মাত্র ১৮ বছর বয়সেই বিশ্বজয়ের স্বপ্ন, লামিন ইয়ামালের অবিশ্বাস্য উত্থানের গল্প
২০২৬ বিশ্বকাপের আলোচনায় যদি একটি নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়, তবে সেটি লামিন ইয়ামাল। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই তিনি এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছেন, যেখানে অনেক কিংবদন্তি ফুটবলারও ক্যারিয়ারের অনেক পরে পৌঁছাতে পেরেছেন। বিশ্বকাপের মঞ্চে স্পেনের সবচেয়ে বড় ভরসা, বার্সেলোনার ভবিষ্যৎ মুখ এবং বিশ্ব ফুটবলের পরবর্তী সুপারস্টার হিসেবে এখন তাকেই দেখছেন অনেকে।
কিন্তু লামিন ইয়ামালের গল্প শুধু একজন প্রতিভাবান ফুটবলারের গল্প নয়। এটি একটি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখার গল্প।
২০০৭ সালের ১৩ জুলাই স্পেনের কাতালোনিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন লামিন ইয়ামাল নাসরাউই এবানা। তার বাবা মরক্কোর এবং মা ইকুয়েটোরিয়াল গিনির নাগরিক। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি ছিল অসাধারণ আকর্ষণ। অনেক শিশুই ফুটবল খেলে, কিন্তু ইয়ামালের মধ্যে ছিল এমন কিছু, যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল। মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি যোগ দেন বার্সেলোনার বিখ্যাত একাডেমি ‘লা মাসিয়ায়’। সেখান থেকেই শুরু হয় তার অসাধারণ যাত্রা।
লা মাসিয়া বহু তারকার জন্ম দিয়েছে। লিওনেল মেসি, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, জাভি হার্নান্দেজ থেকে শুরু করে বর্তমান প্রজন্মের বহু তারকা এখান থেকে উঠে এসেছেন। কিন্তু ইয়ামালকে নিয়ে প্রশিক্ষকদের উচ্ছ্বাস ছিল অন্যরকম। বয়সভিত্তিক দলে খেলতে খেলতেই তিনি বড়দের দৃষ্টি কাড়তে শুরু করেন।
মাত্র ১৫ বছর ২৯১ দিন বয়সে বার্সেলোনার সিনিয়র দলে অভিষেক হয় তার। ক্লাবটির ইতিহাসে এত কম বয়সে আর কেউ অভিষেক করতে পারেননি। এরপর যেন রেকর্ড ভাঙাই হয়ে ওঠে তার অভ্যাস। তিনি লা লিগার ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হন, চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে নাম লেখান এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলেও একের পর এক রেকর্ড গড়তে থাকেন।
স্পেন জাতীয় দলে অভিষেকের পরও অপেক্ষা করতে হয়নি বেশি দিন। ২০২৩ সালে জর্জিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে গোল করে তিনি স্পেনের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী গোলদাতা হন। তখনই স্প্যানিশ ফুটবল বুঝতে শুরু করে, তাদের হাতে নতুন এক রত্ন উঠে এসেছে।
বিশ্ব ফুটবলের সামনে ইয়ামালের প্রকৃত বিস্ফোরণ ঘটে ইউরো ২০২৪-এ। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে খেলেন এবং ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে টুর্নামেন্টে অংশ নেন। শুধু অংশ নিয়েই থেমে থাকেননি। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে দুর্দান্ত এক গোল করে তিনি ইউরোর ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হন। সেই গোল আজও অনেকের কাছে টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা মুহূর্ত।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ফাইনালেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পুরো টুর্নামেন্টে একটি গোল এবং চারটি অ্যাসিস্ট করে স্পেনকে শিরোপা জেতাতে বড় অবদান রাখেন। এর ফলে তিনি ইউরো ২০২৪-এর সেরা তরুণ খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বড় কোনো টুর্নামেন্ট জেতা ইতিহাসের সবচেয়ে কম বয়সী ফুটবলারদের একজন হয়ে ওঠেন।
তবে ইয়ামালের গল্পে কিছু মজার তথ্যও রয়েছে, যা অনেকেই জানেন না।
ইউরো ২০২৪ চলাকালেই তিনি স্কুলের পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। টুর্নামেন্টের ব্যস্ত সময়ের মধ্যেও অনলাইনে পড়াশোনা করে মাধ্যমিক শিক্ষার সনদ সম্পন্ন করেন। ফুটবল আর শিক্ষাজীবন একসঙ্গে চালিয়ে নেওয়ার এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
আরেকটি বিষয় হলো, মাঠে তার খেলার ধরন দেখে অনেকেই মেসির সঙ্গে তুলনা করলেও ইয়ামাল নিজে ছোটবেলায় ব্রাজিলিয়ান তারকা নেইমারের খেলা দেখে বেশি অনুপ্রাণিত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন। তার ড্রিবলিং, দ্রুত দিক পরিবর্তন এবং সাহসী আক্রমণাত্মক ফুটবলে সেই প্রভাবও খুঁজে পাওয়া যায়।
বিশ্বকাপ ২০২৬ শুরু হওয়ার আগেই ফুটবলবিশ্বে একটি বড় প্রশ্ন ঘুরছিল, লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে কিংবা জুড বেলিংহামের যুগের পর সবচেয়ে বড় তারকা কে হবেন? অনেক বিশ্লেষকের উত্তর ছিল একটাই, লামিন ইয়ামাল। ফিফাও তাকে আগামী প্রজন্মের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে তুলে ধরেছে।
বিশ্বকাপের আগে তিনি চোটে পড়েছিলেন। ফলে স্পেনের প্রথম ম্যাচে তাকে পুরো সময় খেলানো হয়নি। তবু তার নামই ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। স্প্যানিশ মিডিয়া থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, সবাই নজর রাখছে তার ওপর। স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তেও জানিয়েছেন, ইয়ামাল তাদের প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তার সতীর্থ রদ্রি সম্প্রতি জানিয়েছেন, বিশ্বকাপ নিয়ে ইয়ামালের মনোযোগ ও একাগ্রতা অবিশ্বাস্য। বয়স কম হলেও বড় মঞ্চের চাপ সামলানোর ক্ষমতা তার মধ্যে রয়েছে।
আজকের দিনে লামিন ইয়ামালকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, তিনি কি পেলের মতো কিশোর বয়সেই বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস গড়তে পারবেন? ১৯৫৮ সালে ১৭ বছর বয়সী পেলে বিশ্বকাপ জিতে কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন। প্রায় সাত দশক পরে ফুটবল বিশ্ব আবারও এমন এক কিশোরকে দেখছে, যার সামনে একই রকম সম্ভাবনার দরজা খোলা।
ফুটবলের ইতিহাসে মাঝে মাঝে এমন কিছু খেলোয়াড় আসেন, যাদের ক্যারিয়ার শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। তারা হয়ে ওঠেন একটি প্রজন্মের প্রতীক। লামিন ইয়ামাল এখন ঠিক সেই পথেই হাঁটছেন। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই তিনি রেকর্ড, শিরোপা এবং বিস্ময়ের এক অনন্য সমন্বয়। আর ২০২৬ বিশ্বকাপ হয়তো সেই মঞ্চ, যেখানে এই বিস্ময়বালক নিজেকে শুধু তারকা নয়, ভবিষ্যৎ কিংবদন্তি হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন।
প্রতি / এডি / শাআ









