গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় প্রভাব ফেলতে পারে খসড়া সাইবার আইন
সাইবার জগতের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নতুন করে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রস্তাবিত পরিবর্তনের কিছু ধারা নিয়ে গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অনলাইন কনটেন্ট অপসারণ, মানহানি, ভুল তথ্য, গুজব এবং ডিজিটাল ডিভাইস তল্লাশির মতো বিষয়ে প্রস্তাবিত ক্ষমতার পরিধি কতটা বিস্তৃত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সমালোচকদের মতে, সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণের আইন তৈরির ক্ষেত্রে মানুষের বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তাদের যুক্তি, সাইবার জগত এবং গণমাধ্যম এখন আর বিচ্ছিন্ন দুটি ক্ষেত্র নয়। সংবাদ সংগ্রহ, প্রকাশ ও প্রচারের বড় অংশই ডিজিটাল মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে সাইবার আইনের কোনো বিধান সরাসরি গণমাধ্যমের কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশে ডিজিটাল ও সাইবার আইন নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা হয়। ২০২৩ সালে সেটির পরিবর্তে সাইবার নিরাপত্তা আইন চালু হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি করা হয় এবং ২০২৬ সালে সেটি আইনে পরিণত হয়। এর পর গত জুনে আইনটির একটি সংশোধনী সংসদে পাস হয়। এবার আবারও সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত সংশোধনী নিয়ে আলোচনার অন্যতম বিষয় হলো অনলাইন কনটেন্ট ব্লক বা অপসারণের ক্ষমতা। বিদ্যমান আইনে জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা, জনশৃঙ্খলা, উসকানি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মতো বিষয় বিবেচনায় অনলাইন কনটেন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। নতুন খসড়ায় ৮(২) ধারার মাধ্যমে শুধু প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে নয়, সম্ভাব্য ক্ষতির আশঙ্কার ভিত্তিতেও কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লক করার ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
এখানে ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের জন্য মানহানিকর কিংবা অবমাননাকর তথ্যও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে খসড়াটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, ‘আশঙ্কা’ এবং ‘মানহানি’র মতো বিস্তৃত ধারণার প্রয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাখ্যার সুযোগ বেশি থাকলে আইন প্রয়োগের ধরন ব্যক্তি ও পরিস্থিতিভেদে পরিবর্তিত হতে পারে।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা নিয়ে উদ্বেগ
প্রস্তাবিত সংশোধনীর ২৫ ধারা নিয়েও বিশেষভাবে আলোচনা হচ্ছে। বিদ্যমান আইনে অনলাইনে যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, পর্নোগ্রাফি এবং শিশু যৌন নির্যাতনসংক্রান্ত উপাদানের মতো অপরাধ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। নতুন প্রস্তাবে এই ধারার পরিধি আরও বিস্তৃত করে মানহানি, অপমান, হেয় করা ও বুলিংয়ের মতো বিষয় যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সমালোচকদের বক্তব্য, এ ধরনের বিধান অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করতে পারে। কারণ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি, অনিয়ম বা অপরাধ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, খাদ্য বা ওষুধে ভেজাল, নিম্নমানের অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা ঋণখেলাপির মতো ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন করতে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় প্রকাশ করাও অনেক সময় সাংবাদিকতার অপরিহার্য অংশ। ফলে মানহানি বা অপমানের বিস্তৃত সংজ্ঞা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে কীভাবে প্রয়োগ হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশকারীরা বলছেন, কোনো প্রতিবেদনকে মানহানিকর দাবি করে অভিযোগ করা হলে সাংবাদিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে আইনি ঝুঁকির মুখে পড়তে হতে পারে। এর ফলে সাংবাদিকদের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা স্ব-সেন্সরশিপ বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
গুজব ও ভুল তথ্যের সংজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন
প্রস্তাবিত ২৬(এ) ধারায় সাইবার স্পেসে ‘গুজব’ ও ‘ভুল তথ্য’ প্রকাশ বা প্রচারকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব রয়েছে। এর সর্বোচ্চ শাস্তি হতে পারে ১০ বছরের কারাদণ্ড।
তবে সমালোচকদের অন্যতম প্রশ্ন হলো, ‘গুজব’ বা ‘ভুল তথ্য’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে। এসব শব্দের সুনির্দিষ্ট আইনি সংজ্ঞা না থাকলে কোন তথ্য অপরাধের পর্যায়ে পড়বে, তা নির্ধারণে ব্যাখ্যার বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে।
খসড়ায় বিভ্রান্তি, ভয় বা সামাজিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে অথবা এমন পরিস্থিতি তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে, এমন তথ্যের বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে। সমালোচকদের মতে, ‘সম্ভাবনা’নির্ভর এমন ভাষা আইনের প্রয়োগকে আরও বিস্তৃত করে তুলতে পারে।
ডিজিটাল ডিভাইস তল্লাশি নিয়েও উদ্বেগ
তদন্তসংক্রান্ত ক্ষমতাও খসড়া আইনের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। প্রস্তাবিত ৩৩ ও ৩৪ ধারায় কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস এবং সংরক্ষিত ডেটায় প্রবেশ, তল্লাশি ও তা জব্দ করার ক্ষমতার বিষয়টি রয়েছে।
গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে এই ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের কারণ হলো সাংবাদিকদের তথ্যের উৎস। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সময় অনেক ব্যক্তি পরিচয় গোপন রাখার শর্তে সাংবাদিকদের তথ্য দিয়ে থাকেন। সাংবাদিকের কম্পিউটার, ফোন বা অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রবেশাধিকার থাকলে এসব গোপন উৎসের পরিচয় প্রকাশের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এ কারণে সাংবাদিকতার গোপনীয় উৎস সুরক্ষা এবং তদন্তকারী সংস্থার ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রাখা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
ভ্রাম্যমাণ আদালতে বিচার নিয়ে বিতর্ক
খসড়া সংশোধনীর আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিচার করার প্রস্তাব। আগের সাইবার আইনগুলোতে সাইবার অপরাধের বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে হওয়ার বিধান ছিল।
ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। ফলে সাইবার অপরাধের মতো প্রযুক্তিনির্ভর ও জটিল বিষয়ে নির্বাহী প্রশাসনের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক বিচার করার সুযোগ রাখা কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সমালোচকদের আশঙ্কা, সাংবাদিকতা বা সংবাদ প্রকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো অভিযোগ ভ্রাম্যমাণ আদালতের আওতায় এলে তা সাংবাদিকদের জন্য অতিরিক্ত আইনি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে সরকারি কর্মকর্তা, প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিচারিক তদারকি নিয়েও প্রশ্ন
সাইবার আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিচারিক তদারকির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। আগের সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিচারিক নজরদারির কিছু ব্যবস্থা ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করছেন। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে সেই ধরনের বিধান বাদ দেওয়ার কারণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সমালোচকদের মতে, কনটেন্ট অপসারণ, ডিজিটাল ডিভাইস তল্লাশি, ডেটা জব্দ কিংবা গ্রেপ্তারের মতো ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বাধীন বিচারিক তদারকি থাকলে ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।
আগের সাইবার আইনগুলোর অভিজ্ঞতা
বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে অতীতেও ব্যাপক বিতর্ক হয়েছে। সমালোচকদের একটি অংশ মনে করে, ওই আইনের বিভিন্ন ধারা সাংবাদিক, লেখক, কার্টুনিস্ট ও সমালোচকদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের কারণে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের একাধিক ধারা জামিন অযোগ্য হওয়ায় গ্রেপ্তারের পর দীর্ঘ সময় আইনি প্রক্রিয়ায় থাকার ঝুঁকিও নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল। নতুন খসড়ায়ও কিছু জামিন অযোগ্য অপরাধ রাখার প্রস্তাব রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
তাদের মতে, সাইবার অপরাধ দমন করতে গিয়ে যেন সংবাদ প্রকাশ বা মতপ্রকাশের বৈধ অধিকার সংকুচিত না হয়, সেটি আইন প্রণয়নের সময় নিশ্চিত করা জরুরি।
সাইবার অপরাধ ও গণমাধ্যমের জন্য কি আলাদা কাঠামো প্রয়োজন?
প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে গণমাধ্যমের কার্যক্রম ক্রমেই ডিজিটালনির্ভর হচ্ছে। সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমের কনটেন্ট এখন একই সঙ্গে ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণের আইন এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা থাকা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন সমালোচকরা।
তাদের প্রস্তাব, সাইবার অপরাধ মোকাবিলার পাশাপাশি সাংবাদিকতা, বাকস্বাধীনতা ও প্রকাশনার অধিকার সুরক্ষায় পৃথক বিধিমালা বা নির্দেশিকা তৈরি করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, আইনবিদ, সাংবাদিক ও গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের মতামত নেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে।
সংশোধনী নিয়ে আরও পর্যালোচনার দাবি
প্রস্তাবিত সংশোধনীর সমালোচকদের মতে, সাইবার অপরাধ দমন এবং নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আইনটি যেন অপরাধ দমনের পাশাপাশি সাংবাদিকতার বৈধ কার্যক্রমে বাধা তৈরি না করে, সে বিষয়টি স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এ জন্য সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আলাদা কমিটি বা পরামর্শক দল গঠনের প্রস্তাবও এসেছে।
আইনটি চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নিয়ে বিতর্কিত ধারাগুলো পুনর্বিবেচনা করা হলে সাইবার অপরাধ দমন এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, দুই ক্ষেত্রেই একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
প্রতি / এডি / শাআ



















