হজম ভালো রাখা থেকে মুখগহ্বরের যত্ন, তেজপাতার যত উপকারিতা

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬ সময়ঃ ১০:০১ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১০:০১ অপরাহ্ণ

রান্নাঘরে তেজপাতার ব্যবহার বেশ পুরোনো। পোলাও, বিরিয়ানি, খিচুড়ি, মাংস, ডাল কিংবা বিভিন্ন তরকারিতে খাবারের ঘ্রাণ ও স্বাদ বাড়াতে এই মসলা ব্যবহার করা হয়। রান্না শেষ হলে অনেক সময় তেজপাতা তুলে ফেলে দেওয়া হয়। ফলে মসলাটি খাবারে থাকলেও সরাসরি খাওয়ার অংশ হয়ে ওঠে না।

তবে রান্নায় অল্প পরিমাণে ব্যবহৃত এই পাতায় রয়েছে বেশ কিছু প্রাকৃতিক উপাদান, যেগুলোর সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত ভূমিকা নিয়ে গবেষণা হয়েছে। তেজপাতা মূলত লরাস নোবিলিস গাছের শুকনো পাতা। এর পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন দিক সম্পর্কে পুষ্টিবিদ আঞ্জুমান আরা শিমুলের পরামর্শ তুলে ধরা হলো।

তেজপাতায় কী ধরনের পুষ্টি রয়েছে?

তেজপাতা সাধারণত অল্প পরিমাণে রান্নায় দেওয়া হয়। তাই এটি দৈনিক খাদ্যতালিকায় বড় কোনো পুষ্টির উৎস হিসেবে বিবেচিত নয়। তবে ১০০ গ্রাম শুকনো তেজপাতায় আনুমানিক ৩১৩ কিলোক্যালরি শক্তি, ৭৪ দশমিক ৯ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট, ৭ দশমিক ৬ গ্রাম প্রোটিন, ২৬ দশমিক ৩ গ্রাম খাদ্যআঁশ এবং ৮ দশমিক ৩ গ্রাম ফ্যাট পাওয়া যায়।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের উৎস

তেজপাতায় পলিফেনল ও ফ্ল্যাভোনয়েডের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। এসব উপাদান শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারে।

অক্সিডেটিভ স্ট্রেস দীর্ঘমেয়াদে শরীরের বিভিন্ন সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও প্রদাহজনিত কিছু সমস্যার ঝুঁকিও রয়েছে। তবে তেজপাতা খাওয়াকে শরীরের ‘ডিটক্স’ করার নির্দিষ্ট উপায় হিসেবে দেখার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।

রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সম্ভাব্য ভূমিকা

কিছু গবেষণায় তেজপাতার ব্যবহার রক্তে শর্করা ও রক্তের চর্বির মাত্রার ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বিশেষ করে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে এ নিয়ে গবেষণা হয়েছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে শুধু তেজপাতা ব্যবহার করলেই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। ডায়াবেটিসের চিকিৎসা বা ওষুধের বিকল্প হিসেবে তেজপাতাকে ব্যবহার করা উচিত নয়।

হজমের ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে

তেজপাতায় থাকা কিছু প্রাকৃতিক উপাদান হজমপ্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে পারে। খাবার থেকে পুষ্টি শোষণের ক্ষেত্রেও এর সম্ভাব্য ভূমিকা রয়েছে।

এ ছাড়া পেট ফাঁপা, অস্বস্তি বা হজমের কিছু সমস্যায় তেজপাতা উপকারী হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। তবে কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া বা ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোমের চিকিৎসা হিসেবে তেজপাতার কার্যকারিতা নিশ্চিত করার জন্য আরও শক্তিশালী গবেষণা প্রয়োজন।

প্রদাহ কমাতে পারে

তেজপাতায় ইউজেনল ও পার্থেনোলাইডের মতো উদ্ভিজ্জ যৌগ পাওয়া যায়। এসব উপাদানের প্রদাহবিরোধী বৈশিষ্ট্য রয়েছে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

ফলে শরীরে প্রদাহ কমাতে তেজপাতার কিছু ভূমিকা থাকতে পারে। তবে কোনো প্রদাহজনিত রোগ বা দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার চিকিৎসা হিসেবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এর ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়।

হৃদযন্ত্রের জন্য সম্ভাব্য উপকার

তেজপাতার কিছু উপাদান রক্তের কোলেস্টেরল ও রক্তচাপের মতো হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলোর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এতে থাকা পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামও শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে তেজপাতা হৃদরোগ প্রতিরোধ করে বা উচ্চ রক্তচাপ কমিয়ে দেয়, এমন নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত মানবভিত্তিক গবেষণা নেই।

সর্দি-কাশিতে কতটা উপকারী?

তেজপাতার সুগন্ধি তেল বা বাষ্প শ্বাস নেওয়ার ক্ষেত্রে নাক বন্ধভাব, সর্দি বা কাশিতে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে বলে প্রচলিত ধারণা রয়েছে। তবে এ ধরনের ব্যবহারের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার জন্য আরও বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন।

জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকারিতা

তেজপাতার এসেনশিয়াল অয়েলে থাকা কিছু যৌগ পরীক্ষাগারে নির্দিষ্ট ধরনের ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের বিরুদ্ধে কার্যকর হওয়ার প্রমাণ দেখিয়েছে। তবে পরীক্ষাগারে পাওয়া এই ফলাফলকে সরাসরি মানুষের চিকিৎসায় কার্যকর বলে ধরে নেওয়া যায় না।

মুখের স্বাস্থ্যেও ভূমিকা থাকতে পারে

তেজপাতার কিছু উপাদান মুখের দুর্গন্ধ, দাঁতের ক্ষয় ও মাড়ির সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে। এ কারণে মুখগহ্বরের স্বাস্থ্য ভালো রাখার ক্ষেত্রে এর সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

তবে দাঁত ও মাড়ির সমস্যায় নিয়মিত ব্রাশ করা, মুখ পরিষ্কার রাখা এবং প্রয়োজন হলে দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।

রান্নায় ব্যবহৃত তেজপাতা কি খাওয়া নিরাপদ?

সাধারণত রান্নায় এক-দুটি তেজপাতা ব্যবহার করা নিরাপদ বলে ধরা হয়। তবে শুকনো তেজপাতা শক্ত হওয়ায় এটি ভালোভাবে চিবিয়ে খাওয়া কঠিন। বড় টুকরো গিলে ফেললে গলায় আটকে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকতে পারে।

তাই খাবার পরিবেশনের আগে তেজপাতা তুলে ফেলা নিরাপদ অভ্যাস।

যাদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন

তেজপাতায় অ্যালার্জি থাকলে এটি ব্যবহার করা উচিত নয়। অন্তঃসত্ত্বা নারীদের অতিরিক্ত পরিমাণে তেজপাতার নির্যাস বা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

ডায়াবেটিসের ওষুধ ব্যবহারকারীরা তেজপাতার সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন। একইভাবে রক্ত পাতলা করার ওষুধ সেবনকারীদেরও অতিরিক্ত ভেষজ উপাদান বা তেজপাতার নির্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সবশেষে মনে রাখা দরকার, রান্নায় স্বাভাবিক পরিমাণে তেজপাতা ব্যবহার খাবারে ঘ্রাণ ও স্বাদ বাড়াতে পারে। এর সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগুণ থাকলেও কোনো রোগের চিকিৎসা বা ওষুধের বিকল্প হিসেবে তেজপাতাকে ব্যবহার করা উচিত নয়।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

September 2026
SSMTWTF
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930 
20G