কালের বিবর্তনে… ঐতিহ্যের ঢেঁকি বিলুপ্ত!

প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ৭, ২০১৫ সময়ঃ ১:৫৯ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৯:২২ পূর্বাহ্ণ

ডেস্ক রিপোর্ট, প্র্রতিক্ষণ ডটকম:

dhc3b1eki_3‘‘ও ধান ভানরে ঢেঁকিতে পাড় দিয়া, পিংকী নাচে আমি নাচি হেলিয়া দুলিয়া । ও ধান ভানরে…… ধান বেচিয়া কিনমু শাড়ী পিন্দা যাইমু বাপর বাড়ী, স্বামী যাইয়া লইয়া আইব গারুর গাড়ী দিয়া ।
ও ধান ভানরে…… ’’।

চিরায়ত বাংলার এই গান বাঙালীর ঢেঁকির আবহ জানান দেয়। নতুন ধান বানা, সেই ঢেঁকিতে ছাঁটা নতুন চালে পিঠার গুড়ি ।

আবার ঢেঁকিতে চিড়া কোটা আবহমান বাংলার ঐতিহ্যের অংশ জুড়েই আছে ।

প্রবচনেও একদা শোনা যেত – ‘‘চিরা কুটি, বারা বানি, হতিনে করইন কানাকানি । জামাই আইলে ধরইন বেশ, হড়ির জ্বালায় পরান শেষ’’।

ঢেঁকি আমাদের শাশ্বত কৃষি নির্ভর গ্রামীণ জনপদে দরকারী ছিল একদা। তবে এখন যান্ত্রিক যুগের আধুনিকতায় মানুষ স্বল্প সময়ে ও শ্রমে দ্রুত আধুনিক ও নতুন নতুন প্রযুক্তি অতীতের ঐতিহ্যবাহী অনেক অনেক জিনিসপত্রের ব্যবহার বেড়েছে। ফলে আমাদের অতীত জীবনাচারের অনেক জিনিস পরিত্যাগ করছে। ফলে আমাদের অতীত ইতিহাস ঐতিহ্য সমাজ সংস্কৃতির অংশ ঢেঁকির ব্যবহার হারিয়ে গেছে।

আগেকার যুগে গ্রামের প্রত্যেক গৃহস্থ বাড়িতে ধান বানা ও চালের গুড়া কিংবা চিড়া কোটার জন্য ঢেঁকির ব্যবহার হত। ঢেঁকিছাটা চাউলের কদর ছিল খুব। এ চাউলের ভাতের মজাই আলাদা। ঢেঁকিছাটা চাউলে প্রচুর পরিমান ভিটামিন বিদ্যমান তাই ঢেঁকিছাঁটা চালের চাহিদা আজও কমেনি।

ধান ভাঙা ঢেঁকি আমাদের গ্রাম বাংলার প্রাচীন গ্রামীন ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপুর্ণ জিনিস। গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশেও এর একটা বিশেষ গুরুত্ব ছিল। একসময় গ্রাম গঞ্জসহ সর্বত্র ধান ভাঙ্গা, চাউল তৈরি, গুড়ি কোটা, চিড়া তৈরি, মশলাপাতি ভাঙ্গানো সহ বিভিন্ন কাজের জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হত চিরচেনা ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি।

timthumb.phpতখন এটা গ্রামীণ জীবন ও সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল। কুটির শিল্প তথা পেশা হিসেবেও ঢেঁকিতে ধান বানা হত। গ্রামের সাধারণ গৃহবধূরাই ঢেকি সাধারনত চালনা করে।

জনশ্রুতি আছে, সত্তরের দশকে সর্বপ্রথম দেশে রাইসমিল বা মেশিন দিয়ে ধান থেকে চাল বের করার প্রচলন শুরু হয়।

তখন থেকেই ঢেঁকির প্রয়োজনীয়তা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে। একসময় সারাদেশে বছরজুড়ে তের পার্বণ পালিত হত।

গ্রাম গঞ্জে একটার পর একটা উৎসবের আমেজে ভরপুর থাকত। বাংলায় হেমন্ত উৎসব, পৌষ পার্বণ, বসস্ত উৎসব, বর্ষবরণ,বিয়ে উৎসব,পিঠা তৈরির উৎসব, হিন্দু সম্প্রদায়ের নানা পূজা, গায়ের মেলাসহ নানাবিধ অনুষ্ঠানের আয়োজন হত। এখনও এসব উৎসব হয় তবে ঠিক আগের মত সেই প্রাণ নেই।

গ্রামীণ নারীরা চালের গুড়ি দিয়ে নানা রকম পিঠা যেমন চিতল পিঠা, রুটি পিঠা, ঝুরি পিঠা, চুঙ্গা পিঠা, তালের পিঠা,পাটি সাপটা পিঠা, নুনগরা, নুনরডোবা, পব, সমুছা সহ তৈরী করতেন হরেক রকমের পিঠাপুলি। এসব তৈরী হত ঢেঁকি ছাটা চালের গুড়ি দিয়ে।

কালের বিবর্তনে এসব পিঠা তৈরীতে ঢেঁকি ছাটা চালে গুড়া তেমন আর ব্যবহার হয়না। ঢেঁকি হারিয়ে গিয়ে এর ব্যবহারও বিলুপ্ত । একদা গ্রামের বড় গৃহস্থ বাড়িতে ঢেঁকি থাকা ছিল অনেকটাই বনেদী সমৃদ্ধ গৃহস্থ পরিবারের পরিচয় বহন করত। এখন কালের পরিক্রমায় আমাদের ঐতিহ্যের ঢেঁকি বিলুপ্ত। তাই গ্রাম বাংলার গৃহস্থ বাড়িতে এখন আর শোনা যায়না ঢেঁকির ছন্দময় শব্দ।

প্র্রতিক্ষণ/এডি/আকিদ

আরো সংবাদঃ

মন্তব্য করুনঃ

পাঠকের মন্তব্য



আর্কাইভ

July 2024
S S M T W T F
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  
20G