ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জ্বলছে সুদান, নীল নদের তীরে আজ রক্ত ও ধ্বংসস্তূপ

প্রকাশঃ নভেম্বর ১০, ২০২৫ সময়ঃ ৬:২১ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৬:২২ অপরাহ্ণ

 

 

সাহারার দক্ষিণ প্রান্তে, নীল নদের দু’কূল জুড়ে গড়ে ওঠা সুদান — এক সময় আফ্রিকার শস্যভাণ্ডার এবং তুলা, গম ও তৈলবীজের বৃহৎ উৎপাদক ছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া সামরিক বাহিনী (SAF) ও আধাসামরিক Rapid Support Forces (RSF)-এর মধ্যে সংঘর্ষ দেশটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে; এতে গত দুই বছরের মধ্যে লক্ষাধিক মানুষ নিহত ও লাখলাখ লোক বাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে—এবং আধা দেশের মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটের মুখে।

 

সংঘাতের শুরু—ক্ষমতার লড়াই

২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া সংঘাতের মূল কারণ হচ্ছে ক্ষমতার কুণ্ডলি: সেনাবাহিনীকে নেতৃত্ব দেন জেনারেল আবদেল ফত্তাহ আল-বুরহান, আর আধাসামরিক বাহিনী RSF-এর নেতৃত্বে আছেন জেনারেল মোহাম্মদ হামদান (হেমেদতি) দাগালো। দু’পক্ষের মধ্যকার দখলদারিত্ব ও ক্ষমতা বজায় রাখার লড়াই দ্রুত শহর ও গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে, শান্তিপূর্ণ নাগরিকদের উপর আক্রমণের ঘটনা বাড়ে।

 

মানবিক এপিক্যালিপ্স—ক্ষুধা ও গৃহহীনতা

সংঘাত ও ব্যবস্থাপনার ভাঙনে খাদ্য উৎপাদন থমকে গেছে; বিস্তীর্ণ কৃষিজমি অপারগ। জাতিসংঘ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো জানিয়েছে যে সহস্রাধিক পরিবার গৃহহীন এবং প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তা সংকটে — ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামের মতে এখন প্রায় ২১ মিলিয়ন (প্রায় জনসংখ্যার ৪৫%) মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটের মুখে। অনেক অঞ্চলে দুর্ভিক্ষের অবস্থা বা দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

দারফুর—নৃশংসতা ও জাতিগত টার্গেটিং

দারফুর অঞ্চল বিশেষত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো RSF ও তার সহযোগী মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, নৃশংসতা ও জাতিগত নির্মূলের অভিযোগ তুলেছে; বহু অনারব উপজাতিকে টার্গেট করে হত্যাকাণ্ড ও নির্বাসন ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্টে এই অঞ্চলে ব্যাপক হিংসা ও সম্ভাব্য জাতিগত নিরাময়ের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

 

আল-ফাশির (El Fasher) এবং শিশুদের ভয়াবহ বাস্তবতা

দারফুরের শহর আল-ফাশির ও আশপাশে নৃশংস আক্রমণের খবর বারবার আসছে। ইউনিসেফ ও অন্যান্য সংস্থার রিপোর্টে শিশু ও পরিবার শিবিরগুলোতে হামলা, হাসপাতাল লক্ষ্য করে বিমান-ঘাঁটনি বা ড্রোন হামলার ফলে প্রচুর হতাহতের তথ্য পাওয়া গেছে; ইউনিসেফ সন্দেহভাজন হামলায় শিশুসহ অসংখ্য প্রাণহানির কথা জানিয়েছে। কন্ট্রোল ও যোগাযোগ বিঘ্নিত এলাকাগুলোতে যথাযথ তথ্য যাচাই করা কঠিন হলেও স্থলভিত্তিক ও উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ থেকে ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে।

 

স্বর্ণ, বাহ্যিক সহযোগিতা ও সংঘাতের অর্থনীতি

সংঘাতে জড়িত অংশগুলোর অর্থনৈতিক উৎসগুলোও আলোচনায় এসেছে—বিশেষত দারফুরে স্বর্ণ সংক্রান্ত অভিযোগ। বিভিন্ন রিপোর্টে বলা হয়েছে যে স্বর্ণের অবৈধ পাচার এবং বহির্বিশ্বের কিছু অভিনেতার আর্থিক ও সামরিক সমর্থন যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করেছে; এসব অভিযোগের মধ্যে আরব আমিরাতের সঙ্গে স্বর্ণচাঞ্চল্য সম্পর্কেও আন্তর্জাতিক মিডিয়া বিশ্লেষণ উত্থাপন করেছে। এই আর্থিক লেনদেনগুলোর ফলে দখলদারিত্ব ও বিধ্বংসী লুটপাট আরও ত্বরান্বিত হয়েছে বলে নিরীক্ষকরা অভিমত দেন।

 

হাসপাতাল, স্কুল ও বেসামরিক অবকাঠামোর ধ্বংস

যুদ্ধে হাসপাতাল, স্কুল, বাজার ও পানিবিতরণ ব্যবস্থা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে; ফলে চিকিৎসা ও মৌলিক সেবার অভাব লক্ষণীয়। FAO, WFP ও UNICEF-এর যৌথ বিবৃতি অনুসারে এমন কিছু শহরে দুর্ভিক্ষের শর্তগুলো নিশ্চিত করা হয়েছে—তবে যুদ্ধে আক্রান্ত এলাকায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হওয়ায় চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না।

 

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও সীমিত কূটনৈতিক উদ্যোগ

জাতিসংঘ, আফ্রিকান ইউনিয়ন ও পশ্চিমা দেশগুলো ঘোর নিন্দা জানালেও কার্যকরী স্থায়ী সমাধান বা অসামরিক রক্ষার ব্যবস্থা চলে আসেনি। বিভিন্ন দেশে কূটনৈতিক চাপ ও সংকটস্থাপনে আলোচনার কথা থাকলেও মাঠে লড়াই থামেনি; ফলে মানবিক সংকট দিনে দিনে বাড়ছে। বিশ্ববাজারে সুদানের অবস্থা যথাযথ মনোযোগ পায় না বলেও বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন।

 

মানবতার ডাক — কি করা যায়

সুদানের জনগণকে রেডি-মেড সাহায্যের অতিগুরুতর প্রয়োজন: বীজ, কৃষি সাপ্লাই, জরুরি খাদ্য সহায়তা, চিকিৎসা সরঞ্জাম, নিরাপদ আশ্রয় এবং বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা দরকার। কিন্তু অর্থায়ন সংকট ও রাজনৈতিক জটিলতার কারণে সাহায্য কার্যক্রম সীমিত হচ্ছে — বিশেষত WFP-র ফান্ডশর্টফল ও দাতাদের অনিশ্চয়তার কারণে তাৎক্ষণিক সহায়তা ঝুঁকির সম্মুখীন।

 

সুদানের পতন কি আমাদের বিবেকের পরীক্ষা?

একদা আফ্রিকার সমৃদ্ধশালী কৃষিপ্রদেশ—সুদান—আজ যেন মৃত্যুর সন্নিকট। পাশ্চাত্য বা আঞ্চলিক শক্তির স্বার্থ, অস্ত্রচালান ও আর্থিক লোভ যখন ন্যায় ও মানবতার ওপর প্রাধান্য পায়, তখন অনাচারের দাম গুণতে হয় সাধারণ মানুষকে। ইতিহাস বলে দেবে আমরা কীভাবে আচরণ করলাম—নির্বিকার থেকে সক্রিয় সহায়তা পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ন্যায়বিচারের অংশ হবে।

আরো সংবাদঃ

সর্বশেষ সংবাদ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G