শহীদদের ব্যাপারে কেন দুমুখো নীতি?
নুসরাত শারমিন:
বাংলাদেশে শহীদদের নিয়ে সরকারের নীতি আসলে দুই মুখো এক দীর্ঘ রাজনীতি। এক মুখে শোক, সমবেদনা, শ্রদ্ধা আর সম্মানের ভাষা। আরেক মুখে সময় টেনে নেওয়া, প্রলোভন দেখানো আর রাজনৈতিক দায় এড়িয়ে যাওয়ার নীরব কৌশল। যেন রাষ্ট্র এক হাতে শহীদের রক্তে ভেজা জামা ধরে কাঁদে, আর অন্য হাতে সেই রক্তের হিসাব লেখা ফাইলটা আলমারির ভেতর ঢুকিয়ে রাখে।
প্রতিটি হত্যার পর সরকার প্রথমেই বিচারপ্রক্রিয়ার নাটক শুরু করে। তদন্ত কমিটি হয়, উচ্চ পর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন হয়, আদালতে রুল আসে, শহীদ ঘোষণার আলোচনা চলে। ভাষা খুব সুন্দর, কিন্তু গতি খুব ধীর। কমিটির কাজ কতদূর এগোয়, রিপোর্ট কোথায় যায়, দায় কার উপর পড়ে তা ধীরে ধীরে ধোঁয়াশায় মিলিয়ে যায়। গুলিকে বলা হয় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা। এভাবে গুলির নির্দেশদাতা আর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জায়গা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়া হয়।
বিচার এখানে কোনো ফলাফল নয়, বিচার এখানে একটা দীর্ঘ প্রসেস। এই প্রসেসের ভেতরে পরিবারগুলো ক্লান্ত হয়ে পড়ে, রাজপথ ফাঁকা হয়ে যায়, আর জনতার ক্ষোভ কোর্টের তারিখ আর কাগজের ভাঁজে বন্দি হয়ে যায়। রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যও ঠিক সেটাই।
এরপর আসে রাষ্ট্রের দ্বিতীয় মুখ। শহীদের পরিবারের কাঁধে হাত রাখা মুখ। ফুল, সমবেদনা, ক্যামেরার সামনে ছবি, নগদ অর্থ, সঞ্চয়পত্র, চিকিৎসা আর ভ্রমণের আশ্বাস। আবু সাঈদের পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ডেকে এনে অর্থ সহায়তা, সেভিংস সার্টিফিকেট আর ফটোসেশন মিলিয়ে সাজানো হয় রাষ্ট্র পাশে আছে এই প্রতীকি দৃশ্য। পরে সেনাপ্রধান আলাদা করে সহায়তা দেন, যেন সেনাবাহিনীও এই শোকে শরিক। কিন্তু গুলির রাজনৈতিক দায় আর কমান্ড চেইনের প্রশ্ন সেখানে আর ওঠে না।
এই সহায়তাগুলো পরিবারকে সাময়িক স্বস্তি দেয়, এটা সত্য। কিন্তু একই সঙ্গে এক অদৃশ্য চাপও তৈরি করে। এত কিছু নেওয়ার পর আর কতদূর গিয়ে কথা বলা যায়। পরিবারগুলোকে নীরবতার এক নৈতিক বন্দিশালায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, যাকে বাইরে থেকে বলা হয় সমবেদনা।
মুগ্ধ উঠে এসেছিল রাজপথ থেকে। আবু সাঈদ মুগ্ধ শেষ হয়নি যুদ্ধ এই স্লোগানের ভেতরে তার নাম এক প্রজন্মের ক্ষোভ আর আশার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। এই জায়গা থেকেই তাকে টেনে আনার চেষ্টা শুরু হয়। জুলাই ফাউন্ডেশনের মতো প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়, যেখানে আন্দোলনের ধারালো শক্তিকে সামাজিক কাজ আর মানবিক প্রকল্পের ভেতর দিয়ে নরম করা যায়।
মুগ্ধ আলোচনায় থাকে, সম্মান পায়, লাইভ থেকে মিটিংয়ে যায়। কিন্তু রাস্তায় গুলির আদেশদাতাদের নাম উচ্চারণ করার ধার ধীরে ধীরে কমে আসে। এরপর আসে বিএনপিতে যোগদানের প্রশ্ন। একদিকে বাস্তবতা, আওয়ামী লীগ কেন্দ্রিক ক্ষমতার বিপরীতে সংগঠিত বিরোধী শক্তি। অন্যদিকে নিজের কণ্ঠকে স্থায়ী প্ল্যাটফর্মে নেওয়ার আকর্ষণ।
মুগ্ধ বুঝে যায় শুধু রাস্তায় থেকে সিদ্ধান্ত বদলানো যায় না, তাই সে নীতিনির্ধারণী টেবিলে ঢুকতে চায়। কিন্তু রাষ্ট্রের জন্য এটাও সুবিধাজনক। যে নাম একসময় বিদ্রোহের প্রতীক ছিল, সেটাই এখন দলীয় পরিচয়ের ভেতরে বন্দি হয়ে যায়।
হাদি ছিল ভয়কে অস্বীকার করার এক জনতার নাম। আবু সাঈদ, মুগ্ধ আর অন্যদের পথ ধরে সে সরাসরি রাষ্ট্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। তাই তার মৃত্যু ঘিরে ক্ষোভ ছিল বিস্ফোরক। এই ক্ষোভ সামলাতেও রাষ্ট্রের পুরোনো কৌশলই দেখা যায়। হাদির পরিবারের একজনকে কোনো কমিটি, বোর্ড বা পরামর্শক পদে বসানো হয়। শহীদের পরিবারকে ভেতরের মানুষ বানানো হয়।
রাষ্ট্র তখন বলতে পারে, দেখুন পরিবারের লোকই তো আমাদের সঙ্গে আছে। আর হাদির নাম ধীরে ধীরে বিরোধিতার প্রতীক থেকে রাষ্ট্র স্বীকৃত শহীদ হয়ে ওঠে। রাজপথের কঠিন অবস্থান ভোঁতা হয়ে যায়। পদ থাকে, মর্যাদা থাকে, মিডিয়ার আলো থাকে। কিন্তু আসল সিদ্ধান্ত হয় অন্য ঘরে।
সব মিলিয়ে সরকারের শহীদ নীতি দাঁড়ায় স্মৃতি দখলের রাজনীতি হিসেবে। প্রথমে গুলি, হত্যা, নির্যাতন। তারপর তদন্ত, মামলা, দীর্ঘ বিচার। এরপর পরিবারকে অর্থ, স্বীকৃতি আর পদ দিয়ে বাঁধা। আর শেষে শহীদের নামকে পাঠ্যবই, স্মারক, সরকারি অনুষ্ঠান, ফাউন্ডেশন আর দলীয় রাজনীতির ভেতর আটকে ফেলা।
এভাবে শহীদের রক্তকে দুইভাবে ব্যবহার করা হয়। একদিকে সেই রক্ত দেখিয়ে তরুণদের আবেগ জাগানো হয়। অন্যদিকে সেই রক্তের আসল উৎস, রাষ্ট্রীয় হত্যা আর ক্ষমতার অপরাধকে আড়াল করতে পরিবারগুলোকে সুবিধা আর স্বীকৃতির গোলকধাঁধায় ফেলে দেওয়া হয়।
রাষ্ট্র জানে, মৃত মানুষ কথা বলে না। কিন্তু স্মৃতি কথা বলে। তাই রাষ্ট্র লাশকে ভয় পায় না, রাষ্ট্র ভয় পায় স্মৃতিকে। আর যে রাষ্ট্র স্মৃতিকে দখল করতে চায়, সে আসলে জানে সত্য একদিন ঠিকই কথা বলবে। শুধু প্রশ্ন হলো, তখন আর কে শোনার মতো জীবিত থাকবে।














