শিশুদের খেলনায় ক্ষতিকর রাসায়নিক, নজরদারিতে বিএসটিআই
দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া শিশুদের খেলনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এখন থেকে দেশে উৎপাদিত কিংবা বিদেশ থেকে আমদানি করা সব ধরনের শিশুদের খেলনা বাজারজাতের আগে নির্ধারিত বাংলাদেশ মান (বিডিএস) অনুসরণ বাধ্যতামূলক হবে। তবে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে কীভাবে মান যাচাই ও বাজার তদারকি পরিচালিত হবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা চলছে।
গত ২৩ জুন শিল্প মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে শিশুদের খেলনাসহ সাতটি পণ্যের জন্য নতুন ও সংশোধিত বাংলাদেশ মান (বিডিএস) বাধ্যতামূলক করে। এসব মান বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)-কে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, শিশুদের ব্যবহৃত খেলনায় যেন ক্ষতিকর রাসায়নিক, বিষাক্ত ধাতু বা এমন কোনো উপাদান না থাকে যা তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলতে পারে, সেটিই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বাজারে আসার আগে প্রতিটি খেলনাকে নির্ধারিত নিরাপত্তা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।
গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য
পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা (ইএসডিও) এবং বিএএন টক্সিকসের যৌথ এক গবেষণায় শিশুদের ব্যবহৃত বিভিন্ন পণ্যে উদ্বেগজনক মাত্রায় বিষাক্ত ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে পরিচালিত ওই গবেষণায় ঢাকার বিভিন্ন বাজার থেকে সংগ্রহ করা ১৫০টি পণ্যের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশে সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়ামের মতো ক্ষতিকর উপাদান শনাক্ত হয়।
গবেষণায় একটি শিশুদের পানির মগে সিসার মাত্রা ১ হাজার ৩৮০ পিপিএম পাওয়া যায়, যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমা মাত্র ৯০ পিপিএম। গবেষকদের মতে, এসব উপাদান দীর্ঘমেয়াদে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এ ছাড়া জরিপে অংশ নেওয়া অধিকাংশ অভিভাবক খেলনায় বিষাক্ত উপাদান থাকার সম্ভাবনা সম্পর্কে অবগত নন। অনেকেই নিশ্চিত নন, তারা সন্তানদের জন্য যে খেলনা কিনছেন, তা আদৌ নিরাপদ কি না।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরীর মতে, খেলনায় ব্যবহৃত রঙ ও বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান শিশুদের জন্য বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে এসব উপাদানের বিষয়ে কঠোর মানদণ্ড থাকলেও বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায়নি।
তিনি বলেন, সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে বিএসটিআই আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে কার্যকরভাবে তা বাস্তবায়ন করতে পারে কি না, তার ওপর।
তার মতে, নিম্নমানের প্লাস্টিক ও ক্ষতিকর রঞ্জক পদার্থ শিশুদের শরীরে বিভিন্নভাবে প্রবেশ করে চর্মরোগ, কিডনি ও লিভারের ক্ষতির পাশাপাশি হরমোনজনিত সমস্যাও সৃষ্টি করতে পারে। ফলে নিরাপদ খেলনা নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।
যেভাবে হবে মান যাচাই
বিএসটিআই জানিয়েছে, শিশুদের খেলনার জন্য চারটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দাহ্যতা (ফ্লেমেবিলিটি), ক্ষতিকর ফথ্যালেট পরীক্ষা, ভারী ধাতু (হেভি মেটাল) শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জীবাণু পরীক্ষা।
এসব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ খেলনাই কেবল বাজারজাতের অনুমতি পাবে। পরীক্ষার জন্য বিএসটিআইয়ের নিজস্ব পরীক্ষাগারে নমুনা বিশ্লেষণ করা হবে এবং মান পূরণ করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়া হবে।
দুই মাস সময়, এরপর শুরু হবে অভিযান
বিএসটিআই সূত্র জানায়, প্রজ্ঞাপন জারির পর উৎপাদক ও আমদানিকারকদের লাইসেন্স নেওয়ার জন্য দুই মাস সময় দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে আবেদন না করলে লাইসেন্স ছাড়া খেলনা বাজারজাত করা যাবে না।
সময় শেষ হওয়ার পর মাঠপর্যায়ে তদারকি, বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ, নিয়মিত পরীক্ষা এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে আইন প্রয়োগ করা হবে। লাইসেন্স পাওয়ার পরও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে খেলনার নমুনা সংগ্রহ করে নিয়মিত মান যাচাই অব্যাহত থাকবে।
বিএসটিআই কর্মকর্তারা জানান, খেলনায় ব্যবহৃত রঙে প্রায়ই সিসাসহ বিভিন্ন ভারী ধাতু পাওয়া যায়। এসব রঙ শিশুদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই বাধ্যতামূলক মান নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হলে বাজারে নিরাপদ খেলনার সরবরাহ নিশ্চিত করা সহজ হবে বলে তারা আশা করছেন।
এদিকে সংশ্লিষ্টদের অবহিত করতে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় নোটিশ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। নির্ধারিত সময় শেষে লাইসেন্সবিহীন খেলনা বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বিএসটিআই।
প্রতি / এডি / শাআ









