ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিঙ্গাপুরের ওলবাশিয়া কৌশল, কতটা কার্যকর হতে পারে বাংলাদেশের জন্য?
ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নানা ধরনের উদ্যোগ নিলেও সিঙ্গাপুর বেছে নিয়েছে একেবারেই ভিন্ন একটি পথ। কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তারা ব্যবহার করছে জীববৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি, যেখানে বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়াবাহী পুরুষ এডিস মশা প্রকৃতিতে ছেড়ে দিয়ে ডেঙ্গুর বাহক মশার সংখ্যা কমানো হচ্ছে। দীর্ঘ এক দশকের গবেষণা ও বাস্তব প্রয়োগের পর এই উদ্যোগ দেশটির জাতীয় কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে।
ছোট পরীক্ষায় শুরু, এখন জাতীয় কর্মসূচি
২০১৬ সালে সিঙ্গাপুরের ব্রাডেল হাইটস এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে কয়েক হাজার ওলবাশিয়া ব্যাকটেরিয়াবাহী পুরুষ এডিস মশা অবমুক্ত করা হয়। সেই সময় এটি ছিল সীমিত পরিসরের একটি গবেষণা। বর্তমানে দেশটির জাতীয় পরিবেশ সংস্থা প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ এমন মশা উৎপাদন করে বিভিন্ন এলাকায় ছেড়ে দিচ্ছে।
প্রথম দেখায় বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হলেও এই কৌশলের লক্ষ্য আরও মশা তৈরি করা নয়, বরং এডিস মশার প্রজনন ধীরে ধীরে বন্ধ করে দেওয়া।
কেন প্রয়োজন হয়েছিল নতুন প্রযুক্তি
সিঙ্গাপুরে বহু বছর ধরেই ডেঙ্গু একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। দ্রুত নগরায়ণ, ঘনবসতি এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এডিস মশার বিস্তার রোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সরকার দীর্ঘদিন ড্রেন পরিষ্কার, ফগিং এবং রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের মতো প্রচলিত পদ্ধতিতে কাজ করলেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি। সময়ের সঙ্গে এডিস মশা অনেক কীটনাশকের প্রতিও প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। ফলে বিজ্ঞানীরা বিকল্প সমাধানের খোঁজ শুরু করেন।
কীভাবে কাজ করে ওলবাশিয়া প্রযুক্তি
ওলবাশিয়া একটি প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া, যা অনেক ধরনের কীটপতঙ্গের শরীরে থাকলেও ডেঙ্গুর প্রধান বাহক এডিস ইজিপ্টি মশার শরীরে স্বাভাবিকভাবে থাকে না।
গবেষকরা পরীক্ষাগারে পুরুষ এডিস মশার শরীরে এই ব্যাকটেরিয়া সংযোজন করেন। পরে সেগুলো প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া হয়। পুরুষ মশা মানুষের রক্ত খায় না এবং কামড়ও দেয় না।
যখন এই পুরুষ মশার সঙ্গে বন্য স্ত্রী এডিস মশার মিলন ঘটে, তখন উৎপন্ন ডিম থেকে নতুন মশা জন্মায় না। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এডিস মশার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে শুরু করে।
গবেষণায় মিলেছে ইতিবাচক ফল
২০২০ সালে সিঙ্গাপুরে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৩৫ হাজারের বেশি ছিল। কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়।
চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন-এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব এলাকায় ওলবাশিয়া প্রকল্প চালানো হয়েছে সেখানে এডিস মশার সংখ্যা ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। একই সঙ্গে ওইসব এলাকায় ডেঙ্গুর ঝুঁকিও প্রায় ৭২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। আশপাশের এলাকাতেও ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে।
প্রযুক্তির পাশাপাশি ছিল জনসম্পৃক্ততা
শুধু বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন নয়, জনসচেতনতাও এই প্রকল্পের বড় শক্তি ছিল।
শুরুতে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, আরও মশা ছেড়ে দিয়ে কীভাবে ডেঙ্গু কমানো সম্ভব। তাই সরকার ব্যাপক প্রচার চালিয়ে মানুষকে জানায়, এসব পুরুষ মশা কামড়ায় না এবং রোগ ছড়ানোর ক্ষমতাও নেই।
একই সঙ্গে ধাপে ধাপে প্রকল্প বাস্তবায়ন করায় নিরাপত্তা যাচাই এবং মানুষের আস্থা অর্জন করা সহজ হয়।
উন্নত প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহার
বহুতল ভবন ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এই কর্মসূচি পরিচালনার জন্য সিঙ্গাপুর নতুন প্রযুক্তিও ব্যবহার করেছে। কোথাও ড্রোনের মাধ্যমে, কোথাও ভবনের বিভিন্ন স্তরে মশা অবমুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে মশা উৎপাদন, লিঙ্গ শনাক্তকরণ এবং তথ্য বিশ্লেষণের জন্য উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোও এই প্রকল্পে সহযোগিতা করেছে।
বাংলাদেশ কী শিখতে পারে
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মতো ডেঙ্গুপ্রবণ দেশের জন্য সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
যেসব বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে:
- শুধু ফগিংয়ের ওপর নির্ভর না করে জীববৈজ্ঞানিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা শুরু করা।
- স্থানীয় এডিস মশার আচরণ, কীটনাশক প্রতিরোধক্ষমতা এবং ডেঙ্গুর ধরন নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো।
- মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
- মৌসুমি নয়, বছরজুড়ে সমন্বিত মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি পরিচালনা করা।
- নতুন প্রযুক্তি প্রয়োগের আগে জনগণকে সঠিক তথ্য দিয়ে সচেতন ও সম্পৃক্ত করা।
- স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার ও সিটি করপোরেশনগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জোরদার করে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা।
সিঙ্গাপুরের ওলবাশিয়া কর্মসূচি দেখিয়েছে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু কীটনাশক নয়, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ একসঙ্গে কাজ করলে টেকসই সাফল্য অর্জন সম্ভব।
প্রতি / এডি / শাআ













