একঘেয়েমি আর আলসেমি দূর করতে মেনে চলুন ৭টি অভ্যাস
পড়াশোনা, অফিসের কাজ কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের দায়িত্ব, সবকিছু ঠিকভাবে সামলাতে সময়ের সঠিক ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। অথচ অনেক সময় হাতে কাজ থাকলেও তা শুরু করার আগ্রহ পাওয়া যায় না। মনে হয়, একটু পরেই শুরু করব। এভাবে সময় চলে যায়, কিন্তু কাজ আর এগোয় না। কখনো একই ধরনের কাজের প্রতি বিরক্তি, কখনো শারীরিক ক্লান্তি, আবার কখনো মনোযোগের ঘাটতি এর পেছনে ভূমিকা রাখে।
এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে নিজের দৈনন্দিন অভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। কাজের পরিবেশে পরিবর্তন আনা, সময় ভাগ করে নেওয়া এবং ছোট লক্ষ্য নির্ধারণের মতো কিছু কৌশল কাজের প্রতি আগ্রহ ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে। তবে তার আগে বুঝতে হবে, কাজ করতে অনীহা হওয়ার পেছনে আসলে কোন বিষয়টি কাজ করছে।
অলসতার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে?
সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোনো কাজ শুরু করতে বা শেষ করতে অনীহা বোধ করাকে সাধারণভাবে অলসতা বলা হয়। কিন্তু সব ক্ষেত্রে কাজের প্রতি অনাগ্রহকে অলসতা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। ঘুমের অভাব, অতিরিক্ত পরিশ্রম, মানসিক চাপ কিংবা একঘেয়ে পরিবেশের কারণেও মানুষের কাজ করার ইচ্ছা কমে যেতে পারে।
তাই নিজেকে দোষারোপ না করে প্রথমে সমস্যার কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। কারণ অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে পারলে কাজের প্রতি আগ্রহ ফিরিয়ে আনা অনেক সহজ হতে পারে।
ক্লান্তি ও অলসতা এক নয়
পড়ার টেবিলে বসেও যদি মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়, তাহলে ভেবে দেখা দরকার শরীর পর্যাপ্ত বিশ্রাম পাচ্ছে কি না। দীর্ঘ সময় কাজ করা কিংবা নিয়মিত কম ঘুমানোর ফলে শরীর ও মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারে। তখন সাধারণ কাজও কঠিন মনে হয় এবং কাজে মন বসতে চায় না।
বেশির ভাগ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। অন্যদিকে কিশোর-কিশোরীদের বয়স অনুযায়ী সাধারণত আরও বেশি ঘুম দরকার হয়। তাই কাজের আগ্রহ কমে গেলে ঘুমের সময় ও বিশ্রামের দিকে নজর দেওয়া উচিত। পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার পরও ক্লান্তি দীর্ঘদিন থাকলে বিষয়টি অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
একঘেয়েমি থেকেও কমতে পারে কাজের আগ্রহ
একই কাজ দীর্ঘ সময় ধরে করা কিংবা প্রতিদিন একই ধরনের রুটিন অনুসরণ করার ফলে বিরক্তি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে পড়াশোনার ক্ষেত্রে একই বিষয়ে অনেকক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তখন পড়া বন্ধ করে অন্য কিছু করতে ইচ্ছা হয়।
এ সমস্যা কমাতে কাজের ধরনে সামান্য পরিবর্তন আনা যেতে পারে। পড়ার বিষয় পরিবর্তন করা, মাঝেমধ্যে বিরতি নেওয়া কিংবা বড় কাজকে কয়েকটি ছোট অংশে ভাগ করে নেওয়া উপকারী হতে পারে। কাজের মধ্যে বৈচিত্র্য থাকলে একঘেয়েমি কমানো এবং মনোযোগ ধরে রাখা তুলনামূলক সহজ হয়।
কাজের অনীহা কি বিষণ্নতার লক্ষণ?
মাঝেমধ্যে মন খারাপ হওয়া কিংবা কোনো কাজে আগ্রহ না পাওয়া স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা। তবে দীর্ঘদিন ধরে মন খারাপ থাকা, আগে আনন্দ দিত এমন কাজেও আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, ঘুম বা খাওয়ার অভ্যাসে পরিবর্তন এবং ক্রমাগত ক্লান্তি অনুভব করার মতো লক্ষণ দেখা দিলে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
এসব লক্ষণ থাকলেই যে বিষণ্নতা হয়েছে, এমন নয়। তবে সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিবারের বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে কথা বলা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া উচিত। সব সমস্যাকে অলসতা বলে ধরে নিলে প্রকৃত কারণ শনাক্ত করতে দেরি হতে পারে।
অলসতা ও একঘেয়েমি কাটিয়ে ওঠার ৭টি উপায়
১. নিজের জীবনযাত্রার সঙ্গে মানানসই রুটিন তৈরি করুন
দিনের কাজগুলো আগে থেকে পরিকল্পনা করে রাখলে কোন কাজ কখন করতে হবে, তা নিয়ে দ্বিধা কমে। ঘুম থেকে ওঠা, পড়াশোনা, খাবার খাওয়া, শরীরচর্চা ও বিশ্রামের জন্য নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে নিতে পারেন।
রুটিন তৈরি করার সময় নিজের সামর্থ্য ও দৈনন্দিন দায়িত্বের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা জরুরি। অন্য কেউ ভোরে উঠে কাজ করেন বলে আপনাকেও একই সময়ে উঠতে হবে, এমন নয়। বরং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করে নিজের জন্য বাস্তবসম্মত সময়সূচি তৈরি করুন। নিয়মিত সেই পরিকল্পনা অনুসরণ করলে কাজ শুরু করার অভ্যাস গড়ে উঠতে পারে।
২. কাজের জায়গা পরিচ্ছন্ন ও গোছানো রাখুন
অগোছালো পড়ার টেবিল কিংবা কাজের জায়গায় প্রয়োজনীয় জিনিস খুঁজতে গিয়ে সময় নষ্ট হতে পারে। চারপাশে অতিরিক্ত জিনিসপত্র থাকলে মনোযোগও বিঘ্নিত হতে পারে। তাই কাজ শুরু করার আগে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো গুছিয়ে রাখা ভালো।
বই, খাতা, কলম কিংবা কম্পিউটারের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম হাতের কাছে রাখুন। অপ্রয়োজনীয় জিনিস সরিয়ে কাজের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করুন। পুরো ঘর সাজিয়ে ফেলার প্রয়োজন নেই। কাজ শুরু করার জন্য যতটুকু গুছিয়ে নেওয়া দরকার, ততটুকুই যথেষ্ট। এতে কাজের প্রস্তুতি নিতে কম সময় লাগবে।
৩. ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সীমা নির্ধারণ করুন
মোবাইল ফোনে বারবার নোটিফিকেশন আসা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন নতুন পোস্ট দেখতে গিয়ে অনেক সময় অজান্তেই দীর্ঘ সময় কেটে যায়। পড়াশোনা বা গুরুত্বপূর্ণ কাজের মাঝখানে এমন বিরতি বারবার ঘটলে মনোযোগ ফিরে পেতে অসুবিধা হতে পারে।
এ সমস্যা কমাতে কাজের সময় ফোনটি হাতের নাগালের বাইরে রাখতে পারেন। প্রয়োজন অনুযায়ী নোটিফিকেশন বন্ধ করে রাখুন এবং অবসর সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন। পাশাপাশি হাঁটাহাঁটি, বই পড়া কিংবা পছন্দের কোনো সৃজনশীল কাজে সময় দিতে পারেন। উদ্দেশ্য ফোন পুরোপুরি বাদ দেওয়া নয়, বরং এর ব্যবহার যেন প্রয়োজনীয় কাজের পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করা।
৪. সময় ভাগ করে কাজ করার অভ্যাস গড়ে তুলুন
অনেক বড় কাজ একসঙ্গে শেষ করার চিন্তা থেকেই কখনো কখনো কাজ শুরু করতে অনীহা তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে পোমোডোরো পদ্ধতি ব্যবহার করে দেখতে পারেন। এই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট সময় কাজ করা এবং অল্প সময় বিরতি নেওয়ার মাধ্যমে কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়।
প্রথমে একটি নির্দিষ্ট কাজ বেছে নিন। এরপর ২৫ মিনিট সময় ধরে শুধু সেই কাজটি করুন। সময় শেষ হলে তিন থেকে পাঁচ মিনিট বিরতি নিন। এভাবে চারটি পর্ব শেষ করার পর ১৫ থেকে ৩০ মিনিটের দীর্ঘ বিরতি নিতে পারেন।
তবে ২৫ মিনিটই যে সবার জন্য উপযুক্ত, তা নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী কাজের সময় ও বিরতির দৈর্ঘ্য পরিবর্তন করা যায়। নিয়মিত বিরতি নিয়ে সময় ভাগ করে কাজ করলে ক্লান্তি কম অনুভূত হতে পারে এবং মনোযোগ ধরে রাখাও সহজ হতে পারে।
৫. বড় কাজের পরিবর্তে ছোট একটি অংশ দিয়ে শুরু করুন
কোনো কাজ অনেক বড় মনে হলে তা শুরু করার আগেই মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পুরো কাজ শেষ করার চিন্তা বাদ দিয়ে প্রথমে মাত্র পাঁচ মিনিট সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিন।
যেমন, পুরো অধ্যায় শেষ করার পরিকল্পনা না করে কয়েকটি পৃষ্ঠা পড়ুন। বড় প্রতিবেদন লিখতে হলে প্রথমে শুধু ভূমিকার কয়েকটি বাক্য লিখে ফেলুন। পাঁচ মিনিট পর কাজ চালিয়ে যেতে ইচ্ছা করলে চালিয়ে যান। প্রয়োজন হলে বিরতিও নিতে পারেন।
কাজ শুরুর বাধা কমানোই এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য। অনেক সময় শুরু করার পর কাজটি যতটা কঠিন মনে হয়েছিল, বাস্তবে ততটা কঠিন মনে হয় না। আর অল্প সময় কাজ করলেও অন্তত কিছুটা অগ্রগতি হয়।
৬. একসঙ্গে সব পরিবর্তন না করে ধাপে ধাপে এগোন
দীর্ঘদিনের অভ্যাস এক দিনে বদলে ফেলা কঠিন। একসঙ্গে অনেক নিয়ম চালু করতে গেলে উল্টো চাপ বেড়ে যেতে পারে। তাই প্রথমে একটি বা দুটি সহজ পরিবর্তন বেছে নিন।
প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে পড়তে বসা, কাজ শুরুর আগে টেবিল গুছিয়ে নেওয়া কিংবা দিনের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর তালিকা তৈরি করার মতো ছোট পদক্ষেপ দিয়ে শুরু করতে পারেন। কয়েক দিন বা এক সপ্তাহ পর দেখুন, কোন অভ্যাসটি আপনার জন্য বেশি কার্যকর হচ্ছে।
প্রয়োজনে পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনুন। কোনো দিন নিয়ম মেনে চলতে না পারলে পুরো প্রচেষ্টা ছেড়ে দেওয়ার দরকার নেই। নিয়মিত ছোট পদক্ষেপ অনুসরণ করার মাধ্যমেই ধীরে ধীরে স্থায়ী অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব।
৭. নিজের প্রতি কঠোর না হয়ে সমস্যার কারণ বোঝার চেষ্টা করুন
কোনো দিন পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শেষ না হলে নিজেকে ব্যর্থ ভাবার প্রয়োজন নেই। বরং কেন কাজটি করা সম্ভব হয়নি, তা বোঝার চেষ্টা করুন। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, অতিরিক্ত কাজের চাপ কিংবা বাস্তবতার সঙ্গে মিল নেই এমন পরিকল্পনার কারণে কাজ পিছিয়ে যেতে পারে।
নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝে পরবর্তী দিনের পরিকল্পনা ঠিক করুন। প্রয়োজন হলে কাজের পরিমাণ কমিয়ে দিন কিংবা পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা করুন। এক দিন পিছিয়ে পড়া মানেই সব শেষ হয়ে যাওয়া নয়। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার শুরু করতে পারাই গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ কথা
কর্মজীবন কিংবা শিক্ষাজীবনে এগিয়ে যেতে নিয়মিত চেষ্টা ও সময়ের সঠিক ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রতিটি মুহূর্ত ব্যস্ত থাকাই সফলতার একমাত্র মাপকাঠি নয়। শরীর ও মন ভালো রাখতে ঘুম, বিশ্রাম, বিনোদন এবং নিজের পছন্দের কাজের জন্যও সময় রাখা প্রয়োজন।
কাজের প্রতি অনীহা দেখা দিলে নিজেকে অলস ভাবার আগে তার কারণ বোঝার চেষ্টা করুন। ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ, কাজের পরিবেশ গুছিয়ে রাখা এবং নিয়মিত বিরতি নেওয়ার মতো অভ্যাস দিয়ে শুরু করতে পারেন। আর ক্লান্তি, মনোযোগের সমস্যা বা আগ্রহের অভাব দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে সেটিকে শুধু অলসতা বলে উপেক্ষা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী পেশাদার সহায়তা নিন।
প্রতি / এডি / শাআ
















