এবার ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ট্রেনে যেতে সময় লাগবে সাড়ে তিন ঘণ্টা!
বর্তমানে সড়কপথে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে দূরত্ব প্রায় ২৪৮ কিলোমিটার হলেও রেলপথে ট্রেনকে অতিক্রম করতে হয় প্রায় ৩২০ কিলোমিটার। ফলে দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত এই রুটে ট্রেনে ভ্রমণে সাধারণত পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা সময় লাগে। দীর্ঘদিনের আলোচিত ঢাকা–কুমিল্লা কর্ড লাইন প্রকল্প আবারও সামনে আসায় রেলযাত্রার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে প্রকল্পটির কথা উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। রেলওয়ের কর্মকর্তাদের মতে, কর্ড লাইন নির্মাণ সম্পন্ন হলে ঢাকা–চট্টগ্রাম রেলপথের দূরত্ব প্রায় ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এতে যাত্রার সময় সাড়ে তিন ঘণ্টার মধ্যে নামিয়ে আনার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বাজেটে নতুন করে গুরুত্ব
জাতীয় সংসদে দেওয়া বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী জানান, ঢাকা–কুমিল্লা কর্ড লাইনের সম্ভাব্যতা যাচাই ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। সম্ভাব্য তিনটি রুটের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের শ্যামপুর থেকে কুমিল্লার লালমাই পর্যন্ত একটি পথ প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে চট্টগ্রাম বন্দর, বে-টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে আসা পণ্যবাহী ট্রেনগুলো বিদ্যমান রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দ্রুত রাজধানী ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পণ্য পরিবহন করতে পারবে। এতে লজিস্টিকস খাতের দক্ষতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে বাজেট ঘোষণায় প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয়, বরাদ্দ কিংবা বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি। রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে বিস্তারিত নকশা তৈরির কাজ চলছে এবং আগামী বছরের জুনের মধ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) চূড়ান্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই কর্ড লাইন
বর্তমানে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী ট্রেনকে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ভৈরব ও নরসিংদী হয়ে চলাচল করতে হয়। এ কারণে রেলপথের দূরত্ব সড়কের তুলনায় অনেক বেশি।
নতুন কর্ড লাইন চালু হলে আখাউড়া–ভৈরব অংশের দীর্ঘ ঘুরপথ এড়িয়ে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লার মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরি হবে। এতে শুধু যাত্রী পরিবহন নয়, পণ্য পরিবহনেও সময় ও খরচ কমবে।
রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন জানিয়েছেন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ভিত্তিতে নির্বাচিত রুট বাস্তবায়িত হলে ঢাকা–চট্টগ্রাম রেলপথের দূরত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং যাত্রীরা প্রায় দুই ঘণ্টা সময় সাশ্রয়ের সুবিধা পাবেন। একই সঙ্গে ভূমি অধিগ্রহণসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমও ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়া হবে।
পণ্য পরিবহনে নতুন সম্ভাবনা
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামে অবস্থিত। ভবিষ্যতে বে-টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে পণ্য পরিবহনের চাপ আরও বাড়বে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতিতে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য রেলসংযোগ অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পণ্যবাহী ট্রেন পৌঁছাতে ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে। ইঞ্জিন ও ট্রেন সংকটের কারণে অনেক ক্ষেত্রে এই সময় আরও বেড়ে যায়। ফলে ব্যবসায়ীরা প্রায়ই সড়কপথের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন।
রেলওয়ের পরিসংখ্যান বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে পণ্য পরিবহন কার্যক্রমে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। পণ্যবাহী ট্রেন ও ওয়াগনের ব্যবহারও কমেছে। কর্মকর্তাদের মতে, প্রয়োজনীয় সংখ্যক ইঞ্জিনের ঘাটতি এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ।
তাদের ধারণা, কর্ড লাইন নির্মাণ সম্পন্ন হলে একই রুটে আরও বেশি ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব হবে। এতে যাত্রী পরিবহন ও মালবাহী ট্রেন পরিচালনা উভয় ক্ষেত্রেই সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
ব্যবসায়ী মহলের প্রত্যাশা
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী নেতারা দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা–চট্টগ্রাম কর্ড লাইনের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডরে পণ্য পরিবহন আরও দ্রুত ও সাশ্রয়ী হবে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক বলেছেন, কর্ড লাইন চালু হলে বন্দরনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসবে এবং যাত্রী পরিবহনেও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাবে। তবে ভবিষ্যতের ক্রমবর্ধমান পরিবহন চাহিদা মোকাবিলায় বৃহৎ সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নও সমানভাবে প্রয়োজন।
বর্তমানে প্রকল্পটি পরিকল্পনা ও নকশা পর্যায়ে রয়েছে। তবে এটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা–চট্টগ্রাম রেল যোগাযোগে নতুন যুগের সূচনা হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতি / এডি / শাআ


















