যে কাজ করলে নষ্ট হয়ে যেতে পারে ভালো কাজের সওয়াব

প্রকাশঃ আগস্ট ১৬, ২০২৬ সময়ঃ ১০:৩৭ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১০:৩৭ অপরাহ্ণ

ইসলামে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বিপদে সহযোগিতা করা এবং প্রয়োজনের সময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়াকে অত্যন্ত মর্যাদার কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অন্যের আনন্দে আনন্দিত হওয়া এবং দুঃসময়ে পাশে থাকা একজন মুমিনের উত্তম চরিত্রের পরিচয়।

তবে ভালো কাজ করার পর এমন কিছু আচরণ রয়েছে, যা সেই আমলের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতে পারে। বিশেষ করে কাউকে সাহায্য করার পর বারবার সেই উপকারের কথা মনে করিয়ে দেওয়া বা খোঁটা দেওয়া ইসলামি দৃষ্টিতে নিন্দনীয়।

দান করে খোঁটা দেওয়া কেন ক্ষতিকর

মানুষকে সহযোগিতা করার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। কিন্তু সাহায্যের পর প্রশংসা পাওয়ার প্রত্যাশা, নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ কিংবা উপকারের কথা বলে অন্যকে ছোট করার মানসিকতা তৈরি হলে সেই নেক কাজের উদ্দেশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের দান-সদকা নষ্ট করো না খোঁটা ও কষ্টদানের মাধ্যমে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৬৪)

এই আয়াতে দান-সদকার পর খোঁটা দেওয়া ও কষ্ট দেওয়ার মাধ্যমে আমল নষ্ট করার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে।

তাফসিরে এ বিষয়টি বোঝাতে এমন একটি উদাহরণ দেওয়া হয়েছে, যেখানে সামান্য মাটি জমে থাকা পাথরের সঙ্গে লোকদেখানো ও খোঁটাসহ দানের তুলনা করা হয়েছে। বাইরে থেকে সেখানে ফলন হওয়ার সম্ভাবনা মনে হলেও বৃষ্টির পানিতে মাটি সরে গেলে পাথরের অনুর্বরতা প্রকাশ পায়। একইভাবে বাহ্যিকভাবে বড় মনে হলেও খোঁটা ও প্রদর্শনীর কারণে দানের সওয়াব নষ্ট হয়ে যেতে পারে। (আত-তাফসির আল-ওয়াসিত লিল-কুরআনিল কারিম, ১/৬০৮-৬০৯)

সাহায্য নিয়ে পরে অপমান করা কতটা কষ্টদায়ক

প্রয়োজনে কারও কাছ থেকে সহযোগিতা নেওয়ার সময় অনেকের মধ্যেই সংকোচ থাকে। এমন পরিস্থিতিতে সাহায্য করার পর যদি সেই বিষয়টি বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে উপকারগ্রহীতার মনে অপমান, লজ্জা কিংবা মানসিক কষ্ট তৈরি হতে পারে।

এ ধরনের আচরণ শুধু ব্যক্তির মনেই আঘাত করে না, বরং পারস্পরিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে পারে। এমনকি মানুষ ভবিষ্যতে প্রয়োজনের সময় কারও সাহায্য নিতেও দ্বিধা করতে পারে, যদি মনে হয় সেই সহযোগিতাই পরে অপমানের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

দান করে খোঁটা দেওয়ার ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা

দান ও মানুষের উপকার ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ নেক আমল। কিন্তু সেই কাজের পর খোঁটা দেওয়ার ব্যাপারে হাদিসে কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তির সঙ্গে আল্লাহ কেয়ামতের দিন কথা বলবেন না, তাঁদের দিকে তাকাবেন না এবং তাঁদের পবিত্রও করবেন না; তাঁদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’

সাহাবিরা জানতে চাইলে তিনি তাঁদের একজন হিসেবে এমন ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, যে দান করার পর খোঁটা দেয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০৬)

অর্থাৎ যে দান একজন মানুষের জন্য আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম হতে পারত, ভুল আচরণের কারণে সেটিই তার জন্য শাস্তির কারণ হয়ে যেতে পারে।

উপকার করে ভুলে যাওয়ার মানসিকতা

কাউকে সাহায্য করার পর মুমিনের প্রত্যাশা হওয়া উচিত আল্লাহর কাছ থেকে প্রতিদান পাওয়া। সাহায্যপ্রাপ্ত ব্যক্তি তা মনে রাখলেন কি না, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন কি না কিংবা কোনো প্রতিদান দিলেন কি না, তা নিয়ে অতিরিক্ত প্রত্যাশা রাখা উচিত নয়।

বরং কারও উপকার করার পর সেটিকে ভুলে যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা ভালো। নিজের করা সাহায্যের কথা অন্যের কাছে প্রচার না করাও উত্তম। এতে উপকারগ্রহীতার সম্মান ও আত্মমর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে।

কারও প্রয়োজন মেটানোর পর যদি সেই সাহায্যের বিনিময়ে তার সম্মান কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে উপকারের প্রকৃত সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়।

উপকার হোক ভালোবাসা ও সম্মানের

একটি সুন্দর সমাজ গড়ে ওঠে পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও সম্মানের ভিত্তিতে। মানুষ যেন বিপদের সময় নির্ভয়ে অন্যের সাহায্য চাইতে পারে, এমন পরিবেশ তৈরি করাও সামাজিক দায়িত্ব।

তাই কাউকে সাহায্য করার পর সেই সহযোগিতার কথা বারবার মনে করিয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। সত্যিকার অর্থে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা উপকারের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, এতে উপকারগ্রহীতার প্রতি সম্মান বজায় থাকে এবং বিনিময়ের প্রত্যাশা থাকে শুধু আল্লাহর কাছে।

মানুষের উপকার করুন, কিন্তু সেই উপকারকে কখনো অন্যকে ছোট করার হাতিয়ার বানাবেন না। বরং নীরবে করা ভালো কাজের প্রতিদান আল্লাহর কাছেই প্রত্যাশা করাই একজন মুমিনের উত্তম মানসিকতা।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G