জন্মের পরই শিশুর ডিজিটাল আইডি, মিলবে নানা সরকারি সুবিধা
বাংলাদেশে প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি একক ডিজিটাল পরিচয় (ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডি) চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে একটি শিশুর জন্মের পর থেকেই তার নামে একটি স্থায়ী ডিজিটাল আইডি তৈরি হবে। পরবর্তী সময়ে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সরকারি সব তথ্য, সনদ ও সেবা এই একটিমাত্র পরিচয়ের সঙ্গেই যুক্ত থাকবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ডিজিটাল আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’ শীর্ষক উদ্যোগের আওতায় এ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো নাগরিকদের জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল পরিচয় তৈরি করা, যাতে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে একই তথ্য বারবার জমা দেওয়ার প্রয়োজন না পড়ে এবং সরকারি সেবা গ্রহণ আরও সহজ হয়।
বর্তমানে প্রকল্পটি ধারণাপত্র (কনসেপ্ট পেপার) পর্যায়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়ার পর প্রকল্প বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানিয়েছেন আইসিটি বিভাগের কর্মকর্তারা।
জন্মের সঙ্গে তৈরি হবে স্থায়ী ডিজিটাল পরিচয়
পরিকল্পনা অনুযায়ী, কোনো হাসপাতালে শিশুর জন্ম হলে সেই তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থায় যুক্ত হবে। এরপর বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে সমন্বয় করে নবজাতকের জন্য একটি স্থায়ী ডিজিটাল আইডি তৈরি করা হবে।
যেসব শিশুর জন্ম হাসপাতালে নয়, তাদের জন্যও পৃথক ব্যবস্থার মাধ্যমে একই ধরনের ডিজিটাল পরিচয় তৈরি করা হবে। পরবর্তী সময়ে এই একটি আইডিই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্টসহ বিভিন্ন সরকারি সেবার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে।
এক প্ল্যাটফর্মে থাকবে নাগরিকের সব তথ্য
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ভূমি ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএসহ বিভিন্ন সরকারি ডাটাবেজ একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা হবে।
এ জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, নির্বাচন কমিশন, বিটিআরসি, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় করা হবে।
নাগরিকের অনুমতি ছাড়া তথ্য শেয়ার নয়
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সব তথ্য একই প্ল্যাটফর্মে থাকলেও নাগরিকের সম্মতি ছাড়া কোনো তথ্য অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়া হবে না।
ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন এবং জাতীয় ডেটা গভর্ন্যান্স নীতিমালার আলোকে এই ব্যবস্থা পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠানের শুধু বয়স যাচাইয়ের প্রয়োজন হলে পুরো ব্যক্তিগত তথ্য নয়, নাগরিকের অনুমতি সাপেক্ষে কেবল প্রয়োজনীয় তথ্যই শেয়ার করা হবে।
থাকবে ডিজিটাল আইডি ওয়ালেট
প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি স্মার্টফোনভিত্তিক ডিজিটাল ওয়ালেট চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এই ওয়ালেটে ডিজিটাল পরিচয়পত্র, প্রয়োজনীয় সরকারি সনদ এবং অন্যান্য ডিজিটাল ক্রেডেনশিয়াল সংরক্ষণ করা যাবে।
এটি সরকারি ওয়েবসাইটে লগইন, পরিচয় যাচাই এবং প্রয়োজন হলে ফিজিক্যাল পরিচয়পত্রের বিকল্প হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে। তবে এটি আপাতত অর্থ লেনদেনের ওয়ালেট হিসেবে নয়, বরং পরিচয় ও সরকারি নথি সংরক্ষণের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ভাবা হচ্ছে।
বিদেশি অভিজ্ঞতা অনুসরণ
প্রকল্প বাস্তবায়নে এস্তোনিয়া ও সিঙ্গাপুরের ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডেন্টিটি মডেল পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রয়োজন ও বাস্তবতা বিবেচনায় একটি নিরাপদ ও কার্যকর কাঠামো তৈরির কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ডি-স্টার প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়নের পরিকল্পনা
এই উদ্যোগটি বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় পরিচালিত ডিজিটাল সার্ভিস ট্রান্সফরমেশন ফর অ্যাক্সেস অ্যান্ড রিজিলিয়েন্স (ডি-স্টার) প্রকল্পের সঙ্গে সমন্বয় করে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে একজন নাগরিকের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব সরকারি পরিচয়, সনদ এবং ডিজিটাল সেবা একটি একক পরিচয়ের আওতায় চলে আসবে। ফলে সরকারি সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও দ্রুত, সহজ ও ঝামেলামুক্ত হবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ জানিয়েছেন, দেশের ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (ডিপিআই) গড়ে তোলার কাজ শুরু হবে। এর অংশ হিসেবেই ‘এক নাগরিক, এক ডিজিটাল আইডি, এক ডিজিটাল ওয়ালেট’ কাঠামো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতে দেশের ডিজিটাল সেবা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
প্রতি / এডি / শাআ









