চাঁদে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে কেন মরিয়া যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন?

চাঁদের মাটিতে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন। মহাকাশে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর পাশাপাশি চাঁদে স্থায়ী গবেষণাকেন্দ্র ও মানুষের বসবাসের উপযোগী ঘাঁটি তৈরিই দেশগুলোর অন্যতম লক্ষ্য। এসব ঘাঁটিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং চাঁদের মাটির নিচে জমে থাকা বরফ উত্তোলনের কাজে ব্যবহার করা হবে পারমাণবিক শক্তি। তবে চুল্লি মহাকাশে পাঠানো, চাঁদে নামানো ও চালু করার ক্ষেত্রে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিজ্ঞানীরা।
গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ২০৩০ সালের শেষ নাগাদ চাঁদে একটি পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের পরিকল্পনা প্রকাশ করে। অন্যদিকে, রাশিয়া ও চীন যৌথভাবে ২০৩৬ সালের মধ্যে চাঁদে একই ধরনের বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। মহাকাশে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ও মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে দেশ দুটি এ উদ্যোগ নিয়েছে।
চাঁদের মেরু অঞ্চলের কিছু গভীর গর্তে দীর্ঘদিন ধরে বরফ জমে রয়েছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এসব বরফ থেকে পানীয় জল, শ্বাস নেওয়ার উপযোগী অক্সিজেন এবং রকেটের জ্বালানি তৈরির উপাদান পাওয়া সম্ভব। ভবিষ্যতে চাঁদে মানুষের বসতি ও গবেষণাকেন্দ্র গড়ে উঠলে এসব সম্পদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে বরফ উত্তোলন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ঘাঁটির বিভিন্ন যন্ত্রপাতি চালাতে প্রয়োজন হবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। এ প্রয়োজন মেটাতেই পারমাণবিক চুল্লির দিকে ঝুঁকছে দেশগুলো।
কোন দেশের পারমাণবিক চুল্লির পরিকল্পনা কেমন
যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পিত পারমাণবিক চুল্লিটির নাম ‘লুনার রিঅ্যাক্টর-১’। এটি থেকে ২০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নাসার পরিকল্পনা অনুযায়ী, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই চুল্লিটি টানা পাঁচ বছর কাজ করতে পারবে।
আকারে ছোট রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে চুল্লিটি। এর ওজন ৬ হাজার কেজির নিচে রাখার লক্ষ্য রয়েছে। একটি রকেটের নির্দিষ্ট অংশে এটি বহন করা সম্ভব হবে। ওই অংশের দৈর্ঘ্য হবে ৩ দশমিক ৭ মিটার এবং প্রস্থ ৫ দশমিক ৫ মিটার।
অন্যদিকে, রাশিয়া তৈরি করছে ‘সেলেনা’ নামের একটি পারমাণবিক চুল্লি। এটি থেকে ১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। একবার স্থাপন করার পর কোনো ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই প্রায় ১০ বছর চালানোর লক্ষ্য রয়েছে। ২০৩৬ সালের দিকে চীন নেতৃত্বাধীন চাঁদের গবেষণাকেন্দ্রে বিদ্যুৎ সরবরাহের উপযোগী করে এটি প্রস্তুত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নাসার প্রস্তাবিত চুল্লির তুলনায় সেলেনার ওজন অনেক কম হবে। এর আনুমানিক ওজন ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ কেজি। কম ওজনের কারণে চাঁদের পৃষ্ঠে এটি নামানো তুলনামূলক সহজ হবে। অবতরণের সময় ধাক্কা সামলানোর ক্ষেত্রেও সুবিধা পাওয়া যাবে।
তবে মহাকাশে পারমাণবিক চুল্লি ব্যবহারের ধারণা নতুন নয়। এর আগেও পৃথিবীর কক্ষপথে নজরদারির কাজে ব্যবহৃত কিছু গুপ্তচর উপগ্রহে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ছোট পারমাণবিক চুল্লি পাঠানো হয়েছিল। এসব চুল্লির ওজন ছিল প্রায় ১ হাজার কেজি। ইউরেনিয়াম পরমাণুর বিভাজন থেকে উৎপন্ন তাপ কাজে লাগিয়ে সেগুলো ৩ থেকে ৫ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করত। বর্তমানে ওই চুল্লিগুলো আর কার্যকর নেই।
যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অন্য কোনো দেশ এখন পর্যন্ত মহাকাশে পারমাণবিক চুল্লি পাঠায়নি। গত সাত দশকে মহাকাশে ব্যবহারের উপযোগী পারমাণবিক প্রযুক্তি উন্নয়নে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার বা ২ হাজার কোটি ডলার ব্যয় করেছে দেশটি। এত বিপুল বিনিয়োগের পরও ১৯৬৫ সালের একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র সফলভাবে মহাকাশে পারমাণবিক চুল্লি উৎক্ষেপণ করতে পারেনি।
১৯৬৫ সালের ওই পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য ছিল পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে উপগ্রহে বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাবনা যাচাই করা। শুরুতে পরীক্ষাটি সফল হয়েছিল। কিন্তু উপগ্রহের পারমাণবিক ব্যবস্থার বাইরের একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ৪৩ দিন পর সেটি বন্ধ করে দিতে হয়। উপগ্রহটি এখনো মহাকাশে অবস্থান করছে।
এ ছাড়া বাজেটের অগ্রাধিকার পরিবর্তন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক মহাকাশ প্রকল্পগুলো অতীতে একাধিকবার বাধার মুখে পড়েছে।
যেভাবে চাঁদের মাটিতে স্থাপন করা হবে চুল্লি
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে পৃথিবীতেই তৈরি করা হবে পারমাণবিক চুল্লিগুলো। এরপর রোবটচালিত মহাকাশযানের মাধ্যমে সেগুলো চাঁদে পাঠানো হবে। মহাকাশযানটি রকেট ইঞ্জিনের সাহায্যে নিয়ন্ত্রিত গতিতে চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণ করবে। অবতরণের সময় যেন অতিরিক্ত ধাক্কা না লাগে, সে বিষয়েও বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পরিকল্পনা অনুযায়ী, চাঁদে পৌঁছানোর আগে কোনো চুল্লিই চালু করা হবে না। এর ফলে পৃথিবী থেকে চাঁদে যাত্রার পুরো সময় তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি কম রাখা সম্ভব হবে।
চাঁদে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছানোর পর চুল্লিগুলো স্থাপন ও চালু করা হবে। দীর্ঘ সময় ধরে যাতে কোনো ধরনের মেরামত ছাড়াই এগুলো কাজ করতে পারে, সেভাবেই প্রযুক্তি তৈরি করা হচ্ছে। পরে এসব চুল্লি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ চাঁদের গবেষণাকেন্দ্র, বসতি এবং খননকাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিতে সরবরাহ করা হবে।
চাঁদে পারমাণবিক বিদ্যুতের প্রয়োজন কেন
যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার পরিকল্পনায় চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চল বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ, ওই এলাকার কিছু গভীর গর্তে বরফের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব স্থানে দীর্ঘ সময় ধরে সূর্যের আলো পৌঁছায় না। ফলে সেখানে জমে থাকা বরফ লাখ লাখ বছর ধরে সংরক্ষিত থাকতে পারে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা।
এই বরফকে ভবিষ্যৎ চন্দ্র অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বরফ গলিয়ে পানি সংগ্রহ করা যাবে। সেই পানি থেকে অক্সিজেন তৈরি করে নভোচারীদের শ্বাস নেওয়ার কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। পাশাপাশি পানি থেকে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন আলাদা করে রকেটের জ্বালানি তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে।
শুধু পানি সংগ্রহ নয়, চাঁদের মাটিতে খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনেও আগ্রহ রয়েছে বিভিন্ন পক্ষের। প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কও চাঁদ থেকে বিভিন্ন খনিজ পদার্থ সংগ্রহের বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন। তাঁর পরিকল্পনায় অ্যালুমিনিয়াম, টাইটানিয়াম ও সিলিকনের মতো উপাদান রয়েছে। এসব উপাদান ব্যবহার করে মহাকাশে উপগ্রহ তৈরির পরিকল্পনার কথাও সামনে এসেছে।
তবে চাঁদে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য শুধু সৌর প্যানেলের ওপর নির্ভর করা কঠিন। কারণ, চাঁদের কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় টানা প্রায় দুই সপ্তাহ সূর্যের আলো থাকে না। ফলে এ সময় সৌর প্যানেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে না। দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করতে প্রয়োজন হবে বড় ব্যাটারি ও বিকল্প ব্যবস্থা।
যুক্তরাজ্যের ব্যাংগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ফিউচারস ইনস্টিটিউটের পরিচালক সাইমন মিডলবার্গ সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে বলেন, চাঁদের গবেষণাকেন্দ্রে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে সৌরশক্তির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ব্যাটারি কিংবা ডিজেলচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থা ব্যবহার করাও ব্যয়বহুল হবে। কারণ, এসব সরঞ্জাম পৃথিবী থেকে মহাকাশযানে করে চাঁদে নিয়ে যেতে হবে।
মিডলবার্গের মতে, এসব সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় পারমাণবিক শক্তি একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। তবে এর ব্যবহার হতে হবে যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করে। তাঁর ধারণা, চাঁদের বরফ উত্তোলন এবং গবেষণাকেন্দ্রের প্রয়োজন মেটাতে একই সঙ্গে তিন থেকে চারটি পারমাণবিক চুল্লি চালানোর প্রয়োজন হতে পারে।
চাঁদে চুল্লি স্থাপনের প্রতিযোগিতায় কেন তিন দেশ
চাঁদে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনার পেছনে শুধু বৈজ্ঞানিক গবেষণা নয়, ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। মহাকাশে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করা এবং ভবিষ্যতে চাঁদের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ ধরে রাখাই এ প্রতিযোগিতার অন্যতম উদ্দেশ্য।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন। এতে ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে পাঠানোর উপযোগী পারমাণবিক চুল্লি তৈরির জন্য নাসাকে নির্দেশ দেওয়া হয়। একই ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে চীন ও রাশিয়াও। দেশ দুটির নেতৃত্ব চাঁদে যৌথ গবেষণাকেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে।
চলতি বছরের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি বলেন, চাঁদে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে। তাঁর বক্তব্যে মহাকাশ অভিযানে দুই দেশের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চুল্লি তৈরি করাই সবচেয়ে কঠিন কাজ নয় বলে মনে করেন বিজ্ঞানী সাইমন মিডলবার্গ। তাঁর মতে, বড় চ্যালেঞ্জ হবে চুল্লি নিরাপদে চাঁদে পৌঁছানো, সেখানে অবতরণ করানো এবং সঠিকভাবে স্থাপন করা।
তিনি মনে করেন, শুধু পারমাণবিক প্রযুক্তি তৈরি করলেই হবে না। এর জন্য প্রয়োজন হবে উৎক্ষেপণের অনুমতি, উপযুক্ত রকেট এবং চাঁদের পৃষ্ঠে নিরাপদে অবতরণের ব্যবস্থা। পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে চুল্লিগুলো যেন কোনো ঝুঁকি ছাড়াই কাজ করতে পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
এ প্রতিযোগিতার সঙ্গে মহাকাশে সামরিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়টিও জড়িয়ে রয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র জানায়, তারা মহাকাশের কক্ষপথে অস্ত্র মোতায়েন করেছে। দেশটির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, মার্কিন বাহিনীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তবে কী ধরনের অস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এগুলো সরাসরি হামলা চালানোর অস্ত্র না-ও হতে পারে। বরং মহাকাশে যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত বা অচল করে দেওয়ার প্রযুক্তি হতে পারে।
এ ধরনের উদ্যোগের ফলে মহাকাশের সামরিক ব্যবহার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জিপিএস, যোগাযোগ এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত উপগ্রহগুলো হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনে কী ধরনের ঝুঁকি রয়েছে
মহাকাশে পারমাণবিক চুল্লি পাঠানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হলো তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা। তবে উৎক্ষেপণের সময় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই বড় ধরনের বিপর্যয় হবে, এমনটা মনে করেন না বিজ্ঞানী সাইমন মিডলবার্গ।
আলজাজিরাকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি ব্যাখ্যা করেন, চুল্লি চালু করার আগে এতে ব্যবহৃত ইউরেনিয়ামের তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা তুলনামূলক কম থাকে। কিন্তু চুল্লি চালু হওয়ার পর পারমাণবিক বিক্রিয়ার কারণে পরিস্থিতি বদলে যায়। তখন দুর্ঘটনা ঘটলে ঝুঁকিও অনেক বেশি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, চালু থাকা কোনো পারমাণবিক চুল্লি দুর্ঘটনার কারণে পৃথিবীতে ফিরে এসে পড়লে তা বড় ধরনের তেজস্ক্রিয় দূষণের কারণ হতে পারে।
এর একটি উদাহরণ ১৯৭৮ সালের সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘কসমস ৯৫৪’ উপগ্রহ। এতে একটি পারমাণবিক চুল্লি ছিল। উপগ্রহটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ভেঙে পড়ার পর কানাডার উত্তরাঞ্চলের প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার ৩০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ে। পরে উপগ্রহের ধ্বংসাবশেষ ও তেজস্ক্রিয় ক্ষুদ্র কণা সংগ্রহ করতে ব্যয়বহুল সামরিক অভিযান চালাতে হয়।
তবে মিডলবার্গের ধারণা, চাঁদে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে দূষণের বিস্তৃতি তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকবে। কারণ, পৃথিবীর মতো সেখানে বিস্তৃত জনবসতি নেই। তারপরও চাঁদের ভবিষ্যৎ গবেষণাকেন্দ্র ও মানুষের বসতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
চাঁদের মালিকানা নিয়ে আন্তর্জাতিক আইন কী বলছে
চাঁদে কোনো দেশ পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করলেই সেটির মালিকানা বা চাঁদের নির্দিষ্ট এলাকার ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, চাঁদ কোনো একক দেশের সম্পত্তি নয়।
১৯৬৭ সালের আউটার স্পেস ট্রিটি বা মহাকাশ চুক্তিতে বলা হয়েছে, কোনো দেশ চাঁদ কিংবা এর কোনো অংশের ওপর সার্বভৌমত্ব দাবি করতে পারবে না। তবে কোনো দেশ মহাকাশে যে যন্ত্রপাতি বা সরঞ্জাম পাঠাবে, সেগুলোর মালিকানা ওই দেশেরই থাকবে। এ চুক্তিতে মহাকাশে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞাও নেই।
লুনার পলিসি প্ল্যাটফর্ম নামের একটি অলাভজনক সংস্থার পরিচালক আন্তোনিনো সালমেরি আলজাজিরাকে বলেন, আন্তর্জাতিক চুক্তির শর্ত মেনে চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করা আইনগতভাবে সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে মহাকাশকে শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহার এবং ক্ষতিকর দূষণ এড়িয়ে চলার মতো নীতিগুলো অনুসরণ করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনাভিত্তিক প্ল্যানেটারি সায়েন্স ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী নরবার্ট শর্গোফারের মতে, মহাকাশ চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর চাঁদের পৃষ্ঠে শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে খননকাজ পরিচালনার অধিকার রয়েছে।
তবে বাস্তবে চাঁদের সম্পদ ব্যবহার নিয়ে প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে। যে দেশ আগে চাঁদের গুরুত্বপূর্ণ বরফের উৎসে পৌঁছাবে, তারা ওই এলাকাকে ঘিরে নিরাপত্তা অঞ্চল ঘোষণা করতে পারে। এতে আইনগতভাবে ওই এলাকার মালিকানা প্রতিষ্ঠিত না হলেও অন্য দেশের প্রবেশে বাধা তৈরি হতে পারে।
সালমেরির মতে, কোনো দেশ নিরাপত্তা অঞ্চল ঘোষণা করলেই সেখানে তাদের ভূখণ্ডগত অধিকার তৈরি হবে না। তবে ওই এলাকায় পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করা হলে তেজস্ক্রিয়তার সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণে অন্য দেশগুলো সেখানে প্রবেশে অনাগ্রহী হতে পারে।
গত মাসে প্রকাশিত লুনার পলিসি প্ল্যাটফর্মের একটি প্রতিবেদনে চাঁদে দুর্ঘটনার দায়বদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহাকাশবিষয়ক বিদ্যমান আন্তর্জাতিক আইন ও দায়বদ্ধতার কাঠামো অন্য কোনো মহাজাগতিক বস্তুর ওপর দীর্ঘ সময় ধরে ঝুঁকিপূর্ণ প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।
সব মিলিয়ে চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের উদ্যোগ শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মহাকাশে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ, ভবিষ্যৎ বসতি স্থাপন এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারের প্রশ্ন। ফলে আগামী কয়েক বছরে চাঁদে পারমাণবিক প্রযুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের প্রতিযোগিতা আরও বাড়তে পারে।
প্রতি / এডি / শাআ



















