বাংলাদেশে ফুটছে দুর্লভ টিউলিপ

প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৬ সময়ঃ ৯:১৭ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৯:১৭ অপরাহ্ণ

শীতের সকালের কুয়াশা যখন ধীরে ধীরে সরে যায়, তখন উত্তর আকাশের নিচে হঠাৎই দেখা মেলে রঙের বিস্ফোরণ। লাল, হলুদ, গোলাপি, বেগুনি—সাজানো সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা টিউলিপ যেন জানিয়ে দেয়, প্রকৃতি কখনও কল্পনার চেয়েও বেশি উদার হতে পারে। একসময় যে ফুলকে কেবল ইউরোপের মাঠেই ভাবা হতো, আজ তা ফুটছে বাংলাদেশের মাটিতেও—আশা, পর্যটন আর নতুন কৃষি সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে।

তেঁতুলিয়ায় ‘ছোট্ট নেদারল্যান্ডস’

উত্তরের সীমান্তঘেঁষা তেঁতুলিয়া—যে জায়গাটি আগে পরিচিত ছিল চা-বাগান আর কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্যের জন্য—সেই জনপদ এখন টিউলিপের জন্যও আলোচনায়। পঞ্চগড় জেলার এই এলাকায় শীতপ্রধান আবহাওয়া টিউলিপ চাষের জন্য তুলনামূলকভাবে উপযোগী। নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা, বিশেষ মাটির প্রস্তুতি আর আমদানিকৃত বাল্ব ব্যবহার করে এখানে কয়েক বছর ধরে পরীক্ষামূলক ও বাণিজ্যিকভাবে টিউলিপ চাষ হচ্ছে।

ফুল ফুটতে শুরু করলেই দর্শনার্থীদের ঢল নামে। মাঠজুড়ে রঙিন কার্পেটের মতো বিছানো টিউলিপের সারি যেন মুহূর্তেই বদলে দেয় গ্রামবাংলার চিরচেনা দৃশ্য।

শুধু সৌন্দর্য নয়, অর্থনীতির গল্পও:

টিউলিপ চাষ সহজ নয়। বাল্ব সংরক্ষণ, নির্দিষ্ট সময় রোপণ, ঠান্ডা আবহাওয়া নিশ্চিত করা—সবকিছুই পরিকল্পিতভাবে করতে হয়। তবু কৃষকেরা ঝুঁকি নিচ্ছেন, কারণ এই ফুলের বাণিজ্যিক মূল্য বেশি। পর্যটকদের প্রবেশমূল্য, ফুল বিক্রি, স্থানীয় হস্তশিল্প ও খাবারের দোকান—সব মিলিয়ে একটি মৌসুমি অর্থনৈতিক চক্র তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে নারীদের অংশগ্রহণে পরিচালিত কিছু প্রকল্প স্থানীয় পরিবারে বাড়তি আয় ও আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। ফলে টিউলিপ কেবল একটি ফুল নয়, এটি হয়ে উঠছে বিকল্প কৃষি উদ্যোগের উদাহরণ।

ঢাকাতেও টিউলিপের বাগান

রাজধানীতেও শীতকালে টিউলিপের দেখা মেলে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পরীক্ষামূলকভাবে টিউলিপ চাষ করা হয়েছে কয়েক দফা। শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য এটি যেমন গবেষণার বিষয়, তেমনি সাধারণ দর্শনার্থীদের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে ফুল ফোটার সময়।

এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন নার্সারি ও বেসরকারি উদ্যোগেও সীমিত পরিসরে টিউলিপ চাষের চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।

পাহাড়ে নতুন পরীক্ষা

পাহাড়ি অঞ্চলেও টিউলিপ চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাঙামাটি ও বান্দরবান–এর কিছু উঁচু এলাকায় শীতকালে তাপমাত্রা তুলনামূলক কম থাকায় পরীক্ষামূলকভাবে বাল্ব রোপণ করা হয়েছে। যদিও বড় পরিসরে বাণিজ্যিক সাফল্য এখনো সীমিত, তবে সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

টিউলিপ কেন বিশেষ?

টিউলিপ মূলত শীতপ্রধান দেশের ফুল। বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎপাদক দেশ নেদারল্যান্ডস। সেখানে বসন্তে টিউলিপ উৎসব আন্তর্জাতিক পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ। সেই ঐতিহ্যের অনুপ্রেরণায় বাংলাদেশেও শীতকালীন পর্যটন বাড়াতে টিউলিপকে কেন্দ্র করে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

টিউলিপের জীবনচক্র তুলনামূলক ছোট—ফুল সাধারণত কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয়। তাই অল্প সময়ের মধ্যেই দর্শনার্থীদের আকর্ষণ তৈরি করতে হয়। এই ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্যই যেন এর সবচেয়ে বড় আবেদন।

সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিউলিপ চাষে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও বাল্ব সংরক্ষণ। দেশে প্রাকৃতিকভাবে দীর্ঘ শীত না থাকায় কৃত্রিম শীতলীকরণ ব্যবস্থার প্রয়োজন হয় অনেক সময়। এতে খরচ বাড়ে। তবে সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তি ও বাজারব্যবস্থা গড়ে উঠলে এটি লাভজনক খাতে পরিণত হতে পারে।

রঙিন ভবিষ্যতের ইঙ্গিত

বাংলাদেশে টিউলিপ এখনো মৌসুমি ও সীমিত পরিসরের চাষ। তবু প্রতি বছর শীত এলে মানুষ অপেক্ষা করে থাকে—কবে ফুটবে সেই রঙিন ফুল। কারণ টিউলিপ মানেই একটু ভিন্ন স্বাদ, একটু ইউরোপীয় ছোঁয়া, আর অনেকখানি স্বপ্ন।

সব মিলিয়ে টিউলিপ আজ কেবল একটি বিদেশি ফুল নয়; এটি হয়ে উঠছে বাংলাদেশের শীতের নতুন পরিচয়, গ্রামীণ উদ্যোক্তার সাহসী পদক্ষেপ এবং পর্যটনের সম্ভাবনাময় অধ্যায়ের সূচনা।

প্রতি / এডি /শাআ

আরো সংবাদঃ

মন্তব্য করুনঃ

পাঠকের মন্তব্য

20G