নতুন বাজেটে সবচেয়ে বেশি করের চাপে থাকতে পারেন যারা

প্রকাশঃ মে ৩০, ২০২৬ সময়ঃ ১১:২২ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১১:২২ অপরাহ্ণ

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে কেন্দ্র করে রাজস্ব আদায়ে কঠোর অবস্থানে যেতে পারে সরকার। বড় আকারের বাজেট বাস্তবায়ন, উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং ঋণের চাপ সামাল দিতে কর ও ভ্যাট ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

নীতিগত পরিকল্পনায় করজাল আরও বিস্তৃত করা, খুচরা ব্যবসায়ীদের করের আওতায় আনা, ব্যাংক লেনদেন পর্যবেক্ষণ জোরদার করা, বিলাসবহুল ব্যয়ে অতিরিক্ত কর আরোপ এবং ডিজিটাল কর ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মহল সতর্ক করে বলছে, রাজস্ব বাড়াতে গিয়ে অতিরিক্ত কর আরোপ করা হলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে গিয়ে মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে এবং ব্যবসার খরচও বৃদ্ধি পেতে পারে।

বাজেটের আকার ও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা

অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, আগামী বাজেটের সম্ভাব্য আকার দাঁড়াতে পারে প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

এই বিশাল ব্যয়ের জোগান দিতে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো ছাড়া বিকল্প কম বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা। এনবিআরের সম্ভাব্য রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হতে পারে ৬ লাখ কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে ভ্যাট থেকেই বড় অংশ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এত বড় বাজেট বাস্তবায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

করনীতিতে পরিবর্তনের পরিকল্পনা

সরকারের প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় রয়েছে—

  • করজাল সম্প্রসারণ
  • খুচরা ব্যবসাকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনা
  • ব্যাংক লেনদেনের ওপর নজরদারি বৃদ্ধি
  • বিলাসী ব্যয়ে নতুন করহার
  • অফশোর ঋণের সুদের ওপর কর পুনর্বহাল
  • ডিজিটাল কর আদায় ব্যবস্থার শক্তিশালীকরণ

এনবিআরের মতে, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে কর আদায় বাড়িয়ে রাজস্ব ঘাটতি কমানো সম্ভব হতে পারে।

ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ

ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বলছে, নতুন করের চাপ শিল্প ও বাণিজ্য খাতে ব্যয় বাড়াবে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে।

অনলাইন বাণিজ্যে ভ্যাট বাড়ানো, কোম্পানির ন্যূনতম করহার বৃদ্ধি এবং খুচরা পর্যায়ে উৎসে কর আরোপের প্রস্তাব নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ই-কমার্স ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

খুচরা খাতে নতুন কর কাঠামো

প্রস্তাব অনুযায়ী, খুচরা পর্যায়ে পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট হারে উৎসে কর কেটে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এই কর সংগ্রহের দায়িত্ব থাকবে ডিলার ও পরিবেশকদের ওপর।

এনবিআরের ধারণা, এ ব্যবস্থার মাধ্যমে কয়েক হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব আসতে পারে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রশাসনিক জটিলতার কারণে এটি বাস্তবায়ন কঠিন হবে।

ভ্যাট ও নিবন্ধন সম্প্রসারণ

রাজস্ব বাড়াতে আরও প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে কয়েক লাখ প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধিত থাকলেও অনেকেই নিয়মিত রিটার্ন দিচ্ছে না।

আগামী এক বছরে ভ্যাটদাতা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কয়েকগুণ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, এ প্রক্রিয়ায় যেন হয়রানি না বাড়ে।

ব্যাংক লেনদেন ও নজরদারি

কর ফাঁকি রোধে ব্যাংক লেনদেন বিশ্লেষণ আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে। কর কর্তৃপক্ষ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানো হবে।

এতে করদাতাদের আয়-ব্যয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে এনবিআর। তবে এতে ব্যক্তিগত ও ছোট ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে বলে মত অর্থনীতিবিদদের।

বিলাসী ব্যয়ে কর বৃদ্ধি

বিলাসবহুল গাড়ি ও উচ্চমূল্যের ব্যয়ের ওপর করহার বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। একই সঙ্গে সম্পদ কর নিয়েও আলোচনা চলছে।

কর ফাঁকির অভিযোগের ভিত্তিতে এই খাতে কঠোর অবস্থান নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সামগ্রিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজস্ব বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা।

কর আদায় বাড়ানোর উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে রাজস্ব ঘাটতি কিছুটা কমবে, তবে অতিরিক্ত চাপ বাজারে পণ্যের দাম বাড়াতে পারে।

ফলে আসন্ন বাজেট শুধু অর্থনৈতিক পরিকল্পনার বিষয় নয়, বরং ব্যবসা ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

মন্তব্য করুনঃ

পাঠকের মন্তব্য

20G