সংবিধান পরিবর্তন ও সংস্কার ইস্যুতে আপত্তি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকেই সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে নানা ইস্যুতে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। শুরুতেই রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় হট্টগোল ও ওয়াকআউটের মাধ্যমে বিরোধী দল তাদের অবস্থান জানায়। এরপর সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে নতুন করে বিরোধ বাড়ে, যা সংসদের ভেতর থেকে বাইরে পর্যন্ত উত্তেজনা ছড়িয়ে দেয়।
প্রথম অধিবেশনের সাত দিনের মধ্যেই বিরোধী দল দুইবার ওয়াকআউট করে। তাদের অভিযোগ, গণভোটে জনগণ সংবিধান সংস্কারের পক্ষে মত দিলেও সরকার সংশোধনের পথে এগোতে চায়, যা জনমতের পরিপন্থী।
সংস্কার বনাম সংশোধন: দুই পক্ষের ভিন্ন অবস্থান
সরকারি দল জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে বিরোধীরা চায় একটি পৃথক সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে পূর্ণাঙ্গ সংস্কার করা হোক। এই দুই অবস্থানের কারণে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
এদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। শনিবার রাজধানীতে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করার পরিকল্পনাও তারা জানিয়েছে।
সংসদে মুলতবি প্রস্তাব ও বিরল নজির
সংবিধান নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে সরকারি দল সংসদে একটি মুলতবি প্রস্তাব আনে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ৫ এপ্রিল এ বিষয়ে আলোচনার জন্য সময় নির্ধারণ করেন। তিনি এটিকে সংসদের ইতিহাসে বিরল ঘটনা বলে উল্লেখ করেন, কারণ সরকারি দলের আনা মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণের ঘটনা আগে ঘটেনি।
তবে এ প্রস্তাব উত্থাপনের আগেই বিরোধী দল সংসদ থেকে বেরিয়ে যায়। এর আগে তারা সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বানের দাবিতে একটি প্রস্তাব দিলেও সেটি থেকে কার্যকর সিদ্ধান্ত আসেনি বলে অভিযোগ করে।
বিরোধীদের অভিযোগ
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণভোটে জনগণ সংস্কারের পক্ষে মত দিলেও সরকার তা উপেক্ষা করছে। তার ভাষায়, সংশোধন ও সংস্কার এক বিষয় নয়, এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকার ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি আরও জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান না করায় বিরোধীরা বাধ্য হয়ে সংসদে বিষয়টি তোলে। কিন্তু সরকার ভিন্ন পথে এগোনোর চেষ্টা করছে বলে তাদের অভিযোগ।
রাজপথে কর্মসূচির প্রস্তুতি
বিরোধী জোট ইতোমধ্যে রাজপথে আন্দোলনের ইঙ্গিত দিয়েছে। গুলশানে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর জোটের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ জানান, দাবি আদায়ে তারা মাঠে নামতে প্রস্তুত। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি মানা না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির ঘোষণাও আসতে পারে।
উত্তেজনা না বাড়ানোর আহ্বান বিশ্লেষকদের
রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্লেষকরা সতর্কতা জানিয়েছেন। তাদের মতে, গণভোটে যে বিষয়ে জনগণ মত দিয়েছে, তা বাস্তবায়ন নিয়েই এখন ঐকমত্য হওয়া উচিত। অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এই বিরোধ দীর্ঘ হলে তা রাজপথে গড়াতে পারে, যা কারও জন্যই ভালো হবে না। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানোর আহ্বান জানান।
সংসদের ভূমিকা নিয়ে মতামত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, একটি কার্যকর সংসদের মূল কাজ হলো আইন প্রণয়ন এবং সমস্যার সমাধান করা। অপ্রয়োজনীয় বিরোধ বা ব্যক্তিগত আক্রমণ সংসদের পরিবেশ নষ্ট করে।
তিনি বলেন, বিরোধীদের সংসদের ভেতরেই সমাধান খোঁজার চেষ্টা করা উচিত। রাজপথে আন্দোলনের ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়তে পারে, যা কাম্য নয়।
সমঝোতার ওপর জোর
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপই একমাত্র কার্যকর পথ। পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতি / এডি / শাআ












