বিএনপি দলটা দেউলিয়া হওয়ার পথে
বিএনপি দলটি খুব সম্ভবত দেউলিয়া হওয়ার পথে। না—এটা টাকার দেউলিয়াত্ব নয়। যা ব্যাংক ব্যালান্সে ধরা পড়ে না, বিদেশি অ্যাকাউন্টেও না। এটা বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব।
যুক্তি, নৈতিকতা আর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ঘাটতি – এই তিনের যোগফলই আজকের বিএনপি।
দলের একেবারে ওপরের কর্মী থেকে শুরু করে নিচ পর্যন্ত—প্রায় সবাই এই পথেই হাঁটছে। চিন্তা নেই, দায় নেই, বিবেক নেই – আছে শুধু প্রতিহিংসা আর কুৎসা।
হাদির হত্যাকাণ্ডে বিএনপির নাম জড়িয়ে গেছে, যদিও তা স্পষ্ট করে কেউ বলছে না। কিন্তু হাদির জন্য মানুষের হৃদয়ভরা ভালবাসা বিএনপির কর্মীরা সহ্যই করতে পারছেন না। যার বহি:প্রকাশ ঘটেছে একের পর এক ঘটনায়, যেগুলো না বললেই নয়।
মসজিদের ইমামের চাকরি চলে গেছে হাদির জন্য দোয়া পড়ানোর অপরাধে। মাহফিলে হুজুরদের নিষেধ করা হয়েছে—আলোচনায় হাদির নাম না নিতে। হাদির মৃত্যুর পর বিএনপির একজন কর্মী তাকে পর্ন তারকা জনি সিন্সের সঙ্গে তুলনা করেছে।
হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর কেন সব জায়গায় জুমাকে দেখা যাচ্ছে, কেন হাদির স্ত্রীকে দেখা যাচ্ছে না—এই প্রশ্ন তুলে বিএনপির কর্মীরা জুমাকে অসংলগ্ন ভাষায় গালাগাল করছে।
এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো একটি বিষয়ই প্রমাণ করে—হাদির প্রতি বিএনপির কোনো সহানুভূতি নেই। আছে ঘৃণা, রাগ, তীব্র ক্ষোভ। আর তা থাকাটাই স্বাভাবিক। হাদি বিএনপির করা অপকর্ম নিয়ে ছিল ভোকাল। সে চুপ থাকেনি। সে ভয় পায়নি।
এই কারণেই যখন পুরো দেশ শোকে মুহ্যমান, তখন তারা তারেক জিয়ার প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে কনসার্টের আয়োজন করে। অথচ খালেদা জিয়া নিজেই মারাত্মক অসুস্থ। এই নিষ্ঠুর সময়বোধই বলে দেয়—এই দল কতটা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে মানুষের হৃদয় থেকে।
বিএনপির তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধি আজ মাথায় থাকে না—থাকে হাঁটুতে। যার কারণে স্বাভাবিক চিন্তাশক্তি এই দলের অধিকাংশেরই নেই। আগে যা ছিল, এখন তা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। মানুষের এত উন্মাদনা দেখেও বিএনপি বুঝতে পারলো না, শহীদ হাদি নিছক একটি নাম নয়; তিনি কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের অব্যক্ত অনুভূতি।
লুটপাট আর চাঁদাবাজি করতে করতে বিএনপি ভুলে গেছে দেশপ্রেম আর সততা বলতে কী বোঝানো হয়। কেন হাদির জানাজায় লক্ষ লক্ষ মানুষ উপস্থিত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল— তা বোঝার মতো মস্তিস্ক বিএনপির কারো আছে বলে মনে হলো না।
আচ্ছা, হাদি বেঁচে থাকলে কি বিএনপির অস্তিত্বের সংকট তৈরি হতো?
বিএনপির মতো প্রতিষ্ঠিত বড় দলও হাদির উদীয়মান জনপ্রিয়তা দেখে ভয় পেয়ে গেছে। তাঁর অবস্থান বিএনপি’র ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে। তাইতো সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতাসম্পন্ন ভারত,ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ আর আওয়ামী লীগের প্রাণের বন্ধু বিএনপি—সবাই আতঙ্কে ছিল। তাই হাদির মৃত্যু তাদের সবার কাছে খুব আকাঙ্ক্ষিত ছিল। অনেকটা মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মতো।
কিন্তু তারা বুঝতেই পারেনি জীবিত হাদির চেয়ে মৃত হাদি এত শক্তিশালী হয়ে উঠবে?
যদিও আমরা জানি, বিএনপির মস্তিস্কে মগজের চেয়ে গোবরের পরিমাণ অনেকটাই বেশি। তাইতো তারা কখন কী বলবে, কোথায় কী ধরণের আচরণ করবে, এগুলো বুঝতে না পেরে তালগোল পাকিয়ে ফেলে!
এই যেমন ধরুন টকশোতে চিৎকার করে নিজেদের বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য বিএনপি নিলুফার মনিকে পাঠালো। এ মহিলা প্রমাণ করে দিলো, গায়ে পোশাক থাকলেই সবাই সভ্য হয় না। এদের কেন টকশোর মতো জায়গায় চেয়ার-টেবিলে বসতে দেওয়া হয়—সেটা সত্যিই বোধগম্য নয়।
প্রতিদ্বন্দ্বীকে জবাব দিতে হলে দরকার যুক্তি, প্রজ্ঞা, আর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নৈতিকতার। কিন্তু এই মগজবিহীন মহিলা বিপ্লবী হাদিকে তুলনা করছেন ‘ব্যাঙ আর তেলাপোকা’র সঙ্গে। তিনি বলছেন—হাদি’র জানাজায় নাকি মেটিকুলাস প্ল্যান করে ১০–১২ লক্ষ মানুষ আনা হয়েছিল বিপ্লবী সরকার গঠনের জন্য!
শহীদ বিপ্লবী হাদিকে নিয়ে এমন কথা কোনো মানুষ সে সভ্য হোক বা অসভ্য যাই হোক না কেন; কীভাবে বলতে পারে, আমার ঠিক বোধগম্য হচ্ছে না।
এখন মূল পয়েন্টে আসা যাক, নিলুফারের কি ক্ষমা চাওয়া উচিত?
আসলে মানুষ মাত্রই ভুল করে। একথা যদি আমরা মেনে নিই তাহলেতো মানুষই ক্ষমা চায়বে, তাই না? মানুষ যখন অমানুষে পরিণত হয়, তখন ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ক্ষমা আসে অপরাধবোধ থেকে। গত দেড় বছরে বিএনপি দেশের মানুষের কাছে প্রমাণ করেছে—তাদের সেই বোধবুদ্ধি অনেক আগেই হারিয়ে গেছে।
হাসিনার অতিরিক্ত টর্চার বিবেকের চোখ খুলে দেওয়ার বদলে ; বিএনপিকে ব্যক্তিত্বহীন গিরগিটিতে পরিণত করেছে। আগুন যে সবাইকে খাঁটি করে না—বিএনপি’ই তার জলন্ত প্রমাণ।
জিয়া দম্পতির আদর্শে উজ্জ্বীবিত বহু দল ও মানুষ থাকলেও—জিয়ার নিজের দলের আদর্শ আজ মুজিবে গিয়ে ঠেকেছে। তারেক জিয়া দেশে আসছেন মুক্তিযুদ্ধের নয়া ব্যবসা নিয়ে। এই নতুন প্রোডাক্টের নাম ‘মুক্তিযুদ্ধ’। পতিত সরকারের ব্যবহৃত প্রোডাক্ট এবার বিএনপি ব্যবহার করবে। আগেরটা তো মার্কেট ফেইল করেছে!
আনন্দবাজার পত্রিকা বলছে—“তারেকের সঙ্গে ভারতের বন্ধুত্ব হয়ে গেছে”। এই খবর বাংলাদেশে ভাইরাল হলো। অথচ অহংকার আর আত্মবিশ্বাস কত বেশি হলে বিএনপি দেশের মানুষের মনে তৈরি হওয়া সংশয় দূর করার চেষ্টাও করল না!
তাই জনমনে প্রশ্ন জাগে— “বিল্পবী হাদিকে খুন করিয়েই কি তবে তারেক জিয়া দেশে ঢোকার অনুমতি পেল”?
বিএনপির কর্মীদের হোমওয়ার্ক দেওয়া হয়েছে—যেভাবেই হোক, শহীদ হাদিকে কলঙ্কিত করতে হবে। সেই চেষ্টা করতে গিয়ে নিলুফার আপা অনলাইনে জুতোপিটা খাচ্ছেন। অফলাইনে যে খাবেন না—তার কোনো গ্যারান্টি নেই। পরিস্থিতি ভালো দেখা যাচ্ছে না।
বিএনপির ভাইয়া-আপুরা,শহীদ বিল্পবী হাদির ওপর হোমওয়ার্ক করো। হাদিকে বুঝতে হলে পড়াশোনা লাগে, শুদ্ধ আত্মা লাগে, সততা লাগে।
“হাদি কে ?” —এই প্রশ্ন বাদ দাও।
প্রশ্ন করো—হাদি কী?
হাদি একটি বিপ্লব।
হাদি নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা।
হাদি বাংলাদেশের মাটি।
হাদি মানেই বাংলাদেশ।
তেলাপোকার ক্ষুদ্র মাথায় সবাইকে তেলাপোকা মনে হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু ইতিহাস তেলাপোকাকে মনে রাখে না—
ইতিহাস মনে রাখে বিপ্লবকে। আর সেই বিপ্লবের নাম—হাদি।
নুসরাত শারমিন,
প্রবাসী লেখক ও এক্টিভিস্ট।














