চিতল মাছকে কেন জীবন্ত জীবাশ্ম বলা হয়
বাজারে বরফের ওপর রাখা চিতল মাছ দেখলে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, মাছটির শরীরের গঠন কি সত্যিই কোটি কোটি বছর ধরে প্রায় একই রকম রয়েছে? ডাইনোসরের যুগে চিতলজাতীয় মাছ দেখতে যেমন ছিল, আজকের চিতলও কি তেমনই?
চিতলের শরীরের বিশেষ আকৃতি এই কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দেয়। মাথার অংশ তুলনামূলক মোটা, আর লেজের দিকে শরীর ক্রমে সরু হয়ে এসেছে। শরীরজুড়ে রয়েছে গোলাকার কালচে দাগ। এই স্বতন্ত্র গঠন দেখেই অনেকের ধারণা, চিতল বুঝি পৃথিবীর প্রাচীনতম জীবন্ত প্রাণীদের একটি। সেখান থেকেই ‘জীবন্ত জীবাশ্ম’ হিসেবে চিতলকে উল্লেখ করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
তবে বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিষয়টি এতটা সরল নয়।
‘জীবন্ত জীবাশ্ম’ বলতে কী বোঝায়
‘জীবন্ত জীবাশ্ম’ কথাটি জীববিজ্ঞানে বেশ পুরোনো একটি ধারণা। ১৮৫৯ সালে প্লাটিপাস ও লাংফিশের মতো প্রাণীদের ক্ষেত্রে এ ধরনের শব্দ ব্যবহারের নজির পাওয়া যায়। সাধারণভাবে এমন প্রাণীকে বোঝাতে শব্দটি ব্যবহার করা হয়, যাদের মধ্যে বহু প্রাচীন বৈশিষ্ট্য এখনো টিকে আছে এবং যাদের বাহ্যিক গঠন দীর্ঘ সময় ধরে খুব বেশি বদলায়নি বলে মনে হয়।
তবে আধুনিক জীববিজ্ঞানে শব্দটির ব্যবহার নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। কারণ কোনো প্রাণী দেখতে পুরোনো ধরনের হলেই ধরে নেওয়া যায় না যে তার বিবর্তন থেমে ছিল।
এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ ল্যাটিমেরিয়া বা সিলাক্যান্থ। ১৯৩৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে জীবিত সিলাক্যান্থ পাওয়া যায়। এর আগে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, এই মাছ প্রায় সাড়ে ছয় কোটি বছর আগেই পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
পরবর্তী গবেষণায় অবশ্য দেখা যায়, বাইরে থেকে মাছটির গঠন দীর্ঘ সময় ধরে একই রকম মনে হলেও এর ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও খুলির গঠনে পরিবর্তন ঘটেছে। অর্থাৎ বাহ্যিকভাবে খুব বেশি পরিবর্তন চোখে না পড়লেও বিবর্তন থেমে ছিল না।
চিতলের বংশধারা কতটা পুরোনো
চিতল মাছ নোটোপ্টেরিডি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এই পরিবার আবার অস্টিওগ্লোসোমরফা নামের তুলনামূলকভাবে প্রাচীন এক মাছের বৃহৎ গোষ্ঠীর অংশ। এই গোষ্ঠীর মাছের জিহ্বায় দাঁতের মতো গঠন থাকে, যা তাদের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
অস্টিওগ্লোসোমরফা গোষ্ঠীর জীবাশ্মের ইতিহাস বেশ পুরোনো। এর অস্তিত্ব আর্লি ক্রিটেশিয়াস যুগ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, অর্থাৎ প্রায় ১১ থেকে ১৩ কোটি বছর আগের সময়েও এই গোষ্ঠীর মাছ ছিল।
আফ্রিকায় পাওয়া প্যালিওনোটোপ্টেরাস গ্রিনউডি নামের একটি জীবাশ্মকে চিতল বা নাইফফিশজাতীয় মাছের প্রাচীন পূর্বপুরুষদের অন্যতম বলে বিবেচনা করা হয়। সাম্প্রতিক জিনগত গবেষণাতেও আফ্রিকা ও এশিয়ার নাইফফিশগুলোর বিবর্তনীয় সম্পর্ক নিয়ে নতুন তথ্য পাওয়া গেছে। এসব গবেষণা ইঙ্গিত দেয়, এই মাছগুলোর পূর্বপুরুষদের বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ঘটেছিল ডাইনোসরদের শেষ দিকের যুগে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। কোনো মাছের বংশধারা কোটি বছরের পুরোনো হওয়া এবং আজকের নির্দিষ্ট প্রজাতিটি কোটি বছর ধরে একই থাকা এক বিষয় নয়।
আজকের চিতলকে ডাইনোসরের যুগের কোনো মাছের হুবহু জীবন্ত সংস্করণ বলা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। বহু প্রজন্ম ধরে জিনগত পরিবর্তন, প্রাকৃতিক নির্বাচন এবং পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর মধ্য দিয়ে বর্তমান প্রজাতির বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছে।
চিতলের বিবর্তন থেমে যায়নি
চিতাল বা চিতলজাতীয় মাছের বিভিন্ন প্রজাতি শনাক্ত করা নিয়েও বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো কিছু মতপার্থক্য রয়েছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এই গোষ্ঠীর মাছের শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় নতুন নতুন তথ্য সামনে এসেছে।
এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো ‘চিতালা লোপিস’। দীর্ঘ সময় ধরে ১৮৫১ সালের পর প্রজাতিটিকে আর দেখা যায়নি বলে এটিকে বিলুপ্ত মনে করা হয়েছিল। পরে ২০২৩ সালে ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপে মাছটির সন্ধান মেলে।
এ ধরনের ঘটনা দেখায়, প্রাচীন কোনো গোষ্ঠীর মধ্যে বিবর্তনীয় বৈচিত্র্য কতটা জটিল হতে পারে।
শুধু চেহারা দেখে ‘জীবন্ত জীবাশ্ম’ বলা যায় না
আধুনিক বিজ্ঞান কোনো প্রাণীকে শুধু তার বাহ্যিক চেহারা দেখে ‘জীবন্ত জীবাশ্ম’ হিসেবে চিহ্নিত করে না। গবেষকেরা হাড়ের গঠন, জীবাশ্মের বয়স, শারীরিক বৈশিষ্ট্য এবং জিনগত তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করেন।
অস্টিওগ্লোসোমরফা গোষ্ঠীর আরেক সদস্য প্যান্টোডন বুখহোলজি নিয়েও গবেষণায় দেখা গেছে, এর কিছু শারীরিক বৈশিষ্ট্য দীর্ঘ সময় ধরে খুব সামান্য পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে প্রাণীটির বিবর্তন পুরোপুরি থেমে গেছে।
বরং কোনো প্রজাতি দীর্ঘ সময় ধরে কিছু পুরোনো বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে পারে, একই সঙ্গে তার জিনগত ও অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তনও ঘটতে পারে।
তাই ‘জীবন্ত জীবাশ্ম’ শব্দটি অনেকটা বোঝানোর সুবিধার জন্য ব্যবহার করা হলেও এটি আধুনিক বিবর্তনবিজ্ঞানের কোনো নিখুঁত বৈজ্ঞানিক শ্রেণি নয়।
তাহলে চিতলকে কী বলা যায়?
ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা কিংবা মেঘনার পানিতে সাঁতার কাটা আজকের চিতল মাছের পূর্বপুরুষদের সঙ্গে ডাইনোসরের যুগের মাছের বিবর্তনীয় সম্পর্ক রয়েছে, এটি সত্য। কিন্তু বর্তমান চিতল সেই সময়কার মাছের অবিকল প্রতিরূপ নয়।
বরং বলা যায়, চিতল একটি দীর্ঘ ও প্রাচীন বিবর্তনীয় বংশধারার আধুনিক প্রতিনিধি। তার শরীরে সেই পুরোনো বংশধারার কিছু বৈশিষ্ট্যের ছাপ এখনো টিকে আছে। কিন্তু কোটি কোটি বছর ধরে একই রকম থাকা কোনো ‘অপরিবর্তিত মাছ’ হিসেবে তাকে দেখলে বিষয়টি অতিরঞ্জিত হয়ে যায়।
মানুষের চাপেই এখন বেশি ঝুঁকি
চিতলের বিবর্তনের ইতিহাস যতটা দীর্ঘ, বর্তমান সময়ে তার টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ ততটাই বাস্তব। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ জোটের মূল্যায়নে চিতলকে নিয়ার থ্রেটেন্ড বা প্রায়-বিপন্ন শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় লাল তালিকায় প্রজাতিটিকে বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশে নদী ও জলাভূমির পরিবেশ পরিবর্তন, বাঁধ ও অবকাঠামো নির্মাণ, পানিদূষণ এবং অতিরিক্ত মাছ শিকারের মতো নানা কারণে চিতলের আবাসস্থল ও সংখ্যা হুমকির মুখে পড়ছে।
অর্থাৎ যে মাছের বংশধারা কোটি কোটি বছরের প্রাকৃতিক পরিবর্তন পেরিয়ে টিকে এসেছে, সেই মাছের বর্তমান অস্তিত্ব হুমকিতে পড়ছে মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে।
সবশেষে বলা যায়, ‘চিতল কোটি কোটি বছরের পুরোনো মাছ’ কথাটির মধ্যে একটি সত্য লুকিয়ে আছে, তবে সেটি আক্ষরিক অর্থে নয়। চিতল নিজে কোটি বছর ধরে অপরিবর্তিত অবস্থায় টিকে থাকা কোনো প্রজাতি নয়। বরং তার বিবর্তনীয় বংশধারা অত্যন্ত প্রাচীন, আর সেই দীর্ঘ ইতিহাসের কিছু বৈশিষ্ট্য আজকের চিতলের শরীরেও দেখা যায়।
তাই চিতলকে ‘জীবন্ত জীবাশ্ম’ বলা হলে সেটিকে একটি জনপ্রিয় উপমা হিসেবে দেখা ভালো, আক্ষরিক বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে নয়।
প্রতি / এডি / শাআ



















