কোথাও ঝুলন্ত স্তম্ভ, কোথাও ১৩ তলার সিঁড়ি, স্থাপত্যের এক বিস্ময়কর নিদর্শন

প্রকাশঃ অক্টোবর ২৪, ২০২৬ সময়ঃ ৮:২০ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৮:২০ অপরাহ্ণ

ভারতের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য প্রাচীন স্থাপনা। কোনোটি পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা বিশাল ভাস্কর্যের জন্য বিখ্যাত, কোনোটি আবার নির্মাণকৌশলের অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যে আজও বিস্মিত করে পর্যটকদের। কোথাও মেঝে স্পর্শ না করা স্তম্ভ, কোথাও গভীর জলাধারে নেমে যাওয়ার জন্য সারি সারি সিঁড়ি। আবার কোথাও রয়েছে কাঠের কারুকাজে সমৃদ্ধ রাজপ্রাসাদ কিংবা পাহাড়ঘেরা দুর্ভেদ্য দুর্গ।

পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রের বাইরে ভারতের এমন সাতটি ঐতিহাসিক স্থান ঘুরে দেখতে পারেন, যেখানে প্রকৃতি, ইতিহাস ও স্থাপত্যের অনন্য সমন্বয় চোখে পড়বে।

১. ঊনকোটি, ত্রিপুরা

ত্রিপুরার সবুজ পাহাড় ও ঝরনাবেষ্টিত ঊনকোটি যেন প্রকৃতির বুকের মধ্যে লুকিয়ে থাকা এক প্রাচীন ভাস্কর্যভান্ডার। এখানকার পাথুরে দেয়ালে খোদাই করা রয়েছে দেবদেবীর বিশাল মুখাবয়ব। এর মধ্যে কালভৈরবের প্রায় ৩০ ফুট উঁচু ভাস্কর্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

স্থানটির নাম ঘিরেও প্রচলিত রয়েছে একটি লোককথা। জনশ্রুতি অনুযায়ী, শিবের সঙ্গে এক কোটি দেবদেবী এখানে এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন বাদ পড়ে যাওয়ায় জায়গাটির নাম হয় ঊনকোটি, যার অর্থ এক কোটির চেয়ে একটি কম। ইতিহাস ও লোকবিশ্বাসের পাশাপাশি এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশও পর্যটকদের আকর্ষণ করে। সাধারণত অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত এই স্থান ভ্রমণের জন্য ভালো সময়।

২. বটেশ্বর মন্দিরগুচ্ছ, মধ্যপ্রদেশ

মধ্যপ্রদেশের গ্বালিয়র থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বটেশ্বর মন্দিরগুচ্ছ প্রাচীন ভারতীয় মন্দির স্থাপত্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এখানে ছড়িয়ে রয়েছে প্রায় ২০০টি ছোট-বড় মন্দির। অষ্টম থেকে দশম শতকের মধ্যে গুর্জর-প্রতিহার শাসনামলে নির্মিত এসব মন্দির শিব, বিষ্ণু ও শক্তির উপাসনার সঙ্গে সম্পর্কিত।

দীর্ঘ সময় ধরে জঙ্গল ও ধ্বংসস্তূপের আড়ালে চাপা পড়ে ছিল মন্দিরগুলোর বড় একটি অংশ। পরে প্রত্নতাত্ত্বিকদের উদ্যোগে এগুলো উদ্ধার ও পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হয়। পাথরের গায়ে সূক্ষ্ম নকশা, মন্দিরের গঠন এবং একই এলাকায় বহু স্থাপনার উপস্থিতি জায়গাটিকে ইতিহাস ও স্থাপত্যপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

৩. লেপাক্ষী, অন্ধ্রপ্রদেশ

অন্ধ্রপ্রদেশের লেপাক্ষী পরিচিত তার প্রাচীন বীরভদ্র মন্দির ও অনন্য পাথরের কারুকাজের জন্য। বিজয়নগর সাম্রাজ্যের সময় নির্মিত এই মন্দিরের স্তম্ভ, ছাদ ও দেয়ালে রয়েছে সূক্ষ্ম নকশা এবং ঐতিহ্যবাহী ভাস্কর্য।

মন্দিরের প্রায় ৭০টি স্তম্ভের মধ্যে একটি স্তম্ভ মেঝের সঙ্গে পুরোপুরি সংযুক্ত নয় বলে বিশেষভাবে পরিচিত। এর নিচের ফাঁক দিয়ে পাতলা কাপড় গলিয়ে দেওয়া যায়। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে স্তম্ভটি পর্যটকদের মধ্যে বাড়তি কৌতূহল তৈরি করে। তবে এর নির্মাণকৌশল নিয়ে প্রচলিত নানা ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

মন্দিরের কাছেই রয়েছে বিশালাকার নন্দীমূর্তি, যা একটি বড় গ্রানাইট পাথর থেকে খোদাই করা হয়েছে বলে পরিচিত। অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত লেপাক্ষী ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। বেঙ্গালুরু থেকে সড়কপথে প্রায় আড়াই ঘণ্টায় এখানে পৌঁছানো যায়, যদিও যাত্রার সময় যানজট ও রুটের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে।

৪. চাঁদ বাওড়ি, রাজস্থান

রাজস্থানের আভানেরী গ্রামে অবস্থিত চাঁদ বাওড়ি ভারতের প্রাচীন জল সংরক্ষণব্যবস্থার এক অসাধারণ উদাহরণ। নবম শতকে নির্মিত এই গভীর সিঁড়িযুক্ত জলাধারটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে পানি সংগ্রহ করা যায়।

জলাধারটির গভীরতা প্রায় ১৩ তলার সমান। এর চারপাশে রয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার পাথরের সিঁড়ি। সিঁড়িগুলো এমন জ্যামিতিক বিন্যাসে সাজানো যে ওপর থেকে দেখলে পুরো কাঠামোটি জটিল নকশার মতো মনে হয়। দীর্ঘদিন ধরে পানির ব্যবহার ও সংরক্ষণে এ ধরনের স্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

চাঁদ বাওড়ির এক পাশে রয়েছে স্তম্ভযুক্ত স্থাপত্যাংশ, যা স্থানটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে। শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, প্রাচীন ভারতের প্রকৌশলজ্ঞান ও পানিব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ধারণা পেতেও এই স্থাপনাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

৫. পদ্মনাভপুরম প্রাসাদ, তামিলনাড়ু

তামিলনাড়ুর কন্যাকুমারী জেলায় অবস্থিত পদ্মনাভপুরম প্রাসাদ একসময় ত্রিবাঙ্কুর রাজ্যের রাজধানী হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কাঠনির্ভর নির্মাণশৈলী, সূক্ষ্ম কারুকাজ এবং ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের জন্য এটি ভারতের অন্যতম উল্লেখযোগ্য রাজপ্রাসাদ।

প্রাসাদের বিভিন্ন অংশে কাঠের ছাদ, স্তম্ভ ও দেয়ালে দেখা যায় নিপুণ নকশা। মেহগনি ও সেগুনের মতো কাঠের ব্যবহার স্থাপনাটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। প্রাসাদের মেঝেতেও রয়েছে বিশেষ নির্মাণশৈলীর ছাপ, যা দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকার কারণে দর্শনার্থীদের আগ্রহ তৈরি করে।

রাজকীয় আবাসন, ঐতিহাসিক আসবাব ও স্থাপত্যের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখলে তৎকালীন রাজপরিবারের জীবনযাপন এবং নির্মাণরুচি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তিরুঅনন্তপুরম থেকে সড়কপথে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে এই প্রাসাদ অবস্থিত।

৬. জিঞ্জি দুর্গ, তামিলনাড়ু

তামিলনাড়ুর জিঞ্জি দুর্গ একসময় দক্ষিণ ভারতের সামরিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করেছিল। তিনটি পাথুরে পাহাড়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই দুর্গের প্রাকৃতিক অবস্থান একে প্রতিরক্ষার জন্য বিশেষ সুবিধা দিয়েছিল।

১৬৭৭ সালে ছত্রপতি শিবাজীর নেতৃত্বে মরাঠারা দুর্গটি দখল করেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। দুর্গের ভেতরে রয়েছে সাততলা কল্যাণ মহল, রাজকীয় স্নানাগার, শস্য সংরক্ষণের বিশাল স্থাপনা এবং বিভিন্ন প্রতিরক্ষা কাঠামোর নিদর্শন।

পাহাড়ের ওপরের অংশে পৌঁছাতে পাথুরে পথ ও খাড়া সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। ফলে দুর্গটি ঘুরে দেখতে যেমন ইতিহাসের স্বাদ পাওয়া যায়, তেমনি চোখে পড়ে আশপাশের বিস্তৃত প্রাকৃতিক দৃশ্য। পুদুচেরি থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই দুর্গ ভ্রমণের জন্য সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় আরামদায়ক।

৭. বাসগো রাজপ্রাসাদ ও বৌদ্ধ গুম্ফা, লাদাখ

লাদাখের লেহ থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বাসগো ঐতিহাসিক স্থাপনা ও বৌদ্ধ ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত। সিন্ধু নদের উপত্যকার কাছাকাছি এই এলাকায় রয়েছে প্রাচীন দুর্গ ও রাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ। একসময় বাসগো লাদাখের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

মাটি, পাথর ও কাঠের সমন্বয়ে নির্মিত পুরোনো স্থাপনাগুলোর অনেক অংশ সময়ের সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ধ্বংসাবশেষের মধ্যেও টিকে রয়েছে কয়েকটি বৌদ্ধ গুম্ফা। সেগুলোর ভেতরে প্রাচীন দেয়ালচিত্র বা ফ্রেস্কো এবং মৈত্রেয় বুদ্ধের মূর্তি দেখা যায়।

পাহাড়ি পরিবেশ, পুরোনো স্থাপত্য ও ধর্মীয় শিল্পকলার মেলবন্ধন বাসগোকে অন্য ধরনের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা দেয়। মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সাধারণত লাদাখ ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। তবে উচ্চতা, আবহাওয়া ও সড়কের পরিস্থিতি বিবেচনা করে যাত্রার পরিকল্পনা করা জরুরি।

ইতিহাস ও স্থাপত্যের অন্য রকম অভিজ্ঞতা

ভারতের এই সাতটি স্থান শুধু পুরোনো স্থাপনার সংগ্রহ নয়। এগুলোর প্রতিটিতে ধরা রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন সময়ের ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস, সামরিক কৌশল, পানি সংরক্ষণের প্রযুক্তি ও নির্মাণশিল্পের বিকাশ। কোথাও পাথর খোদাইয়ের দক্ষতা, কোথাও কাঠের কারুকাজ, আবার কোথাও প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি হয়েছে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা।

পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রের বাইরে ইতিহাসের সন্ধানে যেতে চাইলে এসব স্থান ভ্রমণতালিকায় রাখতে পারেন। তবে যাওয়ার আগে স্থানীয় প্রবেশবিধি, যাতায়াতব্যবস্থা ও দর্শনীয় স্থানের সময়সূচি যাচাই করে নেওয়া ভালো।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

সর্বশেষ সংবাদ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G