পাকা কাঁঠাল থেকে বিস্কুট! নতুন উদ্যোগে সাড়া ফেলেছেন ছাত্তার

প্রকাশঃ আগস্ট ৯, ২০২৬ সময়ঃ ১০:৩১ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১০:৩১ অপরাহ্ণ

গাজীপুরকে বলা হয় কাঁঠালের অন্যতম প্রধান উৎপাদন এলাকা। মৌসুম এলেই জেলার বিভিন্ন বাগান ও বাজারে বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল পাওয়া যায়। কিন্তু সংরক্ষণ ও বাজারজাতের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফল নষ্ট হয়ে যায়। কম দামের কারণে অনেক সময় বাগানেই পচে যায় পাকা কাঁঠাল।

এই অপচয় কমাতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছেন গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভার বৈরাগীরচালা এলাকার উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া। কাঁঠালকে নতুনভাবে প্রক্রিয়াজাত করে তিনি তৈরি করছেন বিস্কুট। ইতোমধ্যে পণ্যটি বাজারজাত করেও ক্রেতাদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পেয়েছেন তিনি।

ছাত্তারের উদ্যোগে স্থানীয় কাঁঠালচাষিদের মধ্যেও নতুন আশার সৃষ্টি হয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, কাঁঠাল থেকে বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য তৈরি ও বাজারজাত করা গেলে মৌসুমে ফলের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা সহজ হবে।

শ্রীপুরে কাঁঠালের বড় উৎপাদন

গাজীপুরে প্রতিবছর ৯ হাজার ১০০ হেক্টরেরও বেশি জমিতে কাঁঠাল উৎপাদন হয়। এর মধ্যে শ্রীপুরেই রয়েছে ৩ হাজার হেক্টরের বেশি জমি। উপজেলার এমন অনেক বাড়ি ও জমি রয়েছে, যেখানে কাঁঠালগাছ দেখা যায়।

শ্রীপুরের লাল ও উঁচু মাটির কারণে এখানকার কাঁঠালের স্বাদ ও মান ভালো বলে স্থানীয়দের দাবি। বৈশাখ থেকে ভাদ্র পর্যন্ত গাছে গাছে কাঁঠালের আধিক্য দেখা যায়। তবে সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে মৌসুমের একপর্যায়ে বড় অংশের ফল বিক্রি করা সম্ভব হয় না।

এই বাস্তবতা থেকেই কাঁঠালকে দীর্ঘদিন ব্যবহারযোগ্য খাদ্যপণ্যে রূপ দেওয়ার চিন্তা করেন আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া। প্রযুক্তি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের জ্ঞান কাজে লাগিয়ে তিনি কাঁঠালের রস ব্যবহার করে বিস্কুট উৎপাদন শুরু করেন।

তার দাবি, বিস্কুট তৈরিতে কৃত্রিম স্বাদ বা রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে না। বাজারে আসার পর থেকেই পণ্যটি নিয়ে অনলাইনে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। নতুন ধরনের এই বিস্কুটের স্বাদ নিতে অনেকেই অর্ডার করছেন।

যেভাবে তৈরি হচ্ছে কাঁঠালের বিস্কুট

কারখানায় প্রথমে পাকা কাঁঠাল থেকে কোয়া আলাদা করে নেওয়া হয়। এরপর সেগুলো ব্লেন্ড করে কাঁঠালের রস ও পাল্প প্রস্তুত করা হয়।

পরবর্তী ধাপে নির্ধারিত পরিমাণ কাঁঠালের রসের সঙ্গে ঘি, মাখন, দুধ, ময়দাসহ অন্যান্য উপকরণ মিশিয়ে যন্ত্রের মাধ্যমে ভালোভাবে মেশানো হয়। মিশ্রণটি নির্দিষ্ট ঘনত্বের মণ্ডে পরিণত হলে তা টেবিলে নিয়ে আকার অনুযায়ী কেটে বিস্কুট তৈরি করা হয়।

তৈরি বিস্কুটগুলো ট্রেতে সাজিয়ে চুল্লিতে দেওয়া হয়। একটি ট্রেতে ৩৬টি বিস্কুট রাখা যায়। একইভাবে একাধিক ট্রে একসঙ্গে চুল্লিতে ঢোকানো হয়। প্রায় ২৫ মিনিট তাপ দেওয়ার পর বিস্কুট বের করে ঠান্ডা করা হয়। এরপর প্যাকেটজাত করে বাজারে পাঠানো হয়।

একটি প্যাকেটে প্রায় ৮৫০ গ্রাম বিস্কুট রাখা হয়।

অনলাইনে বাড়ছে অর্ডার

কাঁঠালের বিস্কুটের চাহিদা শুধু স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। অনলাইনেও এর অর্ডার আসছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কুরিয়ারকর্মীরা।

তাদের ভাষ্য, গত দুই মাস ধরে নিয়মিত এই পণ্যের চালান সংগ্রহ করতে হচ্ছে। নতুন ক্রেতার পাশাপাশি আগে যারা কিনেছেন, তাদের অনেকে আবারও অর্ডার করছেন। কোনো কোনো দিনে একাধিকবারও পণ্য সংগ্রহের প্রয়োজন হচ্ছে।

ফলে নতুন এই খাদ্যপণ্যটি নিয়ে উদ্যোক্তার প্রত্যাশাও বাড়ছে।

আরও পণ্য তৈরির পরিকল্পনা

উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া জানান, বিদেশের কয়েকটি দেশে ভ্রমণের সময় কাঁঠাল থেকে বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য তৈরির প্রক্রিয়া দেখেছেন তিনি। সেখান থেকেই দেশে কাঁঠালভিত্তিক খাদ্যপণ্য তৈরির ধারণা পান।

তিনি বলেন, কাঁঠালের বিস্কুটের পর ভবিষ্যতে চিপসসহ আরও কয়েক ধরনের খাদ্যপণ্য তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে এসব পণ্য সহজলভ্য করতে প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাতকরণ পর্যায়ে সরকারি সহায়তা প্রত্যাশা করেন তিনি।

পুষ্টিগুণে সম্ভাবনাময় কাঁঠাল

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীদের মতে, কাঁঠালের অপচয় কমাতে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য তৈরির সুযোগ অনেক।

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কাঁঠালের বীজ, কাঁচা ফল এবং পাকা ফল শুকিয়ে গুঁড়া করার প্রযুক্তি নিয়ে ইতোমধ্যে কাজ হয়েছে। এসব উপাদানে প্রোটিন, খনিজ, আঁশ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে।

কাঁঠালের গুঁড়া নির্দিষ্ট অনুপাতে আটা বা ময়দার সঙ্গে মিশিয়ে বিস্কুট, কুকিজ, কেক, পাপড়, ক্যান্ডি ও আইসক্রিমসহ নানা ধরনের খাদ্যপণ্য তৈরি করা সম্ভব। পাকা কাঁঠালের পাল্প ব্যবহার করেও বিভিন্ন খাদ্যপণ্য উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের মধ্যে আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে একদিকে কাঁঠালের অপচয় কমবে, অন্যদিকে নতুন কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি দেশের খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তাতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ন্যায্যমূল্যের আশা চাষিদের

শ্রীপুরের কাঁঠালচাষিরাও এ উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তাদের অভিযোগ, মৌসুমে বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল উৎপাদন হলেও সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেক ফল শেষ পর্যন্ত নষ্ট হয়।

চাষিদের মতে, কাঁঠাল থেকে বিস্কুট, চিপসসহ বিভিন্ন পণ্য বাণিজ্যিকভাবে তৈরি করা গেলে মৌসুমি ফলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সারা বছর বাজার ধরে রাখা সম্ভব হবে। এতে উৎপাদনকারীরা কাঁঠালের ভালো দাম পাওয়ার পাশাপাশি নষ্ট হওয়ার পরিমাণও কমাতে পারবেন।

শ্রীপুরের এই উদ্যোগ তাই শুধু নতুন ধরনের একটি বিস্কুট বাজারে আনার ঘটনা নয়। সংশ্লিষ্টদের আশা, কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাত করে বহুমুখী খাদ্যপণ্য তৈরির মাধ্যমে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই ফলের অপচয় কমানোর পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

August 2026
SSMTWTF
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031 
20G