রক্তের সংক্রমণ: নীরব মহামারি ‘সেপসিস’ নিয়ে উদ্বেগ

প্রকাশঃ মার্চ ৩, ২০২৬ সময়ঃ ৭:২৮ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৮:৪৪ অপরাহ্ণ
বিশ্বজুড়ে রক্তের সংক্রমণ বা সেপসিসের (Sepsis) ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে বলে বিভিন্ন স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। একসময় এটি মূলত গুরুতর রোগীর জটিলতা হিসেবে দেখা গেলেও এখন সাধারণ সংক্রমণ থেকেও অনেক ক্ষেত্রে সেপসিস তৈরি হচ্ছে। চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেরিতে চিকিৎসা, অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার এবং দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এই বৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ।
সেপসিস কী?
সেপসিস হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে শরীরের সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ প্রক্রিয়া অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে নিজ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি করতে শুরু করে। সাধারণত নিউমোনিয়া, মূত্রনালির সংক্রমণ, ত্বকের ইনফেকশন কিংবা অপারেশনের পর সংক্রমণ থেকে এটি হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে এটি সেপটিক শকে রূপ নিতে পারে, যা প্রাণঘাতী।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি বছর বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ সেপসিসে আক্রান্ত হন এবং লাখ লাখ মানুষ মারা যান। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এর ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
কেন বাড়ছে রক্তের সংক্রমণ?
স্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা কয়েকটি কারণকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছেন—
১. অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স
অপ্রয়োজনীয় ও ভুল মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে অনেক ব্যাকটেরিয়া ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে উঠছে। ফলে সাধারণ সংক্রমণও নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হচ্ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, এ কারণেই অনেক সময় ইনফেকশন দ্রুত ছড়িয়ে রক্তে পৌঁছে যাচ্ছে।
২. দেরিতে হাসপাতালে যাওয়া
অনেক রোগী প্রাথমিক লক্ষণকে গুরুত্ব দেন না। জ্বর, কাঁপুনি, দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস, বিভ্রান্তি—এসব লক্ষণ দেখা দিলেও অনেকে ঘরোয়া চিকিৎসা চালিয়ে যান। এতে সংক্রমণ জটিল আকার ধারণ করে।
৩. দীর্ঘস্থায়ী রোগ বৃদ্ধি
ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, ক্যান্সার বা লিভারের সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এসব রোগ শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে সংক্রমণ হলে তা দ্রুত রক্তে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
৪. বৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধি
বয়স্কদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল থাকে। বিশ্বে গড় আয়ু বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও বাড়ছে।
৫. হাসপাতাল-সম্পর্কিত সংক্রমণ
আইসিইউ বা দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে হাসপাতালজনিত সংক্রমণ (Hospital-acquired infection) একটি বড় সমস্যা। অনেক সময় অস্ত্রোপচারের পর বা ক্যাথেটার ব্যবহারের মাধ্যমে জীবাণু রক্তে প্রবেশ করে।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপট:
জনস্বাস্থ্য গবেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে স্বাস্থ্যসচেতনতার ঘাটতি এবং অ্যান্টিবায়োটিক সহজলভ্য হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল। প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রি, অসম্পূর্ণ কোর্স গ্রহণ, এবং গ্রামাঞ্চলে সঠিক চিকিৎসা সুবিধার অভাব সেপসিসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
একাধিক চিকিৎসক জানিয়েছেন, ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে ত্বক বা পায়ের ক্ষত থেকে শুরু হওয়া সংক্রমণ অনেক সময় রক্তে ছড়িয়ে মারাত্মক অবস্থার সৃষ্টি করছে।
লক্ষণগুলো কী?
চিকিৎসকরা সতর্ক করছেন—নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে:
•উচ্চ জ্বর বা শরীর অত্যন্ত ঠান্ডা হয়ে যাওয়া
•দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস
•হার্টবিট বেড়ে যাওয়া
•বিভ্রান্তি বা অচেতন ভাব
•প্রস্রাব কমে যাওয়া
•ত্বক ফ্যাকাশে বা দাগযুক্ত হয়ে পড়া
সময় এখানে সবচেয়ে বড় বিষয়। প্রথম কয়েক ঘণ্টার চিকিৎসা জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিরোধে কী করা জরুরি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সেপসিস প্রতিরোধে কয়েকটি পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—
•অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যবহার না করা
•পূর্ণ কোর্স সম্পন্ন করা
•ডায়াবেটিস ও দীর্ঘস্থায়ী রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা
•অপারেশন বা ক্ষতের সঠিক পরিচর্যা
•টিকাদান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ
•প্রাথমিক সংক্রমণ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া
নীরব সংকেত:
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, সেপসিস কোনো নতুন রোগ নয়, কিন্তু এটি এখন একটি “নীরব বৈশ্বিক সংকট”। কারণ অনেক সময় এটি আলাদা করে চিহ্নিত হয় না; মূল সংক্রমণের আড়ালে থেকে যায়।
প্রশ্ন হলো—আমরা কি এখনো সংক্রমণকে সাধারণ সমস্যা হিসেবে দেখছি? নাকি বুঝতে পারছি, একটি ছোট ইনফেকশনও সময়মতো চিকিৎসা না করলে প্রাণঘাতী হতে পারে?
রক্তের সংক্রমণ বাড়ার প্রবণতা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি সতর্কবার্তা। সচেতনতা, সঠিক চিকিৎসা ও দায়িত্বশীল ওষুধ ব্যবহারই পারে এই নীরব বিপদকে নিয়ন্ত্রণে আনতে।
প্রতি /এডি /শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G