পরিচালক একটি চলচ্চিত্রের কান্ডারী: রুবেল

প্রথম প্রকাশঃ এপ্রিল ৬, ২০১৫ সময়ঃ ৯:৪২ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৯:৪৬ অপরাহ্ণ

বিনোদন প্রতিবেদক, প্রতিক্ষণ ডটকম:

চিত্রনায়ক রুবেল। অ্যাকশান হিরোrubel হিসেবে দেশীয় চলচ্চিত্রে এক নামে পরিচিত। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে ৯০ দশকের বাংলা চলচ্চিত্রে যার কোন ছবি ফ্লপ বা ব্যবসায়িকভাবে ব্যর্থ হয়নি।

যার প্রতিটি ছবিতে থাকতো নিত্য নতুন মারামারির কৌশল। তাও আবার খালি হাতে। দর্শকরা রুপালী পর্দায় রুবেলের কলাকৌশল দেখে উচ্ছসিত হতেন। হলিউডের ব্রুসলির সঙ্গে তুলনা করে দর্শকরা রুবেলকে বলতো বাংলার ব্রুসলি।

শুধু অভিনয়ই নয়, পরিচালনা করেছেন বেশ কিছু জনপ্রিয় চলচ্চিত্র। বর্নাঢ্য অভিনয় জীবন আর নানা বিষয় নিয়ে তার সাথে কথা বলেন প্রতিক্ষণ’র প্রতিনিধি মাসুদুর রহমান। পাঠকদের জন্য সাক্ষাতকারটি তুলে ধরা হলো।

প্রতিক্ষণ: রুপালী জগতে আসাটা কিভাবে ?

রুবেল: আমার বড় ভাই নায়ক সোহেল রানার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে আসা। আমার এতদুর আসার পেছনে ভাইয়া ও ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলমের অনেক অবদান রয়েছে। তাদের দুজনের জন্যই আজ আমি নায়ক রুবেল হিসেবে পরিচিত। তবে, চলচ্চিত্রে আমার শুরুটা ‘জীবন নৌকা’ ছবিতে গায়ক হিসেবে। এর পর চলচ্চিত্রে সহকারী পরিচালক হয়ে কাজ করি। তারপর ফাইটিং ডিরেক্টর হিসেবে,এরপর নায়ক হয়ে কাজ করার পর প্রযোজক হয়ে কাজ করেছি। সর্বশেষে পরিচালক হয়ে কাজ করি। অভিনয়, পরিচালনা এখনও করছি।

প্রতিক্ষণ: বর্নাঢ্য জীবনে এ পর্যন্ত কতগুলো চলচ্চিত্রে অভিনয় করা হয়েছে ?

রুবেল: আমার অভিনীত ২৩০টি চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে। শহিদুল ইসলাম খোকন পরিচালিত ‘লড়াকু’ ছবিতে আমি প্রথম অভিনয় করি।

প্রতিক্ষণ: আপনি তো অ্যাকশন হিরো হিসেবে পরিচিত। সামাজিক ছবিতে কি কখনোও অভিনয় করা হয়েছ ?

রুবেল: অ্যাকশানধর্মী ছবিগুলোতে সাধারণত যা দেখানো হয় তা কিন্তু আমাদের সমাজের বাইরে নয়। এগুলোও কিন্তু সমাজের অন্তর্ভুক্ত। বলা যেতে পারে সামাজিক অ্যাকশনধর্মী ছবি। এসব ছবিতে অভিনয় করে মিথ্যার পতন ঘটিয়ে সত্যকে তুলে ধরা হয়েছে। তবে,একেবারে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রেক্ষাপটের গল্পে নির্মিত চলচ্চিত্র, যাতে মোটেও মারপিট নেই এমন চলচ্চিত্রে অভিনয় করা হয়নি। অবশ্য দু/তিনটি রোমান্টিক ছবিতেও অভিনয় করেছি।

প্রতিক্ষণ: রোমান্টিক ছবিতে অভিনয় করতে কেমন লেগেছে ?

রুবেল: অ্যাকশানধর্মী ছবিতে অভিনয় করতে আমার কাছে যতটা ভালো লেগেছে, রোমান্টিক ছবিতে অভিনয় করতে আমার কাছে ততটা ভালো লাগেনি।

প্রতিক্ষণ: তবে কি সেসব ছবি ফ্লপ ছিলো ?Kobiokabbo_1368860818_1-923253_509766822423485_485703635_n

রুবেল: না। আমার অভিনীত কোন ছবি ব্যবসায়ীকভাবে ব্যর্থ হয়েছে বলে আমার মনে হয় না।

প্রতিক্ষণ: কতগুলো চলচ্চিত্র পরিচালনা করা হয়েছে ?

রুবেল: এ পর্যন্ত ১৬ টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘বিচ্ছু বাহিনী’, ‘বাঘে বাঘে লড়াই’, ‘অন্ধকারে চিতা’, ‘চারিদিকে অন্ধকার’ উল্লেখযোগ্য। পরিচালনার ১৭ নম্বর চলচ্চিত্র হবে ‘মিশন সিক্স’। পরিচালনার প্রথম চলচ্চিত্র ছিলো ‘মায়ের জন্য যুদ্ধ’, মুক্তি পেয়েছিলো ২০০১ সালে। আর সর্বশেষ মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘রক্ত পিপাসু’ ২০০৮ সালে মুক্তি পেয়েছিলো।

প্রতিক্ষণ: ‘মিশন সিক্স’ চলচ্চিত্রটি কেমন হতে পারে ?

রুবেল: এখনকার বেশিরভাগ ছবি ভালোবাসা নির্ভর। ভালোবাসার বাইরে একটু অ্যাকশানধর্মী ছবি করা উচিত। সেই চিন্তা থেকেই ছবিটি করছি। ‘মিশন সিক্স’ চলচ্চিত্রের গল্পের সাথে নামের দারুণ মিল রয়েছে। গল্পেরও ভিন্নতা আছে। এতে পুলিশ বাহিনীকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। একটি দূর্ধর্ষ গ্রুপকে ধরার জন্য তাদের অভিযান। আমাদের দেশের যেসব দর্শকেরা অ্যাকশন ছবি দেখতে পছন্দ করেন, অ্যাকশনধর্মী ছবি দেখতে সিনেমা হলে যাবেন, আমার বিশ্বাস তাদের আশা পূরণ করতে পারব। জায়েদ খান, পরিমনী, মৌসুমী হামিদের সাথে নতুন একটি ছেলেকে দেখা যাবে এ ছবিতে।

প্রতিক্ষণ: সিনিয়র তারকা হিসেবে এসময়ের জুনিয়র তারকাদের মাঝে কতটুকু পার্থক্য খুঁজে পান ?

রুবেল : অনেক পার্থক্য। আমাদের সময় আমরা অভিনয়কে মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসতাম। চলচ্চিত্রকে শতভাগ দেওয়ার চেষ্টা করতাম। নেওয়ার চেষ্টা করতাম বড়জোড় পাঁচ ভাগ। আর এখন নতুনেরা চলচ্চিত্র থেকে নেওয়ার চেষ্টা করে শতভাগ, দেওয়ার চেষ্টা করে পাঁচ ভাগ। চলচ্চিত্রকে দেওয়ার ইচ্ছা নেই। আমি তাদের উদ্দেশ্যে বলব তুমি চলচ্চিত্রকে ভালোবাস, চলচ্চিত্রকে দাও, চলচ্চিত্র তোমাকে অনেক কিছু দেবে। ফিল্মের প্রতি ভালোবাসা না থাকলে নতুনেরা দাঁড়াতে পারবে না। রাজ্জাক, কবরী,আলমগীর, শাবানা,সোহেল রানা, ফারুক ভাই তারা চলচ্চিত্রকে ভালোবেসে অনেক কিছু দিয়েছে বলেই আজ তাদের এই অবস্থান।

প্রতিক্ষণ: বর্তমানে সিনেমার rubel100_50624গল্পের মান নিয়ে কি বলবেন ?

রুবেল: বাংলা চলচ্চিত্রের এমন দুরবস্থা হওয়ার জন্য কিছু সংখ্যক প্রযোজক, পরিচালকরাও দায়ী। এমন কিছু প্রযোজক আছেন যারা নিজেরাই গল্প-কাহিনী,আর্টিস্টসহ সবকিছু করে দেয়। এমন কিছু পরিচালক আছেন যারা তাতেই ছবি বানাতে শুরু করেন।

এতে করে চলচ্চিত্রের মান ক্ষুন্ন হয়। কোন বৈচিত্র নেই। এক সময় আমাদের চলচ্চিত্রগুলো এতোভালো করেছে কারণ গল্পের বৈচিত্র ছিলো। সে সময় গল্প নিয়ে পর্যালোচনা করা হতো। এক গল্পের সাথে যেন আরেক গল্পের মিল না থাকে। এখন তা করা হয় না।

আর কিছু পরিচালক এমনও আছেন যারা পরিচালনার অনেক কিছুই বুঝেন না। না বুঝেই নির্মাণে হাত দিয়েছেন। পরিচালক হচ্ছেন একটি চলচ্চিত্রের কান্ডারী। তাই চলচ্চিত্রের অবস্থা আগের মতো নেই। তবে, কম সংখ্যক হলেও বাংলাদেশে ভালো ছবি তৈরী হচ্ছে। এ অবস্থার পরিবর্তন হবে বলে আমি আশাবাদি।

প্রতিক্ষণ: এদেশে ভিনদেশী চলচ্চিত্র প্রদর্শন নিয়ে আপনার মন্তব্য জানতে চাই ?

রুবেল: আমরা চাই না আমাদের চলচ্চিত্রকে ধ্বংস করতে এদেশে হিন্দি-উর্দূ ছবি সিনেমা হলে চলুক। যে দেশ ভাষার জন্য যুদ্ধ করে প্রান দেয়, সে দেশে বাংলা ভাষা ছাড়া অন্যভাষার ছবি চলতে পারে না। ভারত আমাদের সাহায্য করেছে তবে, আমাদের স্বাধীনতার উপর আঘাত হানলে সহ্য করব না। বর্তমান সরকারের সময়ে ভিনদেশী চলচ্চিত্র প্রদর্শন এদেশের জন্য অত্যন্ত লজ্জার ব্যাপার। যারা বলেন, হলে আমাদের ছবি চলে না আমি তাদের বলব, হলের অবস্থা ভালো করুন, ডিজিটাল করুন তারপর দেখুন চলে কিনা। এদেশে এখনও ভালো ছবি নির্মাণ হচ্ছে। ‘অনেক সাধের ময়না’ ছবিই তার প্রমাণ। যারা এদেশে হিন্দি ছবি আমদানী করে প্রদর্শন করছে তারা দেশের সাথে বেইমানী করছে। আমার ‘মা’র সাথে অন্য কোন মহিলার তুলনা হয়না। সে কানা হোক, অন্ধ হোক, সে আমার মা। বাংলাদেশও আমার মা।

প্রতিক্ষণ: চলচ্চিত্রের নানা সমস্যা সমাধানে কি করা যেতে পারে ?

রুবেল: সরকারের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা। তা না হলে চলচ্চিত্রের সুদিন ফিরে আসবে না । এতে সরকার এমন একটি উদ্যোগ নিতে পারেন যার সঠিক তদারকিতে চলচ্চিত্র শিল্প সামনে এগিয়ে যাবে। যার মাধ্যমে হলের সুন্দর পরিবেশ তৈরী হবে, পরিকল্পিতভাবে ডিজিটাল হল বৃদ্ধি পাবে, পাইরেসি বন্ধ হবে,। ক্যামেরা,সাউন্ড,এডিটিং ও ফ্লোরের যে সব অভাব আছে তা দুর করতে হবে। পাশাপাশি দেশীয় চলচ্চিত্রের প্রতি সকলের ভালোবাসা থাকতে হবে।

এম-আর/প্রতিক্ষণ/এডি/আরেফিন

আরো সংবাদঃ

মন্তব্য করুনঃ

পাঠকের মন্তব্য

20G