ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি স্বপ্ন, আবেগ এবং কিংবদন্তি তৈরির মঞ্চ। ২০২৬ বিশ্বকাপে যখন নতুন প্রজন্মের তারকারা আলো ছড়াতে প্রস্তুত, তখনও কোটি কোটি চোখ আটকে আছে একজন মানুষের দিকে। তিনি ব্রাজিলের দশ নম্বর জার্সিধারী, ড্রিবলিংয়ের জাদুকর, বিতর্ক ও প্রতিভার অনন্য মিশেল— Neymar।
অনেকের কাছে এটি হয়তো নেইমারের শেষ বিশ্বকাপ। তাই এবারের আসর শুধু ব্রাজিলের জন্য নয়, নেইমারের ব্যক্তিগত উত্তরাধিকারের জন্যও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
১৯৯২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ব্রাজিলের Mogi das Cruzes শহরে জন্মগ্রহণ করেন নেইমার দা সিলভা সান্তোস জুনিয়র।
শৈশবে পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। ছোট্ট বয়স থেকেই ফুটসাল ও রাস্তার ফুটবলে নিজের প্রতিভার ঝলক দেখাতে শুরু করেন তিনি। মাত্র ১১ বছর বয়সে যোগ দেন Santos FC-এর যুব একাডেমিতে।
অনেকেই জানেন না, কিশোর বয়সেই তাকে দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করেছিল Real Madrid। এমনকি স্পেনে ট্রায়ালও দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরিবার ও সান্তোসের সিদ্ধান্তে ব্রাজিলেই থেকে যান।
সেই সিদ্ধান্তই হয়তো গড়ে দেয় ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আকর্ষণীয় ক্যারিয়ার।
২০১০ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে সান্তোসের মূল দলে ঝড় তোলেন নেইমার। তার গতি, ড্রিবলিং এবং গোল করার দক্ষতা দেখে অনেকেই তাকে ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি Pelé-এর উত্তরসূরি বলতে শুরু করেন।
২০১১ সালে সান্তোসকে জেতান দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ক্লাব টুর্নামেন্ট Copa Libertadores। এটি ছিল সান্তোসের ৪৮ বছরের অপেক্ষার অবসান।
সেই সময় থেকেই ইউরোপের বড় বড় ক্লাবগুলো তার জন্য লড়াই শুরু করে।
২০১৩ সালে নেইমার যোগ দেন FC Barcelona-এ। সেখানে তিনি গড়ে তোলেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর আক্রমণভাগ “এমএসএন”। তার দুই সঙ্গী ছিলেন Lionel Messi এবং Luis Suárez।
২০১৪-১৫ মৌসুমে এই ত্রয়ী মিলে ১২২ গোল করে বিশ্ব ফুটবলে তোলপাড় ফেলে দেয়।
সেই মৌসুমেই বার্সেলোনা জিতে নেয় ট্রেবল। নেইমার জেতেন—
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে গোলও করেছিলেন তিনি।
২০১৭ সালে ফুটবল বিশ্ব স্তব্ধ হয়ে যায়। Paris Saint-Germain নেইমারকে কিনে নেয় ২২২ মিলিয়ন ইউরো ট্রান্সফার ফিতে।
আজও সেটি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্রান্সফার।
অনেকের মতে, এটি ছিল নিজের পরিচয় গড়ার চেষ্টা। কারণ বার্সেলোনায় মেসির ছায়া থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন তিনি।
যদিও পিএসজিতে বহু শিরোপা জিতেছেন, কিন্তু চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের স্বপ্ন পূরণ হয়নি।
দীর্ঘদিন ধরে ব্রাজিলের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড ছিল পেলের। কিন্তু ২০২৩ সালে নেইমার সেই রেকর্ড ভেঙে ব্রাজিল জাতীয় দলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন।
এটি এমন একটি অর্জন, যা অনেক সমালোচনার মাঝেও তাকে ব্রাজিল ফুটবলের সর্বকালের সেরাদের তালিকায় স্থায়ী জায়গা এনে দিয়েছে।
নেইমারের বাবার নামও নেইমার। বাবার নাম অনুসারেই তার নাম রাখা হয়েছিল।
তার অসাধারণ বল নিয়ন্ত্রণ ও সংকীর্ণ জায়গায় ড্রিবলিংয়ের পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে ফুটসালের।
মাত্র ১৯ বছর বয়সে প্রথমবারের মতো বাবা হন নেইমার।
ফুটবলের বাইরে অবসর সময়ে তিনি নিয়মিত ভিডিও গেম খেলেন এবং ই-স্পোর্টসের প্রতিও তার আগ্রহ রয়েছে।
২০১৬ সালের Rio 2016 Olympic Games-এ ব্রাজিলকে প্রথমবারের মতো ফুটবলে অলিম্পিক স্বর্ণ জেতান নেইমার।
ফাইনালে পেনাল্টির শেষ শটটি তিনিই নিয়েছিলেন।
নেইমার চারটি বিশ্বকাপ খেলেছেন।
বিশ্বকাপে তার প্রতিভার ঝলক বহুবার দেখা গেলেও এখনও ট্রফি ছোঁয়া হয়নি।
এটাই তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা।
ফুটবল বিশ্বে এখন নতুন প্রজন্মের উত্থান ঘটেছে। কিন্তু বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব এবং বড় ম্যাচের মানসিকতা এখনও অমূল্য।
নেইমার শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি ব্রাজিলের স্বপ্নের প্রতীক।
অনেকেই মনে করেন, যদি ব্রাজিল এবারের বিশ্বকাপে শিরোপা জেতে, তাহলে নেইমারের পুরো ক্যারিয়ারকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করা হবে। সমালোচনা, বিতর্ক এবং অপূর্ণতার গল্প ছাপিয়ে তিনি জায়গা করে নেবেন বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তিদের কাতারে।
ফুটবলের ইতিহাসে কিছু খেলোয়াড় আছেন, যাদের প্রতিভা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। নেইমার তাদেরই একজন। কিন্তু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত শুধু প্রতিভা মনে রাখে না, মনে রাখে অর্জনও।
২০২৬ বিশ্বকাপ তাই নেইমারের জন্য শুধু আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়। এটি হতে পারে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
হয়তো এটাই হবে সেই মঞ্চ, যেখানে তিনি অবশেষে ব্রাজিলকে এনে দেবেন বহু প্রতীক্ষিত বিশ্বকাপ। অথবা এটি হবে এক অসাধারণ প্রতিভার শেষ বিশ্বকাপ নৃত্য।
যাই ঘটুক, ফুটবল বিশ্ব নিশ্চিতভাবেই জানে, নেইমার মাঠে থাকলে গল্পের শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত কিছুই অসম্ভব নয়।
প্রতি / এডি / শাআ