১২ বছরের ক্রীতদাস বালকের হাত ধরেই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ভ্যানিলার ব্যবহার
বিশ্বজুড়ে পরিচিত সুগন্ধি মসলা ভ্যানিলা। আইসক্রিম, কেক, মিষ্টান্নসহ নানা খাবারের স্বাদ ও ঘ্রাণ বাড়াতে এর ব্যবহার ব্যাপক। বর্তমানে ভ্যানিলার আন্তর্জাতিক বাজারে সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী মাদাগাস্কার। তবে এই মসলার জন্ম আফ্রিকার এই দ্বীপে নয়। এর আদি নিবাস মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনাঞ্চল। সেখানকার অর্কিড গোত্রের একধরনের লতা থেকেই এসেছে পরিচিত ভ্যানিলা।
তবে ভ্যানিলার বিশ্বজয়ের পেছনে রয়েছে এক বিস্ময়কর ইতিহাস। প্রায় ১৮০ বছর আগে ভারত মহাসাগরের একটি দ্বীপে মাত্র ১২ বছর বয়সী এক ক্রীতদাস বালক এমন একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করে, যা ভ্যানিলা উৎপাদনের ইতিহাস বদলে দেয়। তার উদ্ভাবিত কৌশল ছাড়া মেক্সিকোর বাইরে বাণিজ্যিকভাবে ভ্যানিলা চাষ ছড়িয়ে পড়া কঠিন ছিল। ছেলেটির নাম এডমন্ড আলবিয়াস।
ভ্যানিলার উৎপত্তি, বিস্তার এবং বিশ্ববাজারে এর অবস্থান নিয়ে গবেষণা করেছেন সাংবাদিক ও লেখক টিম ইকোট। এ বিষয়ে ২০০৪ সালে প্রকাশিত তাঁর বইয়ের নাম ‘ভ্যানিলা: ট্রাভেলস ইন সার্চ অব দ্য লাশাস সাবস্ট্যান্স’। বইটির তথ্য অনুযায়ী, মেক্সিকোর পাপান্তলা থেকে শুরু করে তাহিতি, মাদাগাস্কার, রেউনিওঁ ও সেশেলস দ্বীপপুঞ্জ ঘুরে ভ্যানিলার দীর্ঘ ইতিহাস অনুসন্ধান করেছেন লেখক। বিবিসির এক প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে এই মসলার বিচিত্র পথচলার কথা।
ভ্যানিলা চাষের সূচনা যেভাবে
বর্তমান মেক্সিকোর পাপান্তলা অঞ্চলে বসবাসকারী টোটোনাক আদিবাসীরাই প্রথম ভ্যানিলা চাষ শুরু করেন বলে ধারণা করা হয়। তাদের লোককথায় ভ্যানিলাকে দেবীর রক্ত থেকে জন্ম নেওয়া এক পবিত্র উপহার হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
১৫০০ শতকের দিকে অ্যাজটেকরা টোটোনাকদের পরাজিত করে পাপান্তলা অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। এরপর বিজিত জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে কর ও উপঢৌকন হিসেবে ভ্যানিলা সংগ্রহ করত তারা। অ্যাজটেকদের বিশেষ ধরনের চকলেট পানীয়ের স্বাদ ও ঘ্রাণ বাড়াতেও এই সুগন্ধি উপাদান ব্যবহার করা হতো।
পরবর্তী সময়ে মেক্সিকোয় স্পেনের ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে ভ্যানিলা ইউরোপে পৌঁছায়। ১৫১৯ থেকে ১৫২১ সালের মধ্যে অভিযাত্রী এরনান কোর্তেসের নেতৃত্বে স্প্যানিশ বাহিনী অ্যাজটেক সাম্রাজ্য দখল করে। এ সময় অ্যাজটেক শাসকদের খাবার ও পানীয়তে ভ্যানিলা এবং চকলেটের ব্যবহার দেখে মুগ্ধ হন কোর্তেস। পরে তিনি এসব উপাদান স্পেনে নিয়ে যান।
ইউরোপে পৌঁছানোর পর দ্রুত জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে ভ্যানিলা। একপর্যায়ে ইংল্যান্ডের রানি প্রথম এলিজাবেথ এবং ফ্রান্সের রাজা পঞ্চদশ লুইয়ের রাজকীয় খাবারেও জায়গা করে নেয় এই সুগন্ধি মসলা। ধীরে ধীরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এর চাহিদা বাড়তে থাকে। সেই সঙ্গে ভ্যানিলা হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক মসলা-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পণ্য।
তিন শতাব্দী ধরে ব্যর্থ হয়েছিল ইউরোপীয়রা
ইউরোপে ভ্যানিলার চাহিদা বাড়ার পর মেক্সিকোর বাইরে এর চাষ ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়। বিশেষ করে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো ভ্যানিলা গাছের চারা ও কাটিং সংগ্রহ করে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে চাষ করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।
১৬০০ ও ১৭০০ শতকে ব্রিটিশরা ভারতে, ফরাসিরা ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপগুলোতে, ডাচরা জাভায় এবং স্প্যানিশরা ফিলিপাইনে ভ্যানিলা চাষের উদ্যোগ নেয়। গাছগুলো বেশ ভালোভাবেই বেড়ে উঠত, ফুলও ফুটত। কিন্তু কোনোভাবেই ফল ধরানো সম্ভব হচ্ছিল না।
এর মূল কারণ ছিল পরাগায়ন। ভ্যানিলা ফুলের পুরুষ ও স্ত্রী প্রজনন অঙ্গ একটি পাতলা পর্দা দিয়ে আলাদা থাকে। ফলে স্বাভাবিকভাবে পরাগায়ন হওয়া কঠিন। মেক্সিকোর নির্দিষ্ট কিছু স্থানীয় মৌমাছি এই ফুলের পরাগায়নে ভূমিকা রাখত। এসব মৌমাছি অন্য অঞ্চলে না থাকায় সেখানে ভ্যানিলা গাছে ফল আসত না।
এভাবে প্রায় ৩০০ বছর ধরে চেষ্টা চালিয়েও মেক্সিকোর বাইরে সফলভাবে ভ্যানিলা উৎপাদন করতে পারেননি ইউরোপীয় চাষিরা।
১২ বছরের বালক যেভাবে বদলে দিল ইতিহাস
মেক্সিকোর বাইরে ভ্যানিলা চাষে সফল হওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি আগ্রহী ছিল ভারত মহাসাগরের বুরবোঁ দ্বীপের ফরাসি বাগানমালিকেরা। দ্বীপটি বর্তমানে রেউনিওঁ নামে পরিচিত। ১৮২২ সালে ইউরোপে সফলভাবে বেড়ে ওঠা একটি ভ্যানিলা গাছের কাটিং এনে সেখানে রোপণ করা হয়। গাছ বড় হয়ে ফুল দিলেও ফল ধরেনি। ফলে চাষিদের দীর্ঘদিনের আশা পূরণ হয়নি।
অবশেষে ১৮৪১ সালে সেই সমস্যার সমাধান করেন এডমন্ড আলবিয়াস নামের ১২ বছর বয়সী এক ক্রীতদাস বালক। তিনি হাতে ভ্যানিলা ফুলের কৃত্রিম পরাগায়নের একটি কার্যকর পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।
ভ্যানিলা ফুলে পুরুষ ও স্ত্রী উভয় প্রজনন অঙ্গ থাকলেও মাঝখানে থাকা একটি পাতলা পর্দা স্বাভাবিক পরাগায়নে বাধা সৃষ্টি করে। এডমন্ড একটি ছোট কাঠির সাহায্যে ফুলের ওই পর্দা সরিয়ে দেন। এরপর আঙুল দিয়ে পুরুষ ও স্ত্রী প্রজনন অঙ্গ একসঙ্গে চেপে ধরেন। এতে সফলভাবে পরাগায়ন ঘটে এবং গাছে ফল ধরতে শুরু করে।
তাঁর এই সহজ কিন্তু কার্যকর পদ্ধতি ভ্যানিলা চাষের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে। মেক্সিকোর বাইরে বাণিজ্যিকভাবে ভ্যানিলা উৎপাদনের পথ খুলে যায়।
মাদাগাস্কার হয়ে বিশ্ববাজারে ভ্যানিলার আধিপত্য
এডমন্ড আলবিয়াসের কৌশল ছড়িয়ে পড়ার পর ফরাসিরা রেউনিওঁ ছাড়াও মাদাগাস্কার, সেশেলস ও ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্যানিলার বাগান গড়ে তোলে। পরবর্তী সময়ে ইন্দোনেশিয়া, ভারতসহ অন্যান্য গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশেও এর চাষ বিস্তার লাভ করে।
একসময় ভ্যানিলার উৎপাদনে মেক্সিকোর একচ্ছত্র অবস্থান থাকলেও নতুন উৎপাদক দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে দেশটি। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রথমে রেউনিওঁ, পরে মাদাগাস্কার ও ইন্দোনেশিয়ার ভ্যানিলার সরবরাহ বাড়তে থাকে। বর্তমানে প্রাকৃতিক ভ্যানিলা শুঁটির বৈশ্বিক বাণিজ্যে মেক্সিকোর অংশ মাত্র ৫ শতাংশ।
অন্যদিকে, ১৮০০ শতকের শেষদিকে কৃত্রিম ভ্যানিলার আবিষ্কার এই শিল্পে নতুন পরিবর্তন আনে। তুলনামূলক সহজলভ্য ও কম ব্যয়বহুল হওয়ায় কৃত্রিম ভ্যানিলা খাদ্যশিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে। বর্তমানে বাজারে ব্যবহৃত ভ্যানিলার মাত্র ১ থেকে ৫ শতাংশ প্রাকৃতিক উৎস থেকে আসে।
এখন প্রতিটি ভ্যানিলা ফুলে মানুষের হাতের স্পর্শ
ভ্যানিলার বাণিজ্যিক উৎপাদনে এডমন্ড আলবিয়াসের আবিষ্কৃত কৃত্রিম পরাগায়ন পদ্ধতি এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রাকৃতিক পরাগায়নকারীর ওপর নির্ভর না করে চাষিরা হাতে হাতে ফুলের পরাগায়ন করেন। এতে ফল ধরার সম্ভাবনা বাড়ে এবং উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।
বর্তমানে বিশ্বে চাষ করা প্রায় প্রতিটি ভ্যানিলা গাছের ফুলেই হাতে পরাগায়ন করা হয়। কাজটি বেশ সময়সাপেক্ষ ও শ্রমনির্ভর। প্রতিটি ফুল আলাদাভাবে পরাগায়ন করতে হয় বলে ভ্যানিলা উৎপাদনও সহজ নয়।
মাত্র ১২ বছর বয়সে এডমন্ড আলবিয়াসের আবিষ্কার আজও বিশ্বজুড়ে ভ্যানিলা চাষের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। একসময় যে মসলা মেক্সিকোর বনাঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তার বিস্তৃত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পেছনে তাই জড়িয়ে আছে এক ক্রীতদাস বালকের অসাধারণ অবদান।
প্রতি / এডি / শাআ



















