনন্দে মেতে আছে। আর তাদের অবহেলা ও চুরির কারণে আজ হাওরের লাখো মানুষের বুক ফাটা কান্না।

আশার কথা হল সরকার সুনামগঞ্জ থেকে পাউবোর প্রধান ইঞ্জিনিয়ারকে প্রত্যাহার করেছে। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবে। আমরা আশায় আছি তিনিসহ জড়িত সবার বিচার হবে খুব শীঘ্রই।

হাওরের অকাল বন্যার পানিতে ফসল তলিয়ে যাবার কথা শোনার সাথে সাথে ঢাকা থেকে সেখানে ছুটে গিয়েছেন কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ রেজওয়ান আহমেদ তৌফিক ভাই। তিনি টানা কয়েকদিন অস্টগ্রাম, মিঠামইন ও ইটনা উপজেলার হাওরে ঘুরে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের সাথে কথা বলেছেন। তাদেরকে আশ্বস্ত করেছেন সরকারের কাছে তাদের এ দুরবস্থার প্রতিকার চায়বেন। তিনি ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরীকে সাথে নিয়ে পুনরায় হাওরের দুর্দশার চিত্র প্রত্যক্ষ করেন।

পরে কিশোরগঞ্জ প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলন করে হাওর এলাকাকে দুর্গত হিসেবে ঘোষণার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানান। যে দাবি হাওরের বিশেষ করে অষ্টগ্রামের তরুণ ও সচেতন সমাজ অকাল বন্যার শুরু থেকেই করে আসছিল।

আমার বাবাও একজন কৃষক। আমি নিজে স্কুল পড়াকালীন কৃষিকাজ করেছি বাবার সাথে। সুতরাং কৃষকের কষ্ট আমি উপলদ্ধি করতে পারি। হাওরের সন্তান হিসেবে আমি ব্যক্তিগতভাবে সাংসদ রেজওয়ান আহমেদ তৌফিক ভাইকে ধন্যবাদ জানাই উনার তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের জন্য। এ ঘটনার দ্বারা তৌফিক ভাই প্রমাণ করেছেন তিনি হাওরের মানুষকে কতটা ভালবাসেন। যে ভালবাসা তিনি তাদের কাছ থেকে পেয়ে আজকে সাংসদ হয়েছেন; হয়েছেন সবার নিকট বরণীয়।

হাওরের অকাল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা পরিদর্শন করার জন্য মহামান্য রাস্ট্রপতি মো.আব্দুল হামিদ বিগত ১৬ এপ্রিল কিশোরগঞ্জের মিঠামইন ও তার পরেরদিন ১৭ এপ্রিল সুনামগঞ্জ গিয়েছিলেন। হাওর পরিদর্শনে গিয়ে তিনি বলেছেন, এমন ক্ষয়ক্ষতি তিনি জীবনেও দেখেননি। কৃষকদের আশ্বস্ত করেছেন; তাদের জন্য যা যা করার দরকার তার সবই তিনি করবেন এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছে হাওরের চিত্র তুলে ধরে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের জন্য সুব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানাবেন।

আমি আশা করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিবেন। কৃষকদের কল্যাণে এমন সব কাজ করবেন যেন হাওরের মানুষের মুখে আবার হাসি ফুটে ওঠে। তারা যেন সারাবছর দুবেলা খেয়েপড়ে ছেলেমেয়ে নিয়ে সুখে দিনাতিপাত করতে পারে।

 

লেখক: সাংবাদিক, হাওরের সন্তান।

 

বি:দ্র:  প্রতিক্ষণের যেকোনো লেখা অনুমতি ব্যতিত কোথাও প্রকাশ বা প্রচার করা যাবে না। এটি কপি রাইট আইনে দন্ডনীয় অপরাধ।

 

আরো সংবাদঃ

মন্তব্য করুনঃ

পাঠকের মন্তব্য



আর্কাইভ

আগষ্ট ২০১৭
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« জুলাই    
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
0cc0