নেই কোনো বাতিঘর, তবু মানুষ দেখে তার উপস্থিতি, এর কারণ কী?
পৃথিবীর বিভিন্ন সমুদ্র উপকূলে বাতিঘরকে ঘিরে অদ্ভুত এক দৃষ্টিবিভ্রমের কথা শোনা যায়। বাস্তবে বাতিঘরটি স্থলভাগে থাকলেও অনেকের চোখে মনে হয়, এর আলো যেন সমুদ্রের মাঝখানে ভাসছে। বিষয়টি এতটাই বাস্তব বলে মনে হয় যে নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। এই রহস্যের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খুঁজতে অস্ট্রেলিয়ার একটি দ্বীপকে গবেষণার জন্য বিশেষ উপযোগী বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
এই অস্বাভাবিক দৃশ্যমান অভিজ্ঞতা ‘ফ্যান্টম লাইটহাউস’ বা ভুতুড়ে বাতিঘর বিভ্রম নামে পরিচিত। যারা এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, তাঁদের মনে হয় বাতিঘরের আলো পেছনের স্থলভাগ থেকে আসছে না। বরং সমুদ্রের গভীরে কোথাও আলোটি অবস্থান করছে। অথচ তাঁরা জানেন, বাস্তবে এমনটি হওয়ার কথা নয়।
সম্প্রতি গবেষকেরা এই দৃষ্টিবিভ্রমের পেছনের কারণ নিয়ে নতুন করে অনুসন্ধান করেছেন। তাঁদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মানুষের মস্তিষ্ক দূরের আলো ও তার অবস্থান নির্ধারণ করতে গিয়ে ভুল করতে পারে। শুধু বাতিঘরের ক্ষেত্রেই নয়, দিগন্তের কাছে থাকা চাঁদকে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বড় দেখার পেছনেও একই ধরনের দৃষ্টিগত প্রক্রিয়া কাজ করতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার যে দ্বীপে দেখা যায় এই অদ্ভুত ঘটনা
অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত লেডি এলিয়ট দ্বীপ এই গবেষণার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দ্বীপটিতে বাতিঘরকে ঘিরে এমন দৃষ্টিবিভ্রম বেশ পরিচিত। এমনকি পর্যটকদের জন্য তৈরি গাইডবুকেও বিষয়টির উল্লেখ রয়েছে।
দ্বীপটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যও বিখ্যাত। এটি বিশ্বের বৃহত্তম প্রবালপ্রাচীর গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের অংশ। এখানে পর্যটকদের আকর্ষণের মতো অনেক কিছু থাকলেও বাতিঘরের এই অদ্ভুত দৃশ্য বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ১৯৩০-এর দশক থেকেই গবেষকেরা বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করছেন।
এবারের গবেষণায় মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইমন ক্রপার একটি অ্যানিমেটেড জিআইএফ তৈরি করেন। এতে পেছনে থাকা বাতিঘরের দিকে পিঠ দিয়ে সমুদ্রের দিকে তাকালে একজন মানুষের চোখে কী ধরনের দৃশ্য তৈরি হতে পারে, তা দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ বাতিঘরটি স্থির অবস্থানে থাকলেও দর্শকের কাছে তার আলোকে সমুদ্রের মাঝখানে অবস্থান করছে বলে মনে হতে পারে।
কেন দেখা যায় ভুতুড়ে বাতিঘর?
লেডি এলিয়ট দ্বীপে নিজেই এই দৃষ্টিবিভ্রমের অভিজ্ঞতা হয়েছিল অধ্যাপক চার্লস কেম্পের। বিষয়টি আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য তিনি ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি বা ভিআর প্রযুক্তি ব্যবহার করে একই ধরনের একটি কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করেন। গবেষক সাইমন ক্রপার, চার্লস কেম্প এবং ওয়েলুন জু এই পরীক্ষার মাধ্যমে বিভ্রমটির একটি ব্যাখ্যা খুঁজে পান।
তাঁদের মতে, এর মূল কারণ দূরত্ব সম্পর্কে মানুষের মস্তিষ্কের ভুল অনুমান। বিশেষ করে রাতের অন্ধকারে দূরের কোনো আলোর প্রকৃত অবস্থান ও দূরত্ব নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
গবেষকদের ব্যাখ্যায়, মানুষ চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা তৈরি করে চোখে পাওয়া তথ্য এবং আগে থেকে থাকা প্রত্যাশার সমন্বয়ে। কিন্তু রাতের বেলায় দূরত্ব বোঝার জন্য প্রয়োজনীয় দৃশ্যমান সংকেত অনেকটাই কমে যায়। সমুদ্রের দিকে তাকালে আশপাশে পরিচিত কোনো বস্তু বা স্থাপনা না থাকায় এই সমস্যা আরও বাড়ে। তখন মস্তিষ্ক নিজের অনুমানের ওপর বেশি নির্ভর করে।
আধুনিক বাতিঘরগুলো অনেক উঁচু এবং শক্তিশালী আলোসম্পন্ন হয়। সমুদ্রের বহু দূর থেকে জাহাজের নাবিকেরা যেন সেই আলো দেখতে পান, সে জন্যই এমন ব্যবস্থা রাখা হয়। কিন্তু মানুষের মস্তিষ্ক সাধারণত কাছাকাছি দূরত্বের বস্তু দেখার অভিজ্ঞতার সঙ্গে বেশি পরিচিত। ফলে অনেক দূরের বাতিঘরের আলোকে প্রকৃত অবস্থানের তুলনায় কাছাকাছি কোথাও রয়েছে বলে মনে করতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় আলোর গতির আরেকটি বিষয়। অনেক দূরে থাকা বাতিঘরের ঘূর্ণায়মান আলোর রশ্মি যখন পর্যবেক্ষকের চোখে পড়ে, তখন মস্তিষ্ক তার দূরত্ব ও গতির সঠিক হিসাব করতে পারে না। ফলে দূরের আলোকে কাছাকাছি কোনো বস্তুর মতো মনে হয়। কাছের কোনো বস্তু চোখের সামনে দিয়ে গেলে তার গতিও তুলনামূলক ধীর বলে অনুভূত হতে পারে।
এভাবে প্রকৃত অবস্থান ও গতির সঙ্গে মস্তিষ্কের তৈরি ধারণার পার্থক্য থেকেই বাতিঘরের আলোকে সমুদ্রের মাঝখানে ভাসমান বলে মনে হয়।
গবেষকেরা তাঁদের ব্যাখ্যায় জানিয়েছেন, মানুষের দৃষ্টিশক্তি সব সময় বাইরের জগতের নিখুঁত ছবি তুলে ধরে না। বরং চোখ থেকে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে মস্তিষ্কের প্রত্যাশা ও পূর্ব অভিজ্ঞতা মিলিয়ে আমরা চারপাশের দৃশ্য বুঝতে চেষ্টা করি। এই ধরনের দৃষ্টিবিভ্রম মানুষের মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে, তা বোঝার সুযোগ তৈরি করে।
গবেষণায় দূরত্বের যে হিসাব পাওয়া গেছে
অতীতে নাবিকদের কাছ থেকেও ফ্যান্টম লাইটহাউসের এমন অভিজ্ঞতার বিবরণ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তাঁরা বাতিঘর কিংবা প্রবালপ্রাচীর থেকে অন্তত এক কিলোমিটার বা তারও বেশি দূরে অবস্থান করছিলেন।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ৩০ মিটার বা প্রায় ১০০ ফুট উঁচু একটি বাতিঘর থেকে অন্তত ৬৭ মিটার বা ২২০ ফুট দূরে থাকলে এই দৃষ্টিবিভ্রম তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ বাতিঘরের উচ্চতার পাশাপাশি পর্যবেক্ষকের অবস্থানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, বাতিঘর থেকে প্রায় ৬৭ মিটার দূরত্বে দাঁড়ালে দর্শকের মনে আলোটি সামনে থেকে আসছে, নাকি পেছন থেকে আসছে, তা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। এই দূরত্ব আরও বাড়লে বাতিঘরের প্রকৃত অবস্থান জানা থাকা সত্ত্বেও সমুদ্রের মাঝখানে আলো ভাসছে বলে মনে হতে পারে।
এই ধারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দৃষ্টিবিভ্রমটি ঘটার ক্ষেত্রে বাতিঘর থেকে দর্শকের দূরত্বের ভূমিকা রয়েছে। এর আগে প্রচলিত কিছু ব্যাখ্যায় বলা হয়েছিল, দর্শক কতটা দূরে অবস্থান করছেন, তা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয়।
ভিআর প্রযুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন দূরত্বে বাতিঘরের আলো কেমন দেখায়, তা পরীক্ষা করেন গবেষকেরা। পরীক্ষায় পাওয়া ফলাফল তাঁদের পূর্বানুমানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। লেডি এলিয়ট দ্বীপে গবেষকদের নিজেদের অভিজ্ঞতাও এই ব্যাখ্যাকে সমর্থন করেছে। তবে তাঁরা অন্য কোনো ব্যক্তির ওপর আলাদাভাবে আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা চালাননি।
বাতিঘরের আলো নিচের দিকে বাঁকতে দেখা যায় কেন?
বাতিঘর ঘিরে আরেকটি অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথাও জানিয়েছেন অনেকে। তাঁদের মনে হয়, বাতিঘরের আলো সমুদ্রের পানির সমান্তরালে ছড়িয়ে পড়ার পরিবর্তে নিচের দিকে বাঁক নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
গবেষকদের ধারণা, ফ্যান্টম লাইটহাউসের মতো এই ঘটনাটিও মানুষের দৃষ্টিবিভ্রম ও দূরত্ব নির্ধারণের ভুলের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। অর্থাৎ আলো কীভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, তা বোঝার ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের ভুল অনুমান এমন অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
লেডি এলিয়ট দ্বীপের আরেকটি বিশেষত্ব হলো, সেখানে দুটি বাতিঘর রয়েছে। পুরোনো বাতিঘরটি প্রায় ১২০ বছর ধরে ব্যবহৃত হওয়ার পর ১৯৯৫ সালে বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে স্থাপনাটি সংরক্ষণ করা হয়েছে।
গবেষকদের মতে, পুরোনো বাতিঘরটি চালু থাকলেও এই দৃষ্টিবিভ্রমের মূল কারণ সেটি হতো না। কারণ, বিষয়টি মূলত মানুষের চোখ ও মস্তিষ্কের দূরত্ব এবং আলোর অবস্থান বোঝার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই গবেষণার বিস্তারিত ফলাফল ‘ওপেন মাইন্ড’ জার্নালে প্রকাশ করা হয়েছে। আগ্রহীরা সেখান থেকে গবেষণাটি পড়ে ভুতুড়ে বাতিঘরের এই অদ্ভুত দৃষ্টিবিভ্রম সম্পর্কে আরও জানতে পারবেন।
প্রতি / এডি / শাআ



















