এআইয়ের দৌড়ে এগিয়ে থাকতে গুগলের নতুন কৌশল

প্রকাশঃ আগস্ট ১৪, ২০২৬ সময়ঃ ১০:২৪ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১০:২৪ অপরাহ্ণ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতায় একসময় শক্ত অবস্থান তৈরি করলেও সাম্প্রতিক সময়ে আবারও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে গুগলের জেমিনাই। কোডিংসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় প্রতিদ্বন্দ্বী মডেলগুলোর তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে এটি। একই সঙ্গে নতুন শীর্ষস্থানীয় মডেল বাজারে আনার পরিকল্পনাতেও বিলম্ব হচ্ছে।

এ পরিস্থিতি সামাল দিতে গুগলের এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিপমাইন্ডে নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির গবেষণাকে আরও দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি জেমিনাইকে গুগলের বিভিন্ন পণ্যের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার লক্ষ্যও রয়েছে এই পুনর্গঠনের পেছনে।

জেমিনাইয়ের অবস্থান দুর্বল হলো কেন

গত নভেম্বরে নতুন সংস্করণ উন্মোচনের পর অল্প সময়ের জন্য জেমিনাই কয়েকটি ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী মডেলকে ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআই নতুন মডেল প্রকাশ করলে সেই অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি গুগল।

জেমিনাইয়ের পরবর্তী প্রধান সংস্করণ আগস্টে প্রকাশের পরিকল্পনা থাকলেও তা অন্তত দুই মাস পিছিয়ে যাওয়ার কথা জানা গেছে। বিভিন্ন পরীক্ষায় কোড তৈরি ও সফটওয়্যার-সংক্রান্ত কাজে জেমিনাইয়ের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা কয়েকটি সূত্রের মতে, সমস্যাটি শুধু মডেলের প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় সীমাবদ্ধ নয়। কম্পিউটিং অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, প্রকল্প পরিচালনায় মতপার্থক্য এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের দীর্ঘ প্রক্রিয়াও উন্নয়নের গতিকে প্রভাবিত করেছে।

গুগলের বড় সাংগঠনিক কাঠামোর কারণে অনেক সিদ্ধান্ত নিতে একাধিক স্তরের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়া এআই প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় এটিকে গুগলের একটি দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডিপমাইন্ডে নেতৃত্বের পরিবর্তন

এ পরিস্থিতির মধ্যেই ৫ আগস্ট গুগল ডিপমাইন্ডের নেতৃত্বে পরিবর্তনের ঘোষণা দেয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ডেমিস হাসাবিসকে চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রেখে দৈনন্দিন পরিচালনার দায়িত্ব কোরে কাভুকচুওগলুর হাতে দেওয়া হয়েছে।

একই সময়ে জেমিনাইয়ের প্রযুক্তিগত নেতৃত্বে থাকা কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠান ছেড়ে নতুন উদ্যোগ শুরু করেন। পরদিন অ্যালফাবেটের অভ্যন্তরীণ কর্মীসভায় ডিপমাইন্ডের কিছু দলকে গুগলের মূল করপোরেট কাঠামোর অধীনে নেওয়ার বিষয়টিও জানানো হয়।

বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এর ফলে ডিপমাইন্ডের আগের তুলনায় স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ কমতে পারে। ২০১৪ সালে গুগল ডিপমাইন্ড অধিগ্রহণের পর থেকেই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির কাজকে গুগলের ব্যবসায়িক লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে।

হাসাবিসের নতুন দায়িত্ব

ডেমিস হাসাবিসের নেতৃত্বে ডিপমাইন্ড দীর্ঘদিন মৌলিক এআই গবেষণা থেকে শুরু করে বাস্তবভিত্তিক প্রযুক্তি উন্নয়ন পর্যন্ত বিস্তৃত কাজ করেছে। জেমিনাইও সেই গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফল, যা বর্তমানে গুগলের ভবিষ্যৎ এআই কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে।

তবে জেমিনাইয়ের দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা থেকে হাসাবিস আগেই কিছুটা দূরে সরে গিয়েছিলেন। নতুন কাঠামোয় তার দায়িত্ব আরও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ও এআইয়ের ভবিষ্যৎ প্রভাবসংক্রান্ত বিষয়গুলোর দিকে কেন্দ্রীভূত হবে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন কাভুকচুওগলু

২০২৫ সালে গুগলের প্রধান নির্বাহী সুন্দর পিচাই কোরে কাভুকচুওগলুকে ডিপমাইন্ডের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি গুগলের প্রধান এআই স্থপতির দায়িত্ব দেন। তার অন্যতম কাজ ছিল জেমিনাইকে গুগলের বিভিন্ন সেবায় আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা।

পরবর্তী সময়ে জেমিনাইয়ের ভবিষ্যৎ দিক নির্ধারণে তার প্রভাব বাড়তে থাকে। নতুন সাংগঠনিক কাঠামোয় সেই ক্ষমতাই আরও আনুষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে।

গুগলের এক মুখপাত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, ডিপমাইন্ডের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে এখন কাভুকচুওগলুর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব থাকবে।

বিশ্লেষকদের মতে, তার দায়িত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এআই গবেষণাকে গুগলের ব্যবসায়িক লক্ষ্য ও আয় বৃদ্ধির সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে মিলিয়ে নেওয়া। বিশেষ করে গুগল ক্লাউড এআই ব্যবসার বড় আয়ের উৎস হওয়ায় ডিপমাইন্ড ও ক্লাউড বিভাগের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সের্গেই ব্রিনের সক্রিয়তা বাড়ছে

গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিনও সাম্প্রতিক সময়ে এআই নিয়ে আগের চেয়ে বেশি সক্রিয় হয়েছেন। যদিও তার কোনো আনুষ্ঠানিক নির্বাহী পদ নেই, তবু প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ এআই কর্মীদের ওপর তার যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে।

ব্রিন কর্মীদের জেমিনাইয়ের উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে দ্রুত এগিয়ে যাওয়া অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় গুগলের ব্যবধান কমানোর ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

একটি কর্মীসভায় তিনি ডিপমাইন্ডকে আরও দ্রুতগতিতে কাজ করার তাগিদ দেন। এআই মডেলের প্রশিক্ষণ ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেদের উন্নত করার প্রযুক্তির মতো নির্দিষ্ট গবেষণা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়েও তিনি আগ্রহ দেখিয়েছেন।

স্বাধীনতা হারানোর আশঙ্কা

নতুন কাঠামো নিয়ে ডিপমাইন্ডের কিছু কর্মীর মধ্যে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে গবেষণার বিভিন্ন সিদ্ধান্তের জন্য গুগলের করপোরেট ব্যবস্থাপনার ওপর বেশি নির্ভর করতে হতে পারে।

হাসাবিস ও কাভুকচুওগলু অবশ্য কর্মীদের জানিয়েছেন, এআই প্রযুক্তির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয় এমন কিছু বিভাগকে মূল গুগল কাঠামোর অধীনে নেওয়া হচ্ছে। এতে ডিপমাইন্ডের মূল এআই গবেষণা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে তারা আশ্বস্ত করেছেন।

এদিকে জেমিনাইয়ের প্রযুক্তিগত নেতৃত্বে থাকা জেফ ডিন ও ওরিওল ভিনিয়ালসসহ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠান ছেড়েছেন। তাদের অধীনে থাকা কিছু গবেষণা দল ও প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

কর্মীদের একাংশের আশঙ্কা, গবেষণার স্বাধীনতা কমে গিয়ে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক প্রকল্পই যদি অগ্রাধিকার পায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি মৌলিক এআই গবেষণা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

গুগলের পণ্য ও ব্যবসায় কী প্রভাব পড়বে

কাভুকচুওগলুর বড় দায়িত্বগুলোর একটি হলো গুগলের বিভিন্ন পণ্যের সঙ্গে জেমিনাইয়ের সমন্বয় আরও বাড়ানো। সার্চ, ক্লাউডসহ বিভিন্ন সেবায় এআইয়ের ব্যবহার বাড়াতে গুগল ইতোমধ্যে বড় বিনিয়োগ করছে।

গুগলের দাবি, ভিডিও তৈরির মতো কিছু ক্ষেত্রে তারা এআই প্রযুক্তির অগ্রভাগে রয়েছে। তবে ভাষা মডেল ও কোডিংয়ের মতো কয়েকটি ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে ব্যবধান কমানোর প্রয়োজন রয়েছে।

এদিকে এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন পণ্যে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় টেনসর প্রসেসিং ইউনিট বা টিপিইউয়ের সরবরাহ নিয়েও ডিপমাইন্ড ও গুগল ক্লাউডের মধ্যে চাপ রয়েছে বলে জানা গেছে। কাভুকচুওগলুর নতুন দায়িত্বে এই সমন্বয় আরও সহজ হতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গুগল অবশ্য এসব অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করেনি। তবে সুন্দর পিচাই জানিয়েছেন, এআই মডেল প্রশিক্ষণ এবং ব্যবহারকারীদের জন্য নতুন এআই সেবা চালুর প্রয়োজন মেটাতে গুগল তার কম্পিউটিং অবকাঠামো আরও বাড়াবে।

সামনে কী করতে চায় গুগল

জেমিনাইয়ের উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গুগলের সাম্প্রতিক পুনর্গঠনকে শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে কোম্পানির এআই ব্যবসাকে দ্রুত সম্প্রসারণ এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে প্রযুক্তিগত ব্যবধান কমানোর পরিকল্পনাও জড়িত।

চ্যাটজিপিটি বাজারে আসার পর ২০২২ সালে গুগল যে চাপের মুখে পড়েছিল, সেই অভিজ্ঞতা থেকেই প্রতিষ্ঠানটি এআই নিয়ে আরও আগ্রাসী কৌশল নেওয়ার চেষ্টা করছে।

এবারের পরিবর্তনে জেমিনাইয়ের দায়িত্ব কাভুকচুওগলুর হাতেই থাকছে। ডিপমাইন্ডের গবেষণা কার্যক্রমও চালু থাকবে। তবে গুগল যে বার্তা দিতে চাইছে তা স্পষ্ট: এআই প্রতিযোগিতায় আর ধীরগতিতে এগোনোর সুযোগ নেই।

জেমিনাইকে দ্রুত উন্নত করা, প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং সম্পদ বাড়ানো এবং এআই গবেষণাকে গুগলের ব্যবসায়িক সেবার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করাই এখন তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এই পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত গুগলকে এআই প্রতিযোগিতার শীর্ষে ফিরিয়ে আনতে পারে কি না, সেটিই এখন প্রযুক্তি খাতের বড় প্রশ্ন।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

August 2026
SSMTWTF
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031 
20G