দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের জন্য যে দোয়া শিখিয়েছেন মহানবী (সা.)
মানুষের জীবনে অর্থ, সম্মান কিংবা সাফল্যের গুরুত্ব থাকলেও প্রকৃত সুখ নির্ভর করে নিরাপত্তা, সুস্থতা ও মানসিক প্রশান্তির ওপর। ইসলামে এমন একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু অর্থবহ দোয়া রয়েছে, যা দুনিয়া ও আখিরাতের সামগ্রিক কল্যাণের প্রার্থনা হিসেবে বিবেচিত হয়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সাহাবিদেরও এই দোয়া বেশি বেশি পাঠ করতে উৎসাহ দিয়েছেন।
দোয়াটি
اَللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَافِيَةَ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল আফিয়াহ।
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে সার্বিক নিরাপত্তা, সুস্থতা ও কল্যাণ কামনা করছি।’
‘আফিয়াহ’ বলতে কী বোঝায়?
আরবি ‘আফিয়াহ’ শব্দটি শুধু রোগমুক্তি বা শারীরিক সুস্থতার অর্থ বহন করে না। ইসলামী পণ্ডিতদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এটি এমন একটি ব্যাপক কল্যাণ, যা মানুষের দুনিয়া ও আখিরাতের বিভিন্ন দিককে অন্তর্ভুক্ত করে।
এর মধ্যে রয়েছে:
- ঈমান ও দ্বীনকে গুনাহ, শিরক, বিদআত ও বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করা।
- রোগ-ব্যাধি, দুর্ঘটনা ও শারীরিক বিপদ থেকে নিরাপদ থাকা।
- পরিবার, সম্পদ, সম্মান ও সামাজিক জীবনে অকল্যাণ থেকে সুরক্ষা লাভ।
- কবরের শাস্তি ও জাহান্নামের আজাব থেকে মুক্তি কামনা করা।
অর্থাৎ, ‘আফিয়াহ’ এমন এক দোয়া, যা একজন মুমিনের জীবনের প্রায় সব ধরনের কল্যাণের প্রার্থনাকে একত্রিত করে।
কেন এই দোয়ার এত গুরুত্ব?
হজরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রা.) একবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এমন একটি দোয়া শেখানোর অনুরোধ করেন, যা তিনি নিয়মিত পাঠ করতে পারেন। জবাবে মহানবী (সা.) বলেন, আল্লাহর কাছে ‘আফিয়াহ’ প্রার্থনা করতে।
কয়েক দিন পর তিনি একই অনুরোধ করলে রাসুল (সা.) আবারও বলেন, দুনিয়া ও আখিরাতের আফিয়াহই আল্লাহর কাছে চাইতে থাকুন। (তিরমিজি: ৩৫১৪)
হাদিসের ব্যাখ্যায় আলেমরা বলেন, একই দোয়ার প্রতি বারবার গুরুত্বারোপ করার মাধ্যমে উম্মতকে এই আমল নিয়মিত করার উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
ঈমানের পর সবচেয়ে বড় নেয়ামত
আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
“তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও আফিয়াহ প্রার্থনা করো। কারণ ঈমানের পর আফিয়াহর চেয়ে উত্তম কোনো নেয়ামত মানুষকে দেওয়া হয়নি।” (তিরমিজি: ৩৫৫৮, মিশকাত: ২৪৮৯)
এ থেকেই বোঝা যায়, সুস্থতা, নিরাপত্তা ও সার্বিক কল্যাণ ইসলামে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
কেন প্রতিদিন এই দোয়া পড়া উচিত?
আফিয়াহ এমন একটি নেয়ামত, যার মাধ্যমে মানুষ জীবনের অন্যান্য নেয়ামত উপভোগ করতে পারে। সম্পদ, পদমর্যাদা বা খ্যাতি থাকলেও যদি শারীরিক অসুস্থতা, মানসিক অশান্তি বা পারিবারিক সংকট থাকে, তবে সেই সুখ পূর্ণতা পায় না।
এ ছাড়া এই দোয়া শুধু বিপদ দূর করার জন্য নয়, বরং বিপদ আসার আগেই আল্লাহর সুরক্ষা কামনার শিক্ষা দেয়।
বর্তমান সময়ে এই দোয়ার গুরুত্ব
আধুনিক জীবনে মানুষ নানা ধরনের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সংকটের মুখোমুখি হয়। হঠাৎ অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, আর্থিক অনিশ্চয়তা কিংবা পারিবারিক সমস্যার মতো পরিস্থিতিতে একজন মুমিনের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা ও নিরাপত্তার প্রার্থনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়মিত এই দোয়া পাঠ করলে আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীলতা, ধৈর্য ও মানসিক প্রশান্তি বৃদ্ধি পায়।
কখন এই দোয়া পড়বেন?
এই দোয়া যেকোনো সময় পড়া যায়। তবে কয়েকটি সময় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
- সকাল ও সন্ধ্যার জিকিরে
- আজান ও ইকামতের মাঝের সময়ে
- সিজদার সময়
- তাহাজ্জুদের নামাজে
- সালাম ফেরানোর আগে তাশাহহুদে
আরও পূর্ণাঙ্গ একটি দোয়া
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও একটি দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল আফওয়া ওয়াল আফিয়াতা ফিদ দুনইয়া ওয়াল আখিরাহ।
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষমা এবং সার্বিক নিরাপত্তা কামনা করছি।’ (আবু দাউদ: ৫০৭৪)
উপসংহার
সংক্ষিপ্ত হলেও ‘আফিয়াহ’-এর এই দোয়া একজন মুসলিমের জীবনের প্রায় সব ধরনের কল্যাণের প্রার্থনা বহন করে। দ্বীন, স্বাস্থ্য, পরিবার, সম্পদ ও আখিরাতের নিরাপত্তা একসঙ্গে চাওয়ার এমন অর্থবহ দোয়া নিয়মিত আমলে রাখা সুন্নত এবং অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। তাই প্রতিদিনের জিকির ও দোয়ার অংশ হিসেবে এটি পাঠ করার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য উপকারী।
প্রতি / এডি / শাআ









