হারিয়ে গেছে হাতে বানানো সেমাই, নেই পিতলের কল

প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৬ সময়ঃ ২:৩৯ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ২:৩৯ অপরাহ্ণ

নুর নবী রবিন:

রমজান এলে একসময় গ্রামবাংলার উঠোনে অন্যরকম ব্যস্ততা দেখা যেত। দুপুরের রোদে বাঁশের চাটাই পেতে শুকানো হচ্ছে সাদা সাদা সেমাই। ঘরের ভেতর পিতলের কল বসানো, কেউ হ্যান্ডেল ঘোরাচ্ছে, কেউ আবার আঙুল দিয়ে ময়দার খামির ঠেসে দিচ্ছে। একেকবার চাপ পড়লে কলের ছোট ছোট ছিদ্র দিয়ে জালের মতো বেরিয়ে আসত সেমাই।

এ দৃশ্য এখন প্রায় অচেনা। হাতে বানানো সেমাই তো দূরের কথা, কলের সেই হাত মেশিনটিও আর চোখে পড়ে না।

রমজানের আগে বা শীতের শেষ দিকে পাড়ায় পাড়ায় শুরু হতো সেমাই তৈরির ধুম। চালের গুঁড়ো বা ময়দা দিয়ে খামির বানানো হতো যত্ন করে। পুরুষরা বসত কলের পাশে, হ্যান্ডেল ঘোরানোর দায়িত্ব তাদের। নারীরা খামির তৈরি করে মেশিনের মুখে আঙুল দিয়ে চাপ দিতেন। শিশুরাও পাশে দাঁড়িয়ে দেখত, কেউ কেউ ছোট কাজে হাত লাগাত।

কলের চাপ বাড়লে সূক্ষ্ম জালি দিয়ে বেরিয়ে আসত লম্বা সেমাই। সেগুলো সাবধানে তুলে রোদে শুকাতে দেওয়া হতো। বিকেলের দিকে পুরো উঠোন ভরে যেত সাদা সুতোর মতো সেমাইয়ে।

এই সেমাই দিয়ে রমজানজুড়ে দুধ-নারকেল মিশিয়ে রান্না করা হতো। ঈদের সকালে ঘরে ঘরে থাকত সেই বিশেষ ঘ্রাণ। স্বাদে ছিল সরলতা, কিন্তু তাতে মিশে থাকত পরিবারের সবার শ্রম আর আনন্দ।

সময় বদলেছে। এখন বাজারে সহজলভ্য লাচ্ছা, প্যাকেটজাত সেমাই, নানা ধরনের প্রক্রিয়াজাত পণ্য। আধুনিক মিল ও অটো মেশিনে তৈরি সেমাই কম দামে, বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়। ফলে হাতে বানানো সেমাই তৈরির ঝক্কি আর নিতে চান না অনেকেই।

গ্রামাঞ্চলেও এখন প্যাকেটজাত সেমাইই বেশি জনপ্রিয়। উঠোনে চাটাই পেতে সেমাই শুকানোর দৃশ্য প্রায় বিলুপ্ত। কলের হাত মেশিনগুলো হয়তো কোথাও পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়, কিংবা লোহালক্কড়ের দোকানে বিক্রি হয়ে গেছে।

স্কুল শিক্ষক মনসুর নবী শৈশবের সেই দিনগুলোর কথা মনে করে বলেন, ছোটবেলায় তারা দুই ধরনের সেমাই দেখতেন। একটি ছিল হাতে বানানো, আরেকটি বাজারের, যেটাকে তারা ‘বুম্বাই সেমাই’ বলতেন।

তিনি জানান, ২০০৭ সালে চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর এলাকায় শেষবারের মতো হাতে সেমাই বানিয়ে রোদে শুকাতে দেখেছিলেন। এখন আর সে দৃশ্য চোখে পড়ে না।

তার কথায়, ‘সেমাই শুধু খাবার ছিল না, এটা ছিল একটা আয়োজন। সবাই মিলে বানানোর যে আনন্দ, সেটা এখন আর নেই।’

চট্টগ্রাম নগরীর বাসিন্দা ফাহিমা বেগম বলেন, সন্দ্বীপে থাকার সময় প্রতি রমজানে বানানো হতো, এখন শহরে কল নেই, ওভাবে বাসায় মানুষও নেই, তাছাড়া আমার সন্তানদের আগ্রহও নেই সেমাইয়ের প্রতি।

হাতে তৈরি সেমাইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল পারিবারিক বন্ধন, পাড়াপড়শির মিলন। এক বাড়িতে কল থাকলে পাশের বাড়ির মানুষও এসে সেমাই বানাত। গল্প হতো, হাসিঠাট্টা চলত।

আজকের ব্যস্ত জীবনে সেই সময়, সেই ধৈর্য, সেই একসঙ্গে কাজ করার অভ্যাস কমে গেছে। প্রযুক্তি সুবিধা দিয়েছে, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে কিছু সহজ আনন্দ।

হাতে বানানো সেমাই যেভাবে মানুষের খাবারের আইটেম থেকে সরে গেছে, তাতে বলা যায় এক টুকরো ঐতিহ্য নিঃশব্দে বিদায় নিচ্ছে।

প্রতি /এডি /শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

September 2026
SSMTWTF
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930 
20G