বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কোন শক্তির ওপর নির্ভর করবে?
গতদিন ভেনেজুয়েলার কারাকাসে যা ঘটেছে, তা পুরো পৃথিবীকে প্রকাশ্যে একটি বার্তা দিয়েছে। সেই বার্তাটি খুব পরিষ্কার। সার্বভৌমত্ব নামে যে শব্দটি আছে, তার বাস্তব প্রয়োগ ভবিষ্যতে আদৌ থাকবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। এই বাস্তবতায় বিশ্বের প্রায় সব দেশই নিজেদের শক্তিশালী করার পথে হাঁটছে। তবে সেই শক্তির মানে আর শুধু অস্ত্র নয়। শক্তির কেন্দ্র এখন প্রযুক্তি।
ট্রাম্প প্রশাসন খোলা যুদ্ধ চায় না। তারা রক্তপাত এড়াতে চায়। সেই কারণেই মাদুরোর পতন ঘটানো হয়েছে নীরব এবং নিয়ন্ত্রিতভাবে। এখানে সরাসরি সেনা পাঠানো হয়নি, ট্যাংক নামানো হয়নি। ব্যবহার করা হয়েছে যাকে বলা হয় টপ-ডাউন স্ট্রাইক মডেল। এর মানে হলো পুরো ব্যবস্থাকে ভাঙা নয়, শুধু নেতৃত্বের মাথাটাকেই লক্ষ্য করা।
এই অভিযানে পেন্টাগনের বড় কোনো সেনাবহর দরকার হয়নি। প্রায় নয় মাস ধরে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ভিত্তিক সিস্টেম, ‘হক আই ওমেগা’, মাদুরোর প্রতিটি চলাফেরা নজরে রেখেছিল। সিআইএ, ডেল্টা ফোর্স এবং স্পেস কমান্ড একসাথে কাজ করে এটিকে একটি নিখুঁত ‘স্মার্ট ইনভেশন’-এ রূপ দেয়।
এখানে যুদ্ধ জিতিয়েছে বন্দুক নয়, সময়ের হিসাব আর হ্যাকারদের কোড। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ভেনেজুয়েলার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং স্যাটেলাইট কন্ট্রোল অচল করে দেওয়া হয়। মাদুরোর নিরাপত্তা বাহিনী বুঝতেই পারেনি, বিপদ কখন, কোথা থেকে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে গেছে।
এই বাস্তবতা আমাদের আরেকটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। প্রযুক্তিই যদি হয় আগামীর সম্ভাব্য তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মূল অস্ত্র, তাহলে বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে?
এই প্রশ্নের মুখেই এসে পড়ে তারেক জিয়ার প্রসঙ্গ। নিজেকে যদি তিনি বাংলার মার্টিন লুথার কিং হিসেবে উপস্থাপন করেন, তাহলে তার ব্যক্তিগত ঝুড়িতে কী আছে? কেবল বক্তব্য, না কি বাস্তব পরিকল্পনা?
বাংলাদেশের একটি ভয়ংকর কিন্তু অসাধারণ সম্ভাবনার জায়গা আছে। একে খনি বলা যায়, যদিও এটি কোনো খনিজ সম্পদ নয়। এটি মানব সম্পদ। আরও স্পষ্ট করে বললে, এটি যুবক সম্পদ। পৃথিবীর খুব কম দেশেই এমন বিশাল, তরুণ, আবেগী এবং সংগ্রামী জনগোষ্ঠী আছে।
এই সম্পদকে তারেক জিয়া কীভাবে ব্যবহার করবেন?
তিনি কি পড়াশোনার নামে অভিনয় শেখাবেন? রিপোর্ট বানানোর অজুহাতে শিশুদের হাতে দায়িত্বহীন ইন্টারনেট তুলে দেবেন? নাকি পড়ার সুযোগ না দিয়ে স্কুলে ডাল, আলুভাজি আর তরকারি রান্না শেখানোর মধ্যেই শিক্ষা শেষ করবেন? তার পরিকল্পনায় আসলে কী আছে?
এই দেশের যুবসমাজকে তিনি কীভাবে প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করবেন? তাদের মেধা, সময় আর শক্তিকে কীভাবে রাষ্ট্রের কাজে লাগাবেন?
তারেক জিয়া এমন একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হতে যাচ্ছেন, যে দেশের মানুষ আর রেন্ডিয়ার গোলামি করতে চায় না। ২৪-এর রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি এখনো মানুষের চোখে ভাসে। তার সামনে অপেক্ষা করছে এক বিশাল অগ্নিপরীক্ষা। একদিকে রেন্ডিয়ার রক্তচক্ষু, অন্যদিকে দেশপ্রেমে জম্বি হয়ে যাওয়া একেবারেই আনকমন একটি জাতি। এমন একটি জাতি, যারা প্রয়োজনে জীবন দেবে, কিন্তু মাথা নত করবে না।
এই মানুষগুলো পড়াশোনা, স্বাস্থ্য আর খাদ্যে দুর্বল হতে পারে। কিন্তু দেশপ্রেমে তারা ভয়ংকরভাবে শক্তিশালী। তাদের ভেতরে যে সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে, তা বিরল। এই শক্তিকে যদি দিকনির্দেশনা না দেওয়া হয়, যদি পরিকল্পিতভাবে কাজে না লাগানো হয়, তাহলে এই সম্ভাবনাই বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
এই মানব সম্পদকে তিনি কীভাবে কাজে লাগাবেন?
আগামীর বাংলাদেশে প্রযুক্তি উন্নয়নের জন্য তার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা কী?
যেখানে রেন্ডিয়া সহ নানা শক্তির ষড়যন্ত্র সক্রিয়, সেখানে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও কার্যকর করার রোডম্যাপ কোথায়?
ইতিহাস বক্তৃতা দিয়ে লেখা হয় না। ইতিহাস লেখা হয় প্রস্তুতি দিয়ে। আজকের পৃথিবীতে রাষ্ট্র টিকে থাকে ট্যাংকে নয়, মেধায়। বন্দুকে নয়, কোডে। স্লোগানে নয়, সিস্টেমে।
তারেক জিয়ার সামনে প্রশ্ন একটাই।
তিনি কি শুধু ক্ষমতায় যেতে চান, নাকি একটি ভয়হীন, প্রযুক্তিনির্ভর, আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়ার দায় নেবেন?
নুসরাত শারমিন,
প্রবাসী লেখক ও এক্টিভিস্ট।













