নীরব মহাকাব্যের আরেক নাম বাবা
একটি শিশুর জন্মের মুহূর্ত শুধু একজন নতুন মানুষের পৃথিবীতে আগমন নয়, একই সঙ্গে একজন পুরুষের জীবনে নতুন এক পরিচয়ের সূচনা। হাসপাতালের কক্ষজুড়ে যখন নবজাতকের প্রথম কান্না ধ্বনিত হয়, তখনই শুরু হয় একজন বাবার নতুন যাত্রা। ছোট্ট শিশুটিকে প্রথমবার বুকে জড়িয়ে ধরার সেই মুহূর্তে বদলে যায় তার জীবনের অগ্রাধিকার, স্বপ্ন এবং ভাবনার জগৎ।
বাবা হওয়ার পর একজন মানুষ যেন নিজের চেয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। সন্তানের প্রথম হাঁটা, প্রথম কথা বলা, প্রথম স্কুলে যাওয়া কিংবা জীবনের ছোট-বড় প্রতিটি সাফল্যের পেছনে নীরবে জড়িয়ে থাকে একজন বাবার অবদান। তিনি হয়তো সবসময় সামনে থাকেন না, কিন্তু সন্তানের পথচলার শক্ত ভিত্তি হয়ে থাকেন নিরন্তর।
সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে অনেক বাবাই নিজের ইচ্ছা, শখ কিংবা আরাম-আয়েশ বিসর্জন দেন। সন্তানের প্রয়োজন পূরণ করতে গিয়ে তারা প্রায়ই নিজেদের চাহিদাকে গুরুত্বহীন করে তোলেন। একটি ভালো শিক্ষা, নিরাপদ ভবিষ্যৎ কিংবা একটু স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন নিশ্চিত করার জন্য দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করেন তারা। এই ত্যাগের গল্পগুলো বেশিরভাগ সময়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়।
বাবার ভালোবাসার প্রকাশও অনেকটা ভিন্ন। অনেক বাবা আবেগ প্রকাশে স্বচ্ছন্দ নন। তারা হয়তো খুব বেশি আদর বা মমতার কথা মুখে বলেন না, কিন্তু দায়িত্ব পালন, শাসন, পরামর্শ এবং নিরাপত্তা দেওয়ার মধ্য দিয়েই ভালোবাসা প্রকাশ করেন। ফলে অনেক সময় সন্তানরা বড় হওয়ার আগ পর্যন্ত বাবার অনুভূতির গভীরতা পুরোপুরি বুঝতে পারে না।
সময়ের সঙ্গে সন্তান বড় হয়, নিজের পৃথিবী তৈরি করে। ব্যস্ততা বাড়ে, দূরত্বও তৈরি হয়। অথচ একজন বাবা বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও সন্তানের খবর নেওয়া, তার সাফল্যে আনন্দ পাওয়া কিংবা তার কষ্টে উদ্বিগ্ন হওয়া কখনো বন্ধ করেন না। সন্তানের প্রতি তার মমতা বয়সের সঙ্গে কমে না, বরং আরও গভীর হয়।
জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে অনেক বাবাই নিঃসঙ্গতার মুখোমুখি হন। যে মানুষটি একসময় পরিবারের জন্য নিরলস পরিশ্রম করেছেন, বার্ধক্যে এসে তিনিই কখনো কখনো অবহেলার শিকার হন। অথচ তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়, শক্তি এবং স্বপ্নের বড় অংশ ব্যয় হয়েছে সন্তানের কল্যাণের জন্য।
তবুও বাবারা খুব কমই অভিযোগ করেন। সন্তানের সুখ-শান্তিই তাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তারা সন্তানের মঙ্গল কামনা করে যান এবং তাদের সাফল্যের মধ্যেই নিজের অর্জন খুঁজে নেন।
একসময় বাবা পৃথিবী ছেড়ে চলে যান, কিন্তু তার শিক্ষা, আদর্শ, ত্যাগ এবং ভালোবাসা থেকে যায় সন্তানের জীবনের প্রতিটি বাঁকে। বিশেষ করে যখন কোনো সন্তান নিজে বাবা হয়, তখন সে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারে একজন বাবার দায়িত্ব, ত্যাগ এবং নিঃশর্ত ভালোবাসার মূল্য।
বাবা কেবল একটি সম্পর্কের নাম নয়; তিনি নিরাপত্তা, নির্ভরতা, ত্যাগ এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রতীক। তাই জীবিত থাকতেই তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা প্রকাশ করা উচিত। কারণ অনেক অনুভূতি আছে, যা সময় পেরিয়ে গেলে আর বলা যায় না।
প্রতি / এডি / শাআ









