টিনেজারদের সেলফি ক্রেজ

প্রথম প্রকাশঃ নভেম্বর ৬, ২০১৫ সময়ঃ ১১:১৮ পূর্বাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১১:১৮ পূর্বাহ্ণ

প্রতিক্ষণ ডেস্ক

selfieএ যুগের এমন কোনো ছেলেমেয়েকে খুঁজে পাওয়া যাবে না যে কিনা সেলফি’র সঙ্গে পরিচিত নয়। ক্যামেরা বা মোবাইল ফোনে নিজের ছবি নিজে তুলে সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটে আপলোড করা ছবিকেই সেলফি বলে। মোবাইল ফোনের কল্যাণে বছর দুয়েক আগে সেলফির জনপ্রিয়তা শুরু। যা আজকের সময়ে পৌছে রূপান্তরিত হয়েছে ক্রেজে।

সববয়সী মানুষের মাঝে জনপ্রিয়তা পেলেও সেলফি জ্বরে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত টিনেজাররাই। সারাবিশ্বের মতোই আমাদের দেশের নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের মাঝেও এখন চলছে সেলফি তোলার প্রতিযোগিতা। অনেকের কাছে তো এখন স্মার্টনেসের মাপকাঠি হয়ে ওঠেছে সেলফি পোস্ট করা। ফেসবুকে কেউ সেলফি পোস্ট না করলে তাকে ধরা হয় ‘খেত’।যে যতো বেশি সেলফি ফেসবুকে পোস্ট দিবে বন্ধুদের কাছে সে নাকি ততো বেশি আধুনিক!

টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে, ঈদের সেলামি জমিয়ে টিনেজারদের এখন একটি স্মার্টফোন কেনা চাই-ই চাই। এরপর শুরু হয় সেলফি প্রতিযোগিতায় ঝাঁপিয়ে পড়া। বাইরে খাওয়া, আড্ডা আর ঘোরাফেরা সবখানেই সেলফি তোলা চাই। নিজেদের কাটানো সুন্দর সময়টার সেলফি তুলে দেখানো চাই ফেসবুকে।

অনেক সময় অবশ্য দলবলে সেলফি তোলায় বাদ সাধে দূরত্ব। নিজেদের হাত দিয়ে মুঠোফোনের ক্যামেরা আর কতটা দূরেই নেওয়া যায়। হাত যতটুকু যাচ্ছে, তাতে ঠিকঠাক সবাইকে এক ফ্রেমে আনাও এক যুদ্ধ। এরপর দেখা যায় হয়তো কারও হাত নেই, কারও বা মুখের একাংশ বাদ পড়েছে।

সম্প্রতি মুক্তি মিলেছে এই ঝামেলা থেকেও। এখনকার সেলফিপ্রেমী তরুণদের হাতে দেখা যাচ্ছে বিশেষ একটা চকচকে লাঠি। যে লাঠি দিয়ে সহজেই সেলফি তোলা যাচ্ছে কোনো ধরনের ঝামেলা ছাড়াই। ‘সেলফি স্টিক’ নামের এই অনুষঙ্গটি এরই মধ্যে জনপ্রিয়তাও পেয়েছে। ইলেকট্রনিকস পণ্যের বিভিন্ন বাজার ও অনলাইন কেনাকাটার শপে এখন ধুম বেচাকেনা চলছে সেলফি স্টিকের। আর এই সেলফি স্টিকের বেশিরভাগ ক্রেতাই হলো টিনেজার।

টেক-জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান গুগলের এক জরিপে জানা গেছে, সোস্যাল মিডিয়া পোস্ট করা সেলফির মধ্যে ৩৭% আপলোড করে থাকে ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সের ছেলেমেয়েরা, অর্থাৎ টিনেজাররা। গুগলের পর্যালচনায় দেখা যায়, উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে মোবাইল ফোনের অ্যাপসে যারা বিভিন্ন সোসাল মিডিয়ায় ৮ থেকে ১০ ঘন্টা কাটায় তারা গড়ে ১৪টি সেলফি পোস্ট করে থাকে।

selfie...2সেলফি ক্রেজে যখন আক্রান্ত সারাবিশ্ব, ঠিক এমনই সময় এলো হুশিয়ারি। আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন (এপিএ) সম্প্রতি ঘোষণা করেছে যে, সেলফি তোলা একটি মানসিক রোগ। এ ব্যধির নাম দেওয়া হয়েছে সেলফাইটিস (selfitis)। এই মানসিক রোগের চিকিৎসা পদ্ধতির কথা উল্লেখ না করলেও এর তিনটি অবস্থার কথা জানিয়েছে এপিএ।

বর্ডার লাইন সেলফাইটিস: দিনে অন্তত তিনটি সেলফি তোলা, তবে সোশাল মিডিয়াতে পোস্ট না করা।

আকিউট সেলফাইটিস: দিনে অন্তত তিনটি সেলফি তোলা এবং তিনটি ছবিই সোশাল মিডিয়াতে পোস্ট করা।

ক্রনিক সেলফাইটিস: নিয়ন্ত্রণহীন তাড়না বা আকাঙ্ক্ষা থেকে বিরামহীনভাবে যখন তখন সেলফি তোলা। দিনে ছয়বারের বেশি সোশাল মিডিয়াতে পোস্ট করা।

আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন (এপিএ) এটাও জানিয়েছে যে, ক্রনিক সেলফাইটিস আক্রান্তদের মধ্যে টিনেজারদের প্রাধান্য দেখা যায়। এপিএ’র এই ঘোষণার পর সেলফি মানসিক রোগ আকারে ছড়িয়ে পড়ছে কিনা তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে বিতর্ক চলছে।

সেলফি-ম্যানিয়া এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কেউ কেউ তো হাসপাতালের বেডে মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে সেলফি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করে লিখেন- ফিলিং পেইনড। সড়ক দুর্ঘটনায় কোনোরকমে বেঁচে গিয়ে ভাঙা গাড়ির সঙ্গে সেলফি তুলে লিখেন- ফিলিং ব্লেজড। পড়তে, লিখতে, হাঁটতে, খেলতে, রান্না করতে, কাজ করতে গিয়ে সেলফি তোলা তো একটা নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে আজকাল। অনেকে প্রতিদিন সেলফি আপলোড করে ফেসবুকের সামনে বসে থাকেন কয়জন লাইক এবং কমেন্ট করে তা গুণতে।কে কী কমেন্ট করল তা দেখতে, আর রিপ্লাই দিতে কেটে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কাছের মানুষদের কেউ কমেন্ট না করলে তো তার ওপর অভিমান, এমনকি ঝগড়াও হয়।

selfie...সেলফির কিছু উপকারিতাও আছে। যেমন: প্রতিদিন নিজের সেলফি তুলে চেহারা দেখে স্বাস্থ্য সচেতন থাকা যায়। তবে যারা সেলফি তোলেন তারা এই উপকারি দিকটার কথা ভাবেন কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দহ আছে। সাজগোজ করার পর তা ঠিক আছে কিনা তা সেলফি তুলে পরখ করে নেওয়া যায়। যেসব বন্ধু বা প্রিয় মানুষের সঙ্গে দেখা হয় না তাদের সেলফি দেখে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো সম্ভব।

সেলফির উপকারিতার চেয়ে বরং অপকারিতা বেশি চোখে পড়ে। গবেষকরা বলছেন, সেলফি তোলার এই অভ্যাস ভয়ঙ্কর বিপদজনক হতে পারে। মার্কিন গবেষকরা দাবি করেছেন, অতিরিক্ত সেলফি তোলার অভ্যাসের সঙ্গে মানসিক ব্যাধির সম্পর্ক থাকতে পারে। নিজের চেহারার প্রতি আকর্ষণ অনুভব করা মানসিক স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিতে পারে।
প্রতিক্ষণ/এডি/এআরকে

আরো সংবাদঃ

মন্তব্য করুনঃ

পাঠকের মন্তব্য

20G