জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেও কেন অভিনয় ছেড়েছিলেন নায়িকা শাবানা
মাত্র আট বছর বয়সে চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু। এরপর টানা প্রায় ৩৫ বছর অভিনয় করে বাংলা সিনেমার ইতিহাসে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন শাবানা। জনপ্রিয়তা, দর্শকের ভালোবাসা আর একের পর এক সফল সিনেমা তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল খ্যাতির শীর্ষে। অথচ ক্যারিয়ারের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়েই হঠাৎ অভিনয় থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এরপর স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। প্রশ্ন উঠেছিল, এত বড় একটি ক্যারিয়ার ছেড়ে কেন দূরে সরে গেলেন এই জনপ্রিয় অভিনেত্রী?
শাবানার পুরো নাম আফরোজা সুলতানা রত্না। বাংলা চলচ্চিত্রে তিনি পরিচিতি পেয়েছিলেন শাবানা নামেই। তাঁর অভিনয়জীবনের শুরু শিশুশিল্পী হিসেবে হলেও পরবর্তী সময়ে নায়িকা, ভাবি ও মায়ের মতো নানা চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের মন জয় করেন। দীর্ঘদিনের কর্মজীবনে অসংখ্য জনপ্রিয় সিনেমা উপহার দিয়েছেন তিনি। তবে চলচ্চিত্র থেকে বিদায় নেওয়ার পেছনে ছিল ব্যক্তিগত জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। সন্তানদের যথাযথভাবে বড় করা এবং তাদের পাশে থাকার প্রয়োজনীয়তা থেকেই অভিনয়জগৎ ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন শাবানা।
শিশুশিল্পী থেকে জনপ্রিয় নায়িকা
ষাটের দশকের শুরুতে পরিচালক এহতেশামের ‘নতুন সুর’ চলচ্চিত্রে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে শাবানার সিনেমায় পথচলা শুরু হয়। তখন তিনি পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। পরিবারের পরিচিতজন এহতেশামের আগ্রহেই প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ পান তিনি।
শুরুর দিকে শাবানা ছিলেন বেশ লাজুক। অভিনয়ে তাঁকে যুক্ত করার প্রস্তাব পেয়ে তাঁর বাবা ফয়েজ চৌধুরীও প্রথমে কিছুটা দ্বিধায় ছিলেন। তবে পরিচালকের আগ্রহ এবং উৎসাহে শেষ পর্যন্ত সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ তৈরি হয়। প্রথম ছবিতেই ক্যামেরার সামনে স্বাভাবিক অভিনয় করে সবার নজর কাড়েন শাবানা।
১৯৬৭ সালে এহতেশাম পরিচালিত উর্দু চলচ্চিত্র ‘চকোরী’তে নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক সিনেমায় অভিনয় করে অল্প সময়েই জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। পর্দায় বিভিন্ন বয়স ও সম্পর্কের চরিত্রে সাবলীল অভিনয় তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা পরিচিতি দেয়।
শাবানার বাবা ফয়েজ চৌধুরীও চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরিচালক আজিজুর রহমানের উৎসাহে তিনি চলচ্চিত্র পরিচালনা শুরু করেন। তাঁর পরিচালিত সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘মুক্তি’, ‘মালকাবানু’, ‘বিজয়িনী সোনাভান’, ‘আলতাবানু’ ও ‘রাজার মেয়ে বেদিনী’। বাবার পরিচালনায়ও অভিনয় করেছেন শাবানা। ফলে চলচ্চিত্রের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শুধু পেশাগত ছিল না, এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল পারিবারিক স্মৃতিও।
প্রায় ৩০০ সিনেমায় অভিনয়
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে শাবানা বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। বিভিন্ন সূত্রে তাঁর অভিনীত সিনেমার সংখ্যা ২৯৯ বলে উল্লেখ করা হয়। তাঁর জনপ্রিয় জুটিগুলোর মধ্যে ছিলেন আলমগীর ও নায়করাজ রাজ্জাক। আলমগীরের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি। এই জুটির ছবির সংখ্যা প্রায় ১৩০ বলে জানা যায়।
অভিনয়ে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিও পেয়েছেন শাবানা। তাঁর ঝুলিতে রয়েছে ১১টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। পাশাপাশি দেশের চলচ্চিত্রে দীর্ঘদিনের অবদানের জন্য পেয়েছেন আজীবন সম্মাননা। অভিনয়ের বৈচিত্র্য, পর্দায় উপস্থিতি এবং সহশিল্পীদের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতা তাঁকে দর্শকের কাছে দীর্ঘদিন জনপ্রিয় রেখেছে।
এত দীর্ঘ সময় ধরে চলচ্চিত্রে কাজ করার কারণে শুটিং, সহশিল্পী ও পরিচালকদের সঙ্গে গড়ে উঠেছিল গভীর সম্পর্ক। তাই অভিনয় থেকে সরে দাঁড়ানো তাঁর জন্য সহজ কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না।
কেন অভিনয় ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান?
শাবানার অভিনয় ছাড়ার সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে ছিল তাঁর সন্তানদের ভবিষ্যৎ। কাজের ব্যস্ততায় জীবনের দীর্ঘ সময় কেটে যাওয়ায় সন্তানদের সঙ্গে পর্যাপ্ত সময় কাটানোর প্রয়োজন অনুভব করেন তিনি। বিশেষ করে সন্তানদের পড়াশোনা, বেড়ে ওঠা এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মায়ের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন এই অভিনেত্রী।
বড় মেয়ে সুমী এ লেভেল শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। পরে ছোট মেয়ে ঊর্মি ও ছেলে নাহিনও সেখানে পাড়ি জমান। সন্তানরা একে একে দেশের বাইরে চলে যাওয়ার পর তাদের থেকে দূরে থেকে শুধু অভিনয় নিয়ে ব্যস্ত থাকা শাবানার কাছে আর স্বস্তিকর মনে হয়নি।
তাঁর উপলব্ধি ছিল, পেশাগত সাফল্য যত বড়ই হোক, সন্তানদের মানুষ করে তোলার দায়িত্বও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের কর্মজীবন তাঁকে পরিচিতি ও সম্মান এনে দিয়েছিল। কিন্তু সন্তানদের বেড়ে ওঠার সময়টুকু হারিয়ে ফেলতে চাননি তিনি। সেই ভাবনা থেকেই প্রিয় চলচ্চিত্রজগৎ ছেড়ে পরিবারের দিকে মনোযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
শাবানা এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, অভিনয়ের ব্যস্ততার মধ্যেও আগে সন্তানদের চোখের সামনে দেখতে পেতেন। কিন্তু তারা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে চলে যাওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। সন্তানরাও মাকে কাছে পেতে চাইত। এ অবস্থায় তাদের পাশে থাকা এবং ভবিষ্যৎ গড়ে তোলায় সহযোগিতা করাকে নিজের দায়িত্ব বলে মনে করেন তিনি।
স্বামী ওয়াহিদ সাদিকের সহযোগিতা
অভিনয় ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে শাবানার স্বামী ওয়াহিদ সাদিক গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা করেন। চলচ্চিত্র প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত ওয়াহিদ সাদিকের সেখানে ব্যবসার সুযোগও ছিল। ফলে পরিবারের সবাইকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস শুরু করা তাঁদের জন্য সম্ভব হয়।
শাবানার কাছে চলচ্চিত্রজগৎ ছিল আরেকটি পরিবারের মতো। দীর্ঘ সময় ধরে সহশিল্পী, পরিচালক ও কলাকুশলীদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে আত্মীয়তার মতো সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সেই পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে আসার কষ্টও ছিল। তবে জীবনের একটি পর্যায়ে এসে পরিস্থিতি বিবেচনায় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার পরও চলচ্চিত্রের সহকর্মীদের স্মৃতি তাঁর মনে রয়ে গেছে। একসময় যাঁদের সঙ্গে নিয়মিত দেখা হতো, কাজের ব্যস্ততায় যাঁদের সঙ্গে দিনের পর দিন কাটত, তাঁদের কাছ থেকে দূরে থাকা সহজ ছিল না। তবু সন্তানদের ভবিষ্যৎকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন তিনি।
সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত হতে দেখে তৃপ্তি
পরিবারকে সময় দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর বহু বছর কেটে গেছে। এর মধ্যে শাবানার সন্তানরা নিজেদের শিক্ষাজীবন শেষ করে কর্মজীবন ও সংসার শুরু করেছেন। বড় মেয়ে সুমী ইকবাল এমবিএ সম্পন্ন করে বিয়ে করেছেন। ছোট মেয়ে ঊর্মি সাদিক হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করেছেন। ছেলে নাহিন সাদিক রটগার্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছেন এবং বিয়ে করে সংসার শুরু করেছেন।
সন্তানদের শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা শাবানার জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি। অভিনয়জীবনে যে পরিমাণ সময় ও শ্রম দিয়েছেন, পরিবারের জন্য নেওয়া সিদ্ধান্তের ফলেও তিনি পেয়েছেন আলাদা তৃপ্তি।
শৈশব থেকে অভিনয়ে যুক্ত থাকার কারণে নিজের জন্য আলাদা করে সময় বের করার সুযোগ খুব কম ছিল তাঁর। শুটিংয়ের ব্যস্ততায় জীবনের প্রায় সাড়ে তিন দশক কেটে যায়। তাই একটা পর্যায়ে পরিবারকে সময় দেওয়াকে নিজের জীবনের জরুরি প্রয়োজন হিসেবে দেখেন তিনি। তাঁর কাছে সন্তানদের সঠিকভাবে গড়ে তোলা ছিল অভিনয়জীবনের সাফল্যের বাইরেও একটি বড় দায়িত্ব।
যুক্তরাষ্ট্রে বসেও দেশের সিনেমার খোঁজ রাখেন
চলচ্চিত্রে অভিনয় না করলেও বাংলাদেশের সিনেমার প্রতি শাবানার আগ্রহ পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রে বসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবের মাধ্যমে দেশের চলচ্চিত্র সম্পর্কে যতটা সম্ভব খোঁজ রাখেন তিনি।
ঢাকায় থাকাকালে শাকিব খানের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল। স্বামী ওয়াহিদ সাদিকের একটি সিনেমা নির্মাণের পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে শাকিবের সঙ্গে তাঁদের বাসায় কথাবার্তাও হয়। শাবানার স্মৃতিতে, শাকিব খান ছিলেন সুদর্শন, ভদ্র ও অমায়িক একজন মানুষ।
পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে থাকাকালে শাকিব খানের সঙ্গে ফোনেও কথা বলার সুযোগ হয়েছিল তাঁর। দেশের সিনেমা নিয়ে আলোচনা হলে শাকিবের নাম বেশি শোনা যায় বলে জানিয়েছেন শাবানা। বাংলাদেশের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাঁর সিনেমা মুক্তি পাওয়াকে দেশের চলচ্চিত্রের জন্য আনন্দের ও গর্বের বিষয় হিসেবে দেখেন তিনি।
অভিনয়ে ফেরার সম্ভাবনা কতটা?
বিভিন্ন সময়ে শাবানার চলচ্চিত্রে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে বেগম রোকেয়ার জীবনভিত্তিক একটি চলচ্চিত্রে তাঁকে দেখা যেতে পারে, এমন কথাও শোনা গিয়েছিল। তবে এখন আর অভিনয়ে ফেরার আগ্রহ নেই বলে জানিয়েছেন এই বরেণ্য শিল্পী।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর জীবনের ব্যস্ততার ধরনও বদলেছে। এখন সন্তান, নাতি-নাতনি ও পরিবারকে ঘিরেই সময় কাটে। মাঝেমধ্যে পুরোনো সিনেমার স্মৃতি মনে করেন। পরিবারের ছোট সদস্যরাও তাঁর অভিনীত ছবি নিয়ে জানতে চায়। তখন তাদের পুরোনো সিনেমা দেখতে বলেন তিনি।
একসময় শুটিংয়ের ব্যস্ততায় দিন-রাত কাটানো শাবানার জীবনে এখন চলচ্চিত্রের সেই কর্মচাঞ্চল্য নেই। কিন্তু দর্শকের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তা এখনো অটুট। টেলিভিশনে পুরোনো সিনেমা প্রচারিত হলে নতুন প্রজন্মের দর্শকেরাও তাঁর অভিনয় দেখার সুযোগ পান।
জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকার সময় চলচ্চিত্র ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল জীবনের একটি বড় মোড়। পেশাগত সাফল্যের পাশাপাশি মাতৃত্বের দায়িত্বকে গুরুত্ব দিয়ে তিনি যে পথ বেছে নিয়েছিলেন, আজ সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত জীবন দেখে সেই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হয়। রুপালি পর্দায় আর নিয়মিত দেখা না গেলেও বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে শাবানার নাম এবং তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো দর্শকের স্মৃতিতে রয়ে গেছে।
প্রতি / এডি / শাআ


















