অ্যান্টার্কটিকায় গলছে বরফ, ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে বাংলাদেশ
বিশ্বের শীতলতম অঞ্চলগুলোতে দ্রুত বদলে যাচ্ছে প্রকৃতির চিত্র। তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাবে অ্যান্টার্কটিকা, গ্রিনল্যান্ডসহ বিভিন্ন অঞ্চলের বরফ গলে সমুদ্রে পানির পরিমাণ বাড়ছে। এর প্রভাব এখনই পুরোপুরি দৃশ্যমান না হলেও দীর্ঘমেয়াদে নিচু উপকূলীয় দেশগুলোর জন্য এটি বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, অ্যান্টার্কটিকার গুরুত্বপূর্ণ হিমবাহগুলো দ্রুত ক্ষয় হতে থাকলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশ, মালদ্বীপ ও চীনের সাংহাইয়ের মতো নিচু উপকূলীয় অঞ্চলেও।
‘ডুমসডে গ্লেসিয়ার’ নিয়ে উদ্বেগ
অ্যান্টার্কটিকার থওয়েটস হিমবাহকে অনেক সময় ‘ডুমসডে গ্লেসিয়ার’ বলা হয়। বিশাল এই হিমবাহের দ্রুত ক্ষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
থওয়েটস হিমবাহের বড় অংশ ভেঙে সমুদ্রে চলে গেলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব শুধু অ্যান্টার্কটিকার আশপাশে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশ্বের বিভিন্ন নিচু উপকূলীয় শহর ও অঞ্চলেও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়তে পারে।
যুক্তরাজ্যের বেশ কিছু নিচু এলাকা, পাশাপাশি বাংলাদেশ, মালদ্বীপ ও সাংহাইয়ের মতো অঞ্চল সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বিশেষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
গলে যাচ্ছে বিশ্বের পাহাড়ি হিমবাহও
গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকার বিশাল বরফস্তর বাদ দিলে পৃথিবীর বিভিন্ন পর্বতমালায় বিপুল পরিমাণ বরফ জমা রয়েছে। আল্পস, আন্দিজ ও হিমালয়ের মতো পর্বতশ্রেণির হিমবাহও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে।
তাপমাত্রা বাড়ার কারণে বরফ গলার হার বেড়ে গেলেও সেই ঘাটতি পূরণ করার মতো পর্যাপ্ত তুষারপাত হচ্ছে না। ফলে বছরের পর বছর এসব হিমবাহের আয়তন কমছে।
গবেষণাভিত্তিক বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকার বরফস্তর ব্যাপকভাবে গলে গেলে বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কয়েক দশক নয়, দীর্ঘমেয়াদে ফুটের হিসাবে বাড়তে পারে। এতে উপকূলীয় জনপদ, দ্বীপাঞ্চল ও নিচু শহরগুলোতে প্লাবনের ঝুঁকি বাড়বে।
বরফের ভবিষ্যৎ হিসাবেও প্রযুক্তির ব্যবহার
হিমবাহ কত দ্রুত গলছে এবং ভবিষ্যতে কী পরিমাণ বরফ অবশিষ্ট থাকবে, তা নির্ণয়ে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। বিভিন্ন অঞ্চলের হিমবাহের তথ্য বিশ্লেষণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মডেলও তৈরি করা হয়েছে।
এ ধরনের মডেল ব্যবহার করে বরফের আয়তন ও পরিবর্তনের গতিপ্রকৃতি আগের তুলনায় আরও নির্ভুলভাবে অনুমান করার চেষ্টা করছেন গবেষকেরা। জলবায়ু পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ প্রভাব বোঝার পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর জন্য আগাম পরিকল্পনা তৈরিতেও এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির গতি বাড়ছে
সমুদ্র ও বরফস্তর জলবায়ুর পরিবর্তনে ধীরে প্রতিক্রিয়া দেখায়। ফলে এখনকার তাপমাত্রা বৃদ্ধি ভবিষ্যতে আরও দীর্ঘ সময় ধরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
পর্যবেক্ষণ তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দশকে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির গতি বেড়েছে। ১৯৯৯ সালের পর থেকে গড়ে বছরে প্রায় ৩ দশমিক ৬৪ মিলিমিটার করে সমুদ্রপৃষ্ঠ বাড়লেও পরবর্তী সময়ে এই হার আরও বেড়ে প্রায় ৪ দশমিক ১ মিলিমিটারে পৌঁছানোর তথ্য পাওয়া গেছে।
এই বৃদ্ধির হার সামান্য মনে হলেও কয়েক দশক বা শতাব্দীর হিসাবে এর প্রভাব বড় হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকা তুলনামূলক নিচু হওয়ায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি দেশের জন্য বিশেষ উদ্বেগের বিষয়। সমুদ্রের পানি বাড়লে উপকূলীয় এলাকায় জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা, নদীভাঙন ও জলাবদ্ধতার মতো সমস্যার তীব্রতা বাড়তে পারে।
এর প্রভাব শুধু বসতবাড়ি বা জনবসতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কৃষিজমি, পানির উৎস, অবকাঠামো এবং উপকূলীয় মানুষের জীবিকাও দীর্ঘমেয়াদে চাপে পড়তে পারে।
তাই অ্যান্টার্কটিকা বা পৃথিবীর অন্য প্রান্তের বরফ গলার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য দূরের কোনো ঘটনা নয়। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব ধীরে ধীরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশের উপকূলেও এসে পৌঁছাতে পারে।
প্রতি / এডি / শাআ



















