যমজ ভাইয়ের অভিযানে বদলে যাচ্ছে পৃথিবীর মানচিত্র
পৃথিবীর মানচিত্রে যেসব পাহাড়কে যুগের পর যুগ সর্বোচ্চ বলে ধরে নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর অনেকটাই যে ভুল হতে পারে—সেই প্রশ্নটাই সামনে এনে দিয়েছেন দুই যমজ ভাই এরিক ও ম্যাথু গিলবার্টসন।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকির পাহাড়ি এলাকায় বেড়ে ওঠা এই দুই ভাই পড়াশোনা করেছেন এমআইটিতে, দুজনই মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি। কিন্তু পেশাগত জীবন ছেড়ে তাঁরা নেমেছেন এক ব্যতিক্রমী অভিযানে—পাহাড় জয় নয়, পাহাড়ের সঠিক উচ্চতা যাচাই।
এই অভিযানের শুরু ২০২০ সালে। কলোরাডোর পাহাড়ে উঠতে গিয়ে এরিক গিলবার্টসনের মনে হয়, সরকারি নথিতে দেওয়া উচ্চতা বাস্তবের সঙ্গে মিলছে না। তখন থেকেই সিদ্ধান্ত নেন—নিজেরা পরিমাপ করে দেখবেন, কোন পাহাড় আসলেই সবচেয়ে উঁচু।
আধুনিক ডিফারেনশিয়াল জিপিএসসহ অত্যন্ত নিখুঁত যন্ত্রপাতি নিয়ে তাঁরা পাহাড়ে ওঠেন। সাধারণ জিপিএসের তুলনায় এই প্রযুক্তি কয়েক গুণ বেশি নির্ভুল। এমনই এক অভিযানে তাঁরা প্রমাণ করেন, কলোরাডোর বহুল পরিচিত ক্রেস্টোন পিক নয়, পাশের একটি শৃঙ্গ—যাকে তাঁরা ‘ইস্ট ক্রেস্টোন’ নামে উল্লেখ করছেন—আসলে আরও উঁচু। পার্থক্য মাত্র কয়েক ইঞ্চি, কিন্তু তা শতাব্দীপ্রাচীন ধারণা ভেঙে দেয়।
এই সাফল্যের পর তাঁদের অভিযান ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে। এখন পর্যন্ত তাঁরা ১৪৯টি দেশের সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠেছেন এবং অনেক দেশের ক্ষেত্রেই সরকারি তথ্যের সঙ্গে বাস্তব উচ্চতার অমিল পেয়েছেন।
সৌদি আরবে তাঁরা দেখান, সরকারি হিসেবে সর্বোচ্চ ধরা জাবাল সাওদার চেয়ে জাবাল ফেরওয়া প্রায় ১০ ফুট বেশি উঁচু। একই ধরনের ভুল ধরা পড়ে গাম্বিয়া, উজবেকিস্তান, টোগো ও গিনি-বিসাউতে। উজবেকিস্তানের প্রকৃত সর্বোচ্চ চূড়া মাপতে তাঁদের দুর্গম পাহাড়ে বহু মাইল হাঁটতে হয়েছে।
এখন পর্যন্ত গিলবার্টসন ভাইদের তথ্যের ভিত্তিতে সাতটি দেশের সর্বোচ্চ চূড়ার নাম ও অবস্থান বদলানোর দাবি উঠেছে। কলম্বিয়ায় আগে সর্বোচ্চ ধরা পাহাড়টি বরফ গলার কারণে এখন আর সর্বোচ্চ নেই। একই ঘটনা ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রের মাউন্ট রেইনিয়ারে—বরফ গলে যাওয়ায় চূড়ার অবস্থানই বদলে গেছে।
তবে সমস্যা এক জায়গায়। শুধু তথ্য দিলেই সরকারি মানচিত্র বদলায় না। যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভে বা অন্যান্য দেশের সংস্থাগুলো যাচাই-বাছাই ছাড়া পরিবর্তনে রাজি হয় না। ফলে নতুন চূড়াগুলোর স্বীকৃতি পেতে সময় লাগতে পারে বছরের পর বছর।
তবু গিলবার্টসন ভাইদের লক্ষ্য পরিষ্কার। এরিক গিলবার্টসনের ভাষায়, “আমরা পাহাড়ে উঠি সত্যটা জানার জন্য।”
পৃথিবীর মানচিত্র আদৌ বদলাবে কি না, সেটা ভবিষ্যতের বিষয়। তবে এই দুই ভাইয়ের অভিযানে এটা নিশ্চিত—আমরা যেসব ভূগোলকে চূড়ান্ত সত্য বলে জানতাম, সেগুলোর অনেকটাই নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। এমনকি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পাহাড় নিয়েও প্রশ্ন ওঠা অসম্ভব নয়।
প্রতি / এডি /শাআ










