বিশ্বজুড়ে বাড়ছে সংঘাত, তবে কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন?
সৌদি আরবের রিয়াদ বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ইউক্রেনে রুশ আক্রমণে শতাধিক বেসামরিক মানুষের মৃত্যু, ইউরোপে রুশ নাশকতার আশঙ্কা এবং চীনের উপকূলজুড়ে টানা ছয় দিনের সামরিক মহড়া। অক্টোবরের মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা নতুন করে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কয়েক দশক ধরে তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকা পশ্চিম ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলেও এখন সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে ৬৫টি সংঘাত চলমান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একসঙ্গে এত বেশি সংঘাতের নজির আর দেখা যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, পৃথিবী কি আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রধান কূটনৈতিক ভাষ্যকার গিডিয়ন র্যাকম্যান মনে করেন, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে বড় বিপদ কোনো দেশের পরিকল্পিতভাবে বিশ্বযুদ্ধ শুরু করা নয়। বরং পরাশক্তিগুলোর ভুল হিসাব, ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা প্রতিপক্ষের অবস্থান বুঝতে না পারার কারণেই বড় ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
যুদ্ধের পরিস্থিতি কত দ্রুত বদলে যেতে পারে, তার উদাহরণ হিসেবে ২০২২ সালের মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের কথা উল্লেখ করেছেন র্যাকম্যান। ওই সম্মেলন শেষ হওয়ার মাত্র চার দিন পর ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া।
সম্মেলন চলাকালে এক নৈশভোজে উপস্থিত ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় গোয়েন্দা দপ্তরের তৎকালীন প্রধান অ্যান্ড্রু শিয়ারার। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার সময় সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনকে তিনি বলেছিলেন, ‘একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমাদের এমন আলোচনা করতে হচ্ছে, তা বিশ্বাস হচ্ছে না।’
ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয়, যুদ্ধের আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা চললেও বাস্তবে সংঘাত শুরু হতে খুব বেশি সময় লাগে না। রুশ বিপ্লবী লিওন ট্রটস্কির নামে প্রচলিত একটি উক্তিও এ প্রসঙ্গে প্রায়ই উল্লেখ করা হয়, ‘আপনি হয়তো যুদ্ধে আগ্রহী নন, কিন্তু যুদ্ধ আপনার ব্যাপারে আগ্রহী।’
বিশ্বযুদ্ধ বলতে কী বোঝায়?
বিশ্বযুদ্ধের ধারণা বুঝতে গেলে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের কথা সামনে আসে। প্রথমত, বিশ্বের প্রধান সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিগুলোকে সরাসরি পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এমন পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছিল।
দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের বিস্তৃতি একাধিক মহাদেশে ছড়িয়ে পড়তে হয়। বর্তমান বিশ্বে নানা অঞ্চলে সংঘাত চললেও এখন পর্যন্ত এই দুটি বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে পূরণ হয়নি। তবে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বিশ্বনেতাদের বক্তব্যে বারবার আসছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রসঙ্গ
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা এখন আর শুধু বিশ্লেষকদের আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতারাও প্রকাশ্যে এ বিষয়ে উদ্বেগ জানাচ্ছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি, ইউক্রেনকে পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক সহায়তা দেওয়ার ফলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি মনে করেন, পুতিনের আগ্রাসন বন্ধ করা না গেলে আন্তর্জাতিক সংঘাত আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে।
জেলেনস্কির ভাষায়, ‘পুরো বিশ্বকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা পুতিনকে থামাতে চাই, নাকি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা দেখতে চাই।’
ইউরোপের নেতারাও রাশিয়ার সামরিক তৎপরতাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন। ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে ইউরোপীয় দেশগুলোকে সতর্ক করে বলেছেন, অতীতের প্রজন্ম যে মাত্রার যুদ্ধ দেখেছে, সেই ধরনের পরিস্থিতির জন্যও প্রস্তুতি রাখা প্রয়োজন।
এশিয়াতেও নতুন শক্তির প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং প্রায়ই ‘থুসিডিডিস ট্র্যাপ’ তত্ত্বের প্রসঙ্গ তোলেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠিত কোনো পরাশক্তির সামনে দ্রুত উত্থানশীল নতুন শক্তি প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠলে দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়ে।
চীন ইতিমধ্যে বিশ্বের বৃহত্তম নৌবাহিনী গড়ে তুলেছে। প্রয়োজনে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে তাইওয়ান নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছে বেইজিং। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন একাধিকবার বলেছেন, তাইওয়ানের ওপর হামলা হলে দ্বীপটির প্রতিরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিকভাবে এগিয়ে আসতে পারে।
আঞ্চলিক সংঘাত কীভাবে যুক্ত হচ্ছে একে অপরের সঙ্গে
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান যুদ্ধগুলোকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ কমে আসছে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে উত্তর কোরিয়ার সেনাদের সরাসরি অংশগ্রহণ পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। জেলেনস্কি এই ঘটনাকে বিশ্বযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যেও রাশিয়া ও ইরানের সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে ইরান রাশিয়ার গোয়েন্দা সহায়তা পেয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে ইউক্রেন নিজেদের ড্রোন প্রতিরোধের অভিজ্ঞতা উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বিনিময়ের প্রস্তাব দিয়েছে।
রাশিয়া, চীন, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতাও পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। অনেক বিশ্লেষক এই চার দেশের সম্পর্ককে ‘প্রতিপক্ষের অক্ষ’ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
২০২৪ সালে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর আগে ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন শুরুর ঠিক আগে মস্কো ও বেইজিং নিজেদের সম্পর্ককে ‘সীমাহীন অংশীদারত্ব’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল।
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও রাশিয়ার সামরিক উৎপাদন অব্যাহত রাখতে চীনের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যদিও চারটি দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য পুরোপুরি এক নয়, তবু যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি তাদের অসন্তোষ একটি অভিন্ন জায়গা তৈরি করেছে।
ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে রাশিয়া ও চীন ইউরোপ এবং এশিয়ায় একই সময়ে সমন্বিত সামরিক অভিযান চালানোর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন
গিডিয়ন র্যাকম্যানের বিশ্লেষণে, বিশ্বজুড়ে সংঘাত বাড়ার অন্যতম কারণ আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন। ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীর পতনের সময় জি৭ জোটের দেশগুলোর হাতে ছিল বিশ্বের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। একই সময়ে বৈশ্বিক সামরিক ব্যয়েরও বড় অংশ ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে।
কিন্তু ২০২২ সালের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে জি৭-এর অংশ কমে প্রায় ৪৩ শতাংশে নেমে আসে। বৈশ্বিক সামরিক ব্যয়েও তাদের সম্মিলিত অংশ আগের তুলনায় অনেক কমে যায়।
পশ্চিমা শক্তিগুলোর এই আপেক্ষিক প্রভাব হ্রাস পাওয়ায় আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় অসন্তুষ্ট দেশগুলো আরও বেশি ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
এর পাশাপাশি আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানের প্রতি অনীহা তৈরি করেছে। বারাক ওবামা, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেন প্রত্যেকেই বিদেশে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অবসানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ওয়াশিংটনের এই অবস্থান রাশিয়া ও চীনের মতো দেশকে আরও আগ্রাসী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে বলে মনে করেন র্যাকম্যান।
শক্তির রাজনীতি কি আন্তর্জাতিক নিয়মকে দুর্বল করছে?
বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব এবং সামরিক শক্তি প্রদর্শনের প্রবণতাও বেড়েছে। ভ্লাদিমির পুতিন, সি চিন পিং, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মতো নেতাদের রাজনৈতিক অবস্থানে শক্তি প্রয়োগের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
ট্রাম্পের উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার এক বক্তব্যে বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক শিষ্টাচার নিয়ে আপনি যত খুশি কথা বলতে পারেন। কিন্তু বাস্তব পৃথিবী চলে শক্তি, বলপ্রয়োগ ও ক্ষমতার নিয়মে।’
এ ধরনের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক আইনের প্রচলিত কাঠামোর জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। অন্য দেশের ভূখণ্ড দখল কিংবা সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ না করার নীতিও চাপের মুখে পড়ছে।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আগ্রহ প্রকাশ নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। একইভাবে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার বক্তব্যও দেশটির নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
পরাশক্তিগুলোর প্রতিরোধব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা থাকলেও সরাসরি সংঘাত এড়ানো সম্ভব হয়েছিল। এর অন্যতম কারণ ছিল সামরিক প্রতিরোধ বা ডিটারেন্স কৌশল। উভয় পক্ষই জানত, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে যুদ্ধে জড়ালে তার পরিণতি দুই দেশের জন্যই ভয়াবহ হবে।
১৯৬২ সালের কিউবা ক্ষেপণাস্ত্র সংকট ছিল এর বড় উদাহরণ। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিল। শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে সংকটের অবসান ঘটে।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এই প্রতিরোধব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ট্রাম্প নিয়মিত ন্যাটোর ইউরোপীয় মিত্রদের সমালোচনা করছেন। ফলে বাল্টিক অঞ্চলের দেশ, পোল্যান্ড, জাপান কিংবা যুক্তরাজ্য সামরিক হামলার শিকার হলে যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত কতটা সহায়তা করবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ইতিহাসের ভুল হিসাব থেকে আসতে পারে বড় বিপদ
ইতিহাসে দেখা গেছে, বড় যুদ্ধের সূচনায় অনেক সময় প্রতিপক্ষের অবস্থান সম্পর্কে ভুল ধারণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর সময় যুক্তরাজ্য বেলজিয়ামের নিরপেক্ষতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু জার্মান সরকার ধারণা করেছিল, বেলজিয়ামে হামলা হলেও যুক্তরাজ্য সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেবে না। তাদের কাছে ১৮৩৯ সালের চুক্তিটি ছিল কার্যত একটি কাগুজে অঙ্গীকার।
কিন্তু সেই হিসাব ভুল প্রমাণিত হয়। জার্মানির আগ্রাসনের পর যুক্তরাজ্য যুদ্ধে যোগ দেয়। একই ধরনের ভুল ধারণা তৈরি হয়েছিল ১৯৩৯ সালেও। অ্যাডলফ হিটলার মনে করেছিলেন, পোল্যান্ডের ওপর হামলা হলে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স হয়তো আগের মতোই কঠোর পদক্ষেপ নেবে না। কিন্তু দুই দেশ জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এভাবেই শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস বর্তমান ইউরোপের পরিস্থিতি বোঝাতে বলেছেন, ‘আমরা যুদ্ধে নেই, তবে শান্তিতেও নেই।’
বর্তমানে ন্যাটোর সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। জোটটির ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে আক্রান্ত দেশকে সহায়তা করার ধরন ও মাত্রা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিটি সদস্যের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ সরাসরি সেনা পাঠানো বাধ্যতামূলক নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্টের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এই আইনের আওতায় তাইওয়ানকে আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র সরবরাহের ব্যবস্থা থাকলেও দ্বীপটির ওপর হামলা হলে মার্কিন সেনা পাঠানোর সরাসরি বাধ্যবাধকতা নেই।
এই অস্পষ্টতা থেকেই বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। চীন কিংবা রাশিয়া যদি মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কার্যকর হবে না, তাহলে তারা আরও বড় সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সাহস পেতে পারে।
সব মিলিয়ে বর্তমান বিশ্বে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তবে বিভিন্ন অঞ্চলের সংঘাত, পরাশক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সামরিক জোটের অনিশ্চয়তা এবং ভুল সিদ্ধান্তের আশঙ্কা পরিস্থিতিকে বিপজ্জনক করে তুলছে।
গিডিয়ন র্যাকম্যানের বিশ্লেষণের মূল বক্তব্যও এখানেই। কোনো দেশ হয়তো সরাসরি বিশ্বযুদ্ধ চায় না, কিন্তু প্রতিপক্ষের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ভুল ধারণা কিংবা একটি অনাকাঙ্ক্ষিত সামরিক সংঘর্ষ এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।
প্রতি / এডি / শাআ



















