থ্যালাসেমিয়া ঝুঁকিতে কারা বেশি? জানুন প্রতিরোধের উপায়

প্রকাশঃ মে ১৫, ২০২৬ সময়ঃ ১১:৪৫ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১১:৪৫ অপরাহ্ণ

বংশগত কারণে হওয়া থ্যালাসেমিয়া একটি দীর্ঘমেয়াদি রক্তরোগ, যা অনেক ক্ষেত্রেই সচেতনতা ও আগাম সতর্কতার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি এমন একটি “নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি”, যা প্রতিরোধ না করলে মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। রোগটি কেন হয় এবং কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়—এসব বিষয়ে মত দিয়েছেন রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ, বোন-ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট ফিজিশিয়ান এবং বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতির উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. এম এ খান।

থ্যালাসেমিয়া কী

অধ্যাপক ডা. এম এ খান জানান, থ্যালাসেমিয়া হলো এক ধরনের জিনগত রক্তরোগ, যেখানে শরীরে হিমোগ্লোবিন উৎপাদন স্বাভাবিকভাবে হয় না বা কমে যায়। অনেক সময় হিমোগ্লোবিন তৈরি হলেও তার গঠন স্বাভাবিক থাকে না—এ অবস্থাকে হিমোগ্লোবিনোপ্যাথি বলা হয়।

এই সমস্যা সাধারণত ১১ ও ১৬ নম্বর ক্রোমোজোমের জিনগত পরিবর্তনের কারণে দেখা দেয়। এর ফলে রক্তে অক্সিজেন পরিবহনের ক্ষমতা কমে যায় এবং লোহিত রক্তকণিকা সময়ের আগেই ভেঙে পড়ে। এতে ধীরে ধীরে রক্তশূন্যতা ও জন্ডিসের মতো সমস্যা দেখা দেয়।

বিশ্বে থ্যালাসেমিয়া অন্যতম বিস্তৃত জিনগত রোগ। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় হিমোগ্লোবিন-ই এবং হিমোগ্লোবিন-বিটা থ্যালাসেমিয়ার প্রকোপ বেশি। জাতীয় জরিপ-২০২৪ অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১১.৪ শতাংশ মানুষ থ্যালাসেমিয়ার বাহক, যার মধ্যে হিমোগ্লোবিন-ই বাহক সবচেয়ে বেশি।

থ্যালাসেমিয়া কারা ঝুঁকিতে

চিকিৎসকদের মতে, বাবা-মা দুজনেই যদি থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন, তাহলে সন্তানের মধ্যে রোগটি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ২৫ শতাংশ। আরও ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে সন্তান বাহক হিসেবে জন্ম নিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে সব সন্তানই আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।

দেশে বর্তমানে প্রায় ২ কোটি মানুষ থ্যালাসেমিয়ার বাহক এবং প্রতি বছর হাজার হাজার শিশু এই রোগ নিয়ে জন্ম নিচ্ছে বলে ধারণা করা হয়।

লক্ষণসমূহ

থ্যালাসেমিয়ার প্রধান উপসর্গগুলো সাধারণত শৈশবেই প্রকাশ পায়। যেমন—

  • মারাত্মক রক্তশূন্যতা (৬ মাস থেকে ১ বছরের মধ্যে বেশি দেখা যায়)
  • চোখ ও ত্বকে হলদে ভাব
  • প্লীহা বড় হয়ে পেট ফুলে যাওয়া
  • মুখমণ্ডলের গঠনে পরিবর্তন
  • শারীরিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়া
  • অতিরিক্ত আয়রন জমে গিয়ে লিভার, হার্ট ও হরমোন গ্রন্থির ক্ষতি

চিকিৎসা পদ্ধতি

থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা মূলত সহায়ক ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে।

নিয়মিত রক্ত সঞ্চালন: রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে রক্ত দেওয়া হয়, যাতে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ঠিক থাকে এবং স্বাভাবিক বৃদ্ধি বজায় থাকে।

আয়রন নিয়ন্ত্রণ চিকিৎসা: নিয়মিত রক্ত নেওয়ার ফলে শরীরে অতিরিক্ত আয়রন জমে যায়। এটি কমাতে ওষুধের মাধ্যমে আয়রন অপসারণ করা হয়, যা জটিলতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ওষুধভিত্তিক চিকিৎসা: কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ওষুধ ব্যবহার করে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কিছুটা বাড়ানো যায়, ফলে রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজনীয়তা কমে।

উন্নত চিকিৎসা: কিছু নতুন ওষুধ উন্নত দেশে ব্যবহার হচ্ছে, তবে উচ্চমূল্য ও সীমিত প্রাপ্যতার কারণে তা এখনো দেশে সহজলভ্য নয়।

নিরাময় চিকিৎসা

থ্যালাসেমিয়ার একমাত্র স্থায়ী সমাধান হলো বোন-ম্যারো বা স্টেম সেল প্রতিস্থাপন। তুলনামূলক কম বয়সী রোগীদের ক্ষেত্রে এই চিকিৎসায় সফলতার হার বেশি।

তবে উচ্চ ব্যয়, উপযুক্ত দাতা না পাওয়া এবং সীমিত চিকিৎসা সুবিধার কারণে এটি সবার জন্য সহজলভ্য নয়।

এছাড়া বাহকদের সাধারণত কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না; তারা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।

প্রতিরোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, থ্যালাসেমিয়া নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো প্রতিরোধ।

রোগটির বিস্তার বাড়ার পেছনে প্রধান কারণগুলো হলো—

  • রোগ সম্পর্কে অজ্ঞতা
  • দুই বাহকের মধ্যে বিবাহ
  • পারিবারিক বিয়ের প্রচলন

এ কারণে প্রতিরোধে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, যেমন—

  • নিয়মিত বাহক শনাক্তকরণ কর্মসূচি
  • বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা উৎসাহিত করা
  • গর্ভাবস্থায় আগাম স্ক্রিনিং নিশ্চিত করা
  • জেনেটিক পরামর্শ সেবা সম্প্রসারণ
  • ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি
  • শিক্ষাক্রমে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা

জীবনযাপন ও সতর্কতা

থ্যালাসেমিয়া রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসা ও যত্ন প্রয়োজন। অতিরিক্ত পরিশ্রম এড়িয়ে চলা এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা উচিত। তবে আয়রন নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্য গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ।

বাহকদের ক্ষেত্রে জীবনযাপন স্বাভাবিক থাকে এবং আলাদা চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ঝুঁকি কমাতে সচেতন থাকা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনসঙ্গী নির্বাচনে সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে পরবর্তী প্রজন্মে রোগের ঝুঁকি কমে।

থ্যালাসেমিয়া শুধু একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক চ্যালেঞ্জও। এর বিস্তার রোধে চিকিৎসক, সরকার, গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহার্য।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

মন্তব্য করুনঃ

পাঠকের মন্তব্য



আর্কাইভ

June 2026
SSMTWTF
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930 
20G