জুলাই, অভ্র আর আমি: আন্দোলনের সেই দিনগুলোর গল্প
জুলাই মাসটা এলেই একটা অস্থির বাতাস যেন ফিরে আসে।
এই মাসের নামের মধ্যে শুধু একটা সময় নেই, একটা স্মৃতি আছে।
একটা দাহ আছে।
একটা কান্না আছে।
আর আছে অনেক মানুষের না বলা ভয়, না ফুরোনো অপেক্ষা, আর রাস্তায় ফেলে আসা কিছু রক্তাক্ত দিন।
২০২৪ সালের জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন এক মাস, যখন ছাত্রদের ক্ষোভ ধীরে ধীরে রাস্তায় নেমে আসে।
শুরুটা হয়েছিল কোটা ব্যবস্থা নিয়ে। সরকারি চাকরিতে ন্যায্যতা, সমতা আর মেধার প্রশ্নে শিক্ষার্থীরা দাঁড়িয়েছিল। তারা বলেছিল, সুযোগ সবার জন্য সমান হোক। কিন্তু সেই দাবির ভেতরে জমে ছিল আরও অনেক দিনের অবহেলা, বঞ্চনা আর অসন্তোষ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হয়ে সেই আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। রাজু ভাস্কর্য, শাহবাগ, বিভিন্ন ক্যাম্পাস—সবখানে তখন এক ধরনের জেগে ওঠা দেখা যাচ্ছিল।
সেদিনের ছাত্ররা শুধু চাকরি চাইছিল না। তারা চাইছিল মর্যাদা।
চাইছিল এমন এক দেশ, যেখানে যোগ্যতার দাম থাকবে।
চাইছিল এমন এক সমাজ, যেখানে কারও ভবিষ্যৎ আগেই ভাগ করে রাখা হবে না।
আর এই চাওয়ার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল একটা বড় বিস্ফোরণ।
আমি সেই জুলাইকে দেখেছি।
তবে দূর থেকে নয়।
আমি সেই জুলাইকে বয়ে বেড়িয়েছি শরীরের ভেতরে, মনের ভেতরে, আর প্রতিদিনের শ্বাসের ভেতরে।
জুলাইয়ের সময় আমি ছয় মাসের প্রেগন্যান্ট ছিলাম।
পেটের ভেতরে অভ্র।
শরীর দুর্বল।
খেতে পারি না ঠিকমতো।
তার ওপর বাইরে চলছিল একের পর এক উত্তাল খবর।
ছাত্রদের আহত হওয়ার খবর, নিহত হওয়ার খবর, রক্ত আর কান্নার খবর—সবকিছু আমাকে প্রতিদিন আরও অস্থির করে তুলছিল।
আমার তখন মনে হতো, আমার পেটের ছেলেটা যেন পেট ফুঁড়ে বেরিয়ে দেশের রাস্তায় নেমে গেছে।
ঢাকার উত্তাল রাজপথে পুলিশের সঙ্গে সামান্য লাঠি নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।
একটার পর একটা গলিতে গিয়ে লুকাচ্ছে।
আমি ভিডিওতে তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি।
কিন্তু কী আশ্চর্য, এদের সবার চেহারা যেন একইরকম।
আমি কাউকেই আলাদা করতে পারছি না।
অভ্র তখন আমার শরীরের ভেতরে ছিল,
আর জুলাই ছিল আমার চারপাশের বাতাসে।
দুটোই আমাকে একসঙ্গে নাড়িয়ে দিচ্ছিল।
সেই সময়ে মোবাইল না দেখলে আমার পাগল হয়ে যাওয়ার অবস্থা হতো।
ইন্টারনেট বন্ধ।
নিউজের জন্য সারাদিন বসে থাকা।
প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা কোনোমতে কিছু ভিডিও দেশের বাইরে পাঠাচ্ছে, আর সেখান থেকে আমরা খবর পাচ্ছি।
ভেরিফায়েড পেজে খবর আসছে, ভিডিও আসছে, ছবি আসছে।
পিনাকি ভট্টাচার্যের পেজেও কিছু খবর ভেসে উঠছে।
এই টুকরো টুকরো সংবাদই তখন আমার দিনের একমাত্র অবলম্বন।
একেকদিন অস্থিরতা ভয়াবহ রূপ নিত।
আমার মনে হতো, রাস্তায় লাশ হয়ে পড়ে থাকা ছেলেটার রক্ত আমার বাসার মেঝে ছড়িয়ে আছে।
আমি পা তুলে সেদিকে তাকিয়ে থাকতাম।
দমবন্ধ হয়ে আসত।
চারপাশে সবকিছু হঠাৎ খুব দূরের মনে হতো।
শ্রাবণ বাসায় এলে তারপর কাঁদতে পারতাম।
তার আগে পারতাম না।
কান্নাটাও তখন আটকে থাকত গলার কাছে, যেন তারও ভয় ছিল।
জায়নামাজ বিছিয়ে আমি আল্লাহর কাছে শুধু বলতাম—
আল্লাহ, ছেলেগুলো যেন গুলি খেয়ে ব্যথা না পায়।
কষ্ট যেন না পায়।
ওদের যেন বাঁচিয়ে রাখো।
ওদের মায়েরা যেন খবরের অপেক্ষায় পাগল না হয়ে যায়।
এই ছিল আমার জুলাই।
বাইরে আন্দোলন।
ভেতরে ভয়।
বাইরে স্লোগান।
ভেতরে নিঃশ্বাস আটকে থাকা এক নারী।
আর এই দুইয়ের মাঝখানে ছিল আমার সন্তান, আমার দুশ্চিন্তা, আর আমার অস্থির রাতগুলো।
ভাবলাম আমার সেই সব দিন গুলো ঘটনা আকারে লিখব।কেউ না পড়ুক,কেউ লাইক না দিক। তাই কি ই বা এসে গেলো। আমার মেমোরিতে সেভ থাকুক।
পহেলা জুলাই, ২০২৪
সকালটা ছিল খুব চেনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গাছে পাখির ডাক, রাস্তায় ছাত্রদের হাঁটাচলা, কারও হাতে বই, কারও হাতে চায়ের কাপ।
বাইরে থেকে দিনটাকে আলাদা কিছু মনে হয়নি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে, খুব নীরবে, একটা অস্থিরতা জমে উঠছিল। সেই অস্থিরতার নাম ছিল বৈষম্য।
আন্দোলনের মূল ইস্যু ছিল সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা। শিক্ষার্থীরা মনে করছিল, যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরির সুযোগ সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। কিন্তু কোটা ব্যবস্থার কারণে সেই সমান প্রতিযোগিতা ভেঙে যাচ্ছিল।
২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের পর যে পরিবর্তন এসেছিল, তা আবার উল্টে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয় জুন মাসে আদালতের এক রায়ের পর।
সেই আশঙ্কাই শিক্ষার্থীদের ভেতরে নতুন করে ক্ষোভ জাগায়।
আন্দোলনটা হঠাৎ জন্ম নেয়নি। আগে থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে অস্বস্তি ছিল। আদালতের রায়ের পর সেই অস্বস্তি সংগঠিত রূপ নেয়। তারপর ১ জুলাই ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়।
সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের সামনে অবস্থান, তারপর মিছিল, তারপর রাজু ভাস্কর্যে সমাবেশ—এই ছিল আন্দোলনের প্রথম দৃশ্য।
সেই সমাবেশ থেকেই ৪ জুলাই পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা আসে। পরের দিনের কর্মসূচিও জানানো হয়। অর্থাৎ, পহেলা জুলাই ছিল আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক শুরু, আর রাজু ভাস্কর্য ছিল তার প্রথম মঞ্চ।
ছাত্ররা কোটার বিরুদ্ধে ছিল এবং তার যথেষ্ট কারণ ও ছিল।
ছাত্রদের আপত্তি ছিল কোটা ব্যবস্থার অসম প্রভাব নিয়ে। তাদের মতে, সরকারি চাকরি হওয়া উচিত মেধা, পরিশ্রম আর প্রস্তুতির ভিত্তিতে। কিন্তু কোটা থাকার কারণে অনেক সময় সাধারণ প্রার্থীরা সমানভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারছিল না।
এই ক্ষোভ শুধু চাকরির সুযোগ নিয়ে ছিল না। এটা ছিল মর্যাদার প্রশ্ন। একজন ছাত্র যখন বছরের পর বছর পড়াশোনা করে, তখন সে চায় তার যোগ্যতা দিয়ে বিচার হোক। কিন্তু আলাদা করে রাখা আসন সেই বিশ্বাসে আঘাত করছিল। আর সেই আঘাতই ধীরে ধীরে প্রতিবাদে পরিণত হয়।
এই কোটাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী ছিল সাধারণ মেধাভিত্তিক চাকরিপ্রত্যাশীরা। বিশেষ করে যারা মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছে, যারা জেলা শহর বা গ্রাম থেকে উঠে এসে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার চেষ্টা করেছে, যারা দিন-রাত পড়াশোনা করে সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিয়েছে, আর যারা একই যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কম আসনের কারণে সুযোগ হারিয়েছে।
তাদের কাছে কোটা ছিল শুধু একটি নীতিমালা নয়, ছিল একধরনের দেয়াল। সেই দেয়াল চোখে দেখা যেত না, কিন্তু প্রতিযোগিতার শেষ প্রান্তে সেটাই ফল নির্ধারণ করত।
সরকারের কাছে কোটা শুধু একটা নীতিগত ব্যবস্থা ছিল না। এটা ছিল ক্ষমতা ধরে রাখার একটা নিরাপদ রাস্তা। কারণ, কোটা থাকলে প্রশাসনের ভেতরে একটি নির্দিষ্ট ধরনের ভারসাম্য বজায় রাখা যায়, আর সেই ভারসাম্য সব সময় শাসকের পক্ষে যায়। যারা সুবিধা পায়, তারা অনেক সময় শাসকের প্রতি নরম থাকে; কৃতজ্ঞ থাকে; প্রশ্ন কম তোলে। সরকারও জানত, এ ধরনের কৃতজ্ঞতার রাজনীতি খুব কাজের জিনিস।
আরও বড় কথা, কোটা টিকিয়ে রাখলে সরকার “বঞ্চিতদের পাশে আছি” — এই মানবিক ভাষাটা বারবার বলতে পারে। বাইরে থেকে এটা সহানুভূতির ভাষা। কিন্তু ভেতরে ভেতরে এটা ছিল রাজনৈতিক অবস্থান। সমাজের একটা অংশকে সুযোগ দিয়ে আরেকটা অংশকে অপেক্ষায় রেখে দিলে, ক্ষমতার আসনটা একটু বেশি স্থির হয়ে যায়। প্রশ্ন কমে, চাপ কমে, বিরোধও কিছুটা নরম থাকে।
সরকার তাই কোটা তুলে দিতে চায়নি। কারণ কোটা শুধু কিছু মানুষের চাকরি নিশ্চিত করত না; কোটা তাদের জন্য একধরনের রাজনৈতিক মুনাফাও তৈরি করত। এটা ছিল এমন একটা কাঠামো, যা শাসকের জন্য সুবিধাজনক, আর তাই তারা সেটা আঁকড়ে ধরেছিল।
এই কারণেই সরকার কোটা টিকিয়ে রাখতে এতটা ডেস্পারেট ছিল। কারণ কোটা উঠে গেলে শুধু একটা নিয়ম বদলাত না; ক্ষমতার ভেতরের একটা পুরোনো সুবিধার দেয়ালও নড়ে যেত।
কিন্তু সমস্যাটা ছিল অন্য জায়গায়।
ছাত্ররা শুধু একটি নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ায়নি। তারা দাঁড়িয়েছিল প্রতিদিনের অপমানের বিরুদ্ধে।
সেই অপমানটা অনেক সময় চোখে দেখা যায় না, কিন্তু বুকের ভেতরে বসে থাকে। একজন মেধাবী ছাত্র যখন বছরের পর বছর পড়ে, কোচিং করে, পরিবারকে আশা দেখায়, আর শেষে দেখে তার জন্য জায়গাটা আগেই কমিয়ে রাখা হয়েছে—তখন তার ভেতরে কিছু ভেঙে যায়।
এই ভাঙন হঠাৎ করে হয় না।
প্রথমে আসে হতাশা।
তারপর আসে রাগ।
তারপর আসে অসহায়তা।
আর শেষে আসে এক ধরনের উন্মত্ততা—যেখানে মানুষ আর চুপ থাকতে পারে না।
ছাত্রদের জীবনে এই বৈষম্য এমনভাবে কাজ করছিল যে, তারা যেন প্রতিযোগিতায় নামার আগেই হেরে যাচ্ছিল। তারা দেখছিল, একই পরীক্ষায় বসে কেউ আগে এগিয়ে যাচ্ছে শুধু আলাদা সুবিধার কারণে। এটা ছিল খুব নির্মম এক অনুভূতি। কারণ পরিশ্রমের চেয়ে বড় হয়ে উঠছিল ব্যবস্থা। মেধার চেয়ে বড় হয়ে উঠছিল সংরক্ষণ। আর স্বপ্নের চেয়ে বড় হয়ে উঠছিল বৈষম্য।
এই কারণেই আন্দোলনের সময় ছাত্রদের চোখে এত ক্ষোভ ছিল, এত আগুন ছিল। তারা শুধু দাবি তুলছিল না; তারা নিজেদের ভাঙতে থাকা ভবিষ্যৎকে বাঁচাতে চাইছিল। তাদের কাছে এটা আর চাকরির আন্দোলন ছিল না, এটা ছিল আত্মমর্যাদার যুদ্ধ।
আর যখন মানুষ বুঝে যায়, তার মর্যাদা বারবার মাটিতে ফেলা হচ্ছে, তখন সে ধীরে ধীরে মানুষ আর থাকে না; সে হয়ে যায় প্রতিরোধ।
চলবে…..
সূত্র: ফেসবুক পোস্ট ( নুসরাত শারমিন নিশা )













