শক্তিশালী এল নিনোর পর আসছে লা নিনা, বদলে যেতে পারে বৈশ্বিক জলবায়ু
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অস্বাভাবিক আবহাওয়ার অন্যতম আলোচিত কারণ হয়ে উঠেছে এল নিনো। এর প্রভাবে কোথাও বাড়ছে তাপমাত্রা, কোথাও দেখা দিচ্ছে অতিবৃষ্টি, আবার কোনো অঞ্চলে তৈরি হচ্ছে ঝড়ের অনুকূল পরিবেশ। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, চলমান এল নিনোর প্রভাব এখনো সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এর প্রভাব ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
তবে এই উষ্ণ পরিস্থিতি একসময় দুর্বল হয়ে পড়লে প্রশান্ত মহাসাগরে নতুন পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। সাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কমে গেলে তৈরি হয় লা নিনা। এটি এল নিনোর বিপরীত জলবায়ু পরিস্থিতি। এমন পরিবর্তন ঘটলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও ঝড়ের ধরনেও পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এল নিনোর পরপরই লা নিনা শুরু হবে, এমন নিশ্চয়তা এখনো নেই।
এল নিনো ও লা নিনা আসলে কী?
এল নিনো ও লা নিনা একই প্রাকৃতিক জলবায়ু ব্যবস্থার দুটি বিপরীত অবস্থা। এই ব্যবস্থার নাম ‘এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশন’ বা সংক্ষেপে এনসো (ENSO)। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসন (এনওএএ) এই জলবায়ু চক্রকে তিনটি অবস্থায় ভাগ করেছে। এগুলো হলো এল নিনো, লা নিনা এবং নিরপেক্ষ অবস্থা।
সাধারণত কয়েক বছর পরপর প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা ও বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনের মাধ্যমে এই চক্রের বিভিন্ন পর্যায় দেখা যায়। স্প্যানিশ ভাষায় এল নিনো শব্দের অর্থ ‘ছোট ছেলে’ এবং লা নিনা অর্থ ‘ছোট মেয়ে’।
এই দুই পরিস্থিতির উৎপত্তি নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরে হলেও এর প্রভাব সীমাবদ্ধ থাকে না ওই অঞ্চলে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আবহাওয়ার ওপর এর প্রভাব পড়ে। কোথাও বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যায়, কোথাও অতিবৃষ্টি দেখা দেয়। আবার কোনো কোনো অঞ্চলে খরা কিংবা ঝড়ের প্রবণতাও পরিবর্তিত হতে পারে।
চলতি বছরের শক্তিশালী এল নিনোর কারণে এর পরবর্তী পর্যায়ে কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা বিশেষভাবে নজর রাখছেন।
যেভাবে আবহাওয়ায় পরিবর্তন আনে এল নিনো ও লা নিনা
এল নিনো হলো এনসো ব্যবস্থার উষ্ণ পর্যায়। এ সময় প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া পূর্বমুখী বাণিজ্য বায়ু দুর্বল হয়ে যায়। এর ফলে নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে উষ্ণ পানির পরিমাণ বেড়ে যায়। সমুদ্রের তাপমাত্রার এই পরিবর্তন বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক প্রবাহেও প্রভাব ফেলে। এর ফল হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আবহাওয়ার পরিচিত ধরন বদলে যেতে পারে।
অন্যদিকে, লা নিনা হলো এর বিপরীত অবস্থা। এ সময় বাণিজ্য বায়ু স্বাভাবিকের তুলনায় শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ফলে সমুদ্রের উষ্ণ পানি পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে, অর্থাৎ এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার কাছাকাছি সরে যায়। একই সময়ে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের কাছাকাছি সমুদ্রের গভীর স্তর থেকে ঠান্ডা ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানি ওপরে উঠে আসে।
সমুদ্রের পানির এই তাপমাত্রাগত পরিবর্তন বায়ুমণ্ডলের ওপর প্রভাব ফেলে। ফলে বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও ঝড়ের পরিস্থিতিতে ভিন্নতা দেখা দিতে পারে।
এল নিনোর পর কি নিশ্চিতভাবেই আসে লা নিনা?
এল নিনো ও লা নিনা একই জলবায়ু চক্রের অংশ হলেও একটি শেষ হওয়ার পর অন্যটি শুরু হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। কখনো এল নিনোর পর লা নিনা দেখা দেয়, আবার কখনো মাঝখানে নিরপেক্ষ পরিস্থিতি বিরাজ করে। এমনকি একই পর্যায় কয়েক বছর ধরে চলার ঘটনাও রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, পরপর কয়েক বছর লা নিনার প্রভাব বজায় থাকতে পারে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, লা নিনার তুলনায় এল নিনোর ঘটনা বেশি দেখা যায়। তবে দুটি পরিস্থিতির মধ্যে পরিবর্তনের সময়কাল সব সময় এক রকম হয় না।
ডব্লিউএমওর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ দিকে প্রশান্ত মহাসাগরে দুর্বল লা নিনা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে সেটি দুর্বল হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে এবং বছরের মাঝামাঝি শক্তিশালী এল নিনো গড়ে ওঠে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসনের আবহাওয়াবিদ নাথানিয়েল জনসন ২০২৬ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত একটি পরীক্ষামূলক পূর্বাভাসে জানিয়েছেন, বর্তমান এল নিনো ২০২৭ সালের বসন্ত অথবা গ্রীষ্মের শুরুর দিকে নিরপেক্ষ এনসো পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে পারে। তবে পূর্বাভাসের সময় যত দূরে যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তাও তত বাড়বে।
সব মিলিয়ে বর্তমান এল নিনো দুর্বল হওয়ার পর প্রশান্ত মহাসাগরে লা নিনা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিজ্ঞানীরা। তবে এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় আসেনি। সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা, বায়ুপ্রবাহ ও বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
প্রতি / এডি / শাআ



















