ছাগল নাকি গেছো ভূত! গাছের মগডালে উঠে চলে মহাভোজ

প্রকাশঃ নভেম্বর ২, ২০২৬ সময়ঃ ৯:৩৪ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৯:৩৪ অপরাহ্ণ

ছাগলকে সাধারণত মাঠে ঘাস খেতে, ঝোপঝাড়ে ঘুরতে কিংবা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে পাতা চিবোতে দেখা যায়। কিন্তু মরক্কোর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গেলে চোখে পড়বে ব্যতিক্রমী এক দৃশ্য। সেখানে ছাগল শুধু গাছের নিচে দাঁড়িয়ে খাবারের অপেক্ষা করে না, নিজেরাই উঠে পড়ে গাছের ডালে। কখনো মাঝারি উচ্চতার ডালে, আবার কখনো একেবারে গাছের চূড়ায় দাঁড়িয়ে খাওয়াদাওয়া করে তারা। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, গাছে ফলের বদলে ছাগল ঝুলে আছে!

ছাগলের এমন অদ্ভুত আচরণের পেছনে রয়েছে মরক্কোর বিখ্যাত আরগান গাছ। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শুষ্ক ও আধা-শুষ্ক এলাকায় এই গাছের দেখা মেলে। বিশেষ করে আগাদির ও এসাওইরা অঞ্চলের আশপাশে রয়েছে আরগান গাছের বিস্তীর্ণ বনভূমি। শুষ্ক আবহাওয়ায় টিকে থাকার অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে এই গাছের।

আরগান গাছে ছোট ছোট পাতা ও জলপাইয়ের মতো দেখতে ফল ধরে। ফলের বাইরের অংশে থাকা রসালো শাঁস ছাগলের অত্যন্ত পছন্দের খাবার। সাধারণত মাঠে পর্যাপ্ত ঘাস ও অন্যান্য খাবার পাওয়া গেলে ছাগলকে গাছে উঠতে দেখা যায় না। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে যখন মাঠে ঘাসের অভাব দেখা দেয়, তখন খাবারের সন্ধানে তারা আরগান গাছের দিকে ছুটে যায়। মাটিতে দাঁড়িয়ে ফল বা পাতার নাগাল না পেলে শুরু হয় গাছে ওঠার চেষ্টা।

আরগান গাছের ডালপালা বেশ ঘন এবং কিছু জায়গায় কাঁটাযুক্ত। তারপরও ছাগল তাদের শক্ত পা ও বিভক্ত খুরের সাহায্যে গাছের গুঁড়ি এবং ডাল আঁকড়ে ধরে ওপরে উঠে যায়। খুরের বিশেষ গঠন তাদের পাথুরে ও অসমান জায়গায় চলাফেরায় সহায়তা করে। গাছে ওঠার সময়ও সেই শারীরিক দক্ষতা কাজে লাগায় তারা।

কখনো একটি গাছেই একসঙ্গে কয়েকটি ছাগলকে দেখা যায়। কেউ থাকে গুঁড়ির কাছের ডালে, কেউ আবার অনেকটা উঁচুতে সরু ডালের ওপর দাঁড়িয়ে পাতা ও ফল খায়। শুধু তা-ই নয়, শরীরের ভারসাম্য বজায় রেখে এক ডাল থেকে অন্য ডালেও চলাচল করতে পারে তারা। তবে ডাল বেশি সরু হলে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে। ফলে দৃশ্যটি যেমন মজার, তেমনি ছাগলের শারীরিক সক্ষমতারও পরিচয় দেয়।

স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, ছোটবেলা থেকেই অন্য ছাগলকে গাছে উঠতে দেখে এই কৌশল শেখে তারা। কিছু এলাকায় রাখালেরাও ছাগলের এ ধরনের অভ্যাসে উৎসাহ দেন। তবে এই আচরণ কীভাবে গড়ে উঠেছে, তা নিয়ে একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে। খাবারের সংকট, আরগান ফলের প্রতি আকর্ষণ এবং অন্য ছাগলকে অনুসরণ করার প্রবণতা, সব মিলিয়েই তাদের গাছে ওঠার অভ্যাস তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হয়।

ছাগলের গাছে ওঠার বিষয়টি কেবল পর্যটকদের কৌতূহল মেটায় না, পরিবেশের জন্যও এর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। আরগান ফলের ভেতরে থাকে শক্ত খোলসযুক্ত বীজ। ছাগল ফলের শাঁস খেয়ে ফেললেও শক্ত বীজ সাধারণত হজম করতে পারে না। অনেক সময় জাবর কাটার সময় মুখ থেকে বীজ ফেলে দেয়। আবার কিছু বীজ মলের সঙ্গে মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে।

এভাবে মূল গাছ থেকে দূরে বীজ পৌঁছে যাওয়ায় নতুন জায়গায় আরগান গাছ জন্মানোর সুযোগ তৈরি হয়। অবশ্য ছড়িয়ে পড়া সব বীজ থেকেই নতুন গাছ জন্মায় না। এ ক্ষেত্রে মাটির গুণাগুণ, আর্দ্রতা ও আবহাওয়ার মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, খাবারের সন্ধানে গাছে উঠে ছাগল একদিকে যেমন নিজেদের ক্ষুধা মেটায়, অন্যদিকে আরগান গাছের বংশবিস্তারে ভূমিকা রাখে।

আরগান গাছের গুরুত্ব অবশ্য ছাগলের খাবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মরক্কোর অর্থনীতি ও স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গেও গাছটি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এর ফলের শক্ত বীজ সংগ্রহ করে ভেতরের শাঁস থেকে তৈরি করা হয় আরগান তেল। প্রসাধনী শিল্পে এই তেলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ত্বক ও চুলের যত্নে ব্যবহৃত বিভিন্ন পণ্যে আরগান তেল ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি বিশেষ ধরনের আরগান তেল খাবার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

স্থানীয় নারীদের অনেক সমবায় সংস্থা আরগান ফল সংগ্রহ, বীজ ভাঙা এবং তেল তৈরির কাজে যুক্ত। এই শিল্পের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করেন বহু পরিবারের সদস্যরা।

মরক্কোয় বেড়াতে যাওয়া পর্যটকদের কাছেও গাছে চড়া ছাগল এখন অন্যতম আকর্ষণ। রাস্তার পাশের আরগান গাছে একসঙ্গে কয়েকটি ছাগলকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে অনেক পর্যটকই গাড়ি থামিয়ে ছবি তোলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে এই অদ্ভুত দৃশ্যের নানা ছবি ও ভিডিও।

সব মিলিয়ে মরক্কোর গাছে চড়া ছাগল প্রকৃতির এক বিস্ময়কর দৃশ্য। খাবারের সন্ধানে তাদের কাছে গাছের ডালই হয়ে ওঠে ভোজের জায়গা। কয়েক মিটার উঁচুতে উঠে দিব্যি খাওয়াদাওয়া করার এই অভ্যাস একই সঙ্গে মজার, বিস্ময়কর এবং প্রাণীদের অভিযোজনক্ষমতার এক অনন্য উদাহরণ।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

November 2026
SSMTWTF
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930 
20G