কেন হরমুজ প্রণালি একটি ভূতাত্ত্বিক বিস্ময় হিসেবে পরিচিত
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হলো হরমুজ প্রণালি। প্রস্থে ছোট হলেও এর কৌশলগত গুরুত্ব বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অপরিসীম। এই সরু প্রণালি দিয়েই সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের বড় একটি অংশ যাতায়াত করে। ফলে, কোনো কারণে নৌ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তা মুহূর্তে প্রভাব ফেলে। বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যীয় উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই জলপথের গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানী মাইক সার্লে বলেন, হরমুজ প্রণালিটি শুধু অর্থনৈতিক কারণে নয়, এটি ভূতাত্ত্বিক দিক থেকেও বিশেষ। এটি এমন এক অঞ্চল যেখানে দুটি মহাদেশীয় প্লেটের সংঘর্ষের প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এই ভূ-প্রক্রিয়াই কয়েক কোটি বছর ধরে এই প্রণালির অদ্ভুত ভূপ্রকৃতি তৈরি করেছে।
দক্ষিণ ইরানের জাগ্রোস পর্বতমালা থেকে প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলটি অদ্ভুত ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের উদাহরণ। বিশেষ করে ওমানের মুসান্দাম উপদ্বীপটি উত্তরে প্রসারিত হয়ে ইরানের পাহাড়ের দিকে এগিয়ে গেছে। এখানকার খাড়া পাথুরে পাহাড় ও জটিল উপকূলরেখা পৃথিবীর অনন্য দৃশ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম।
মুসান্দাম উপদ্বীপের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো ‘ওফিওলাইট’ নামের বিরল শিলা মাটির উপরিভাগে দৃশ্যমান। সাধারণত এ ধরনের শিলা সমুদ্রের তলদেশে থাকে, কিন্তু এখানে তা স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ পায়। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ওফিওলাইট কমপ্লেক্সগুলোর মধ্যে একটি। একই ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া যেটি অঞ্চলটিকে অনন্য করেছে, সেটি এটিকে সংকীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণও করেছে।
হরমুজ প্রণালির গঠন ও উৎপত্তি
এই জলপথের উৎপত্তি লক্ষ লক্ষ বছর ধরে টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া ও সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তনের ফলে। প্রায় সাড়ে ৩ কোটি বছর আগে দক্ষিণে আরবীয় প্লেট এবং উত্তরে ইউরেশীয় প্লেটের মধ্য দিয়ে প্রাচীন টেথিস মহাসাগর বিস্তৃত ছিল।
ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানী মার্ক অ্যালেন জানান, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরবীয় প্লেটটি ইউরেশীয় প্লেটের নিচে চলে আসে। বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াকে ‘সাবডাকশন’ বা অধোগমন বলেন। এতে ধীরে ধীরে টেথিস মহাসাগর বিলীন হয়ে যায় এবং দুই প্লেটের সংঘর্ষের ফলে নতুন ভূ-প্রকৃতি তৈরি হয়।
এই সংঘর্ষের ফলে ইরানের জাগ্রোস পর্বতমালার গঠন হয় এবং নিচু অববাহিকা তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। শেষ তুষারযুগের পর বরফ গলতে শুরু করলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। প্রায় ১৫ হাজার বছরের মধ্যে পানির স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায় এবং হরমুজ প্রণালি তার বর্তমান রূপ পায়।
প্রাকৃতিক সম্পদ ও বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব
হরমুজ প্রণালি শুধু রাজনৈতিক কারণে নয়, এর ভূগঠন ও প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে বৈজ্ঞানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বহু কোটি বছর আগে প্লেট সংঘর্ষের ফলে এখানে বিপুল জৈব পদার্থ জমা হয়, যা পরে তেল ও গ্যাসের বিশাল ভান্ডারে রূপান্তরিত হয়। ফলে, মধ্যপ্রাচ্য আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্র।
উত্তরে জাগ্রোস অঞ্চলে চুনাপাথরের স্তর ও বিরল লবণ হিমবাহ দেখা যায়, যেখানে মাটির গভীর থেকে লবণ উঠে পাহাড়ের ঢাল বরাবর নেমে আসে। দক্ষিণে মুসান্দাম উপদ্বীপ ধীরে ধীরে উত্তরে সরছে, যার ফলে প্রণালিটি ক্রমশ সরু হয়ে যাচ্ছে। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, বহু কোটি বছর পরে এটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
প্রতি / এডি / শাআ













