তীব্র গরমে বাড়ছে নীরব মৃত্যুর ঝুঁকি

প্রকাশঃ এপ্রিল ৫, ২০২৬ সময়ঃ ১১:২৬ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১১:২৬ অপরাহ্ণ

ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে এক অদৃশ্য সংকট। কোনো তাৎক্ষণিক ধ্বংসযজ্ঞ নেই, চোখে পড়ার মতো আতঙ্কও নেই—তবু প্রতিদিন নিঃশব্দে কেড়ে নিচ্ছে মানুষের জীবন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অস্বাভাবিক হারে তাপমাত্রা বাড়ছে, আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তাপজনিত অসুস্থতা ও মৃত্যুঝুঁকি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শুরু হওয়া তাপপ্রবাহ ইতোমধ্যেই জনজীবনকে কঠিন করে তুলেছে। বিশেষ করে খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি মাসজুড়ে দফায় দফায় তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে, এমনকি তীব্র তাপপ্রবাহও দেখা দিতে পারে। আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলোও সতর্ক করছে—বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে তাপমাত্রাজনিত মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। ইতোমধ্যে দেশের বড় শহরগুলো, বিশেষ করে ঢাকা, খুলনা ও চট্টগ্রাম, এই ঝুঁকির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ‘নীরব সংকট’ মোকাবিলায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে। আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করা, নগর সবুজায়ন বাড়ানো, শ্রমঘণ্টা পুনর্বিন্যাস, বিশুদ্ধ পানির সহজলভ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার প্রস্তুতি জোরদার করা জরুরি। কারণ প্রতিটি অতিরিক্ত ডিগ্রি তাপমাত্রা মানেই বাড়তি স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং সম্ভাব্য প্রাণহানি।

এপ্রিলের শুরু থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় তাপপ্রবাহের প্রভাব স্পষ্ট। সম্প্রতি অন্তত ২৭ জেলায় মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি মাসে এক থেকে দুটি তীব্র তাপপ্রবাহের পাশাপাশি একাধিক মৃদু ও মাঝারি তাপপ্রবাহ হতে পারে। রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের সব জেলাসহ ঢাকাসহ আরও বেশ কিছু এলাকায় এর প্রভাব দেখা গেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের মানদণ্ড অনুযায়ী, তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৭.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তা মৃদু, ৩৮ থেকে ৩৯.৯ ডিগ্রি হলে মাঝারি, ৪০ থেকে ৪১.৯ ডিগ্রি হলে তীব্র এবং ৪২ ডিগ্রির বেশি হলে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ হিসেবে ধরা হয়।

ক্রমাগত তাপমাত্রা বৃদ্ধি এখন শুধু পরিবেশগত উদ্বেগের বিষয় নয়; এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের বড় ঝুঁকিতে রূপ নিচ্ছে। ক্লাইমেট অ্যাকশন ল্যাবের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে অতিরিক্ত প্রায় ২৪ জনের মৃত্যু ঘটতে পারে। তাপজনিত মৃত্যুঝুঁকির দিক থেকে বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছে।

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, দেশের বড় শহরগুলোতে এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। উপকূলীয় শহর খুলনায় প্রতি এক লাখে ৩৬ জনের মৃত্যুঝুঁকি রয়েছে, যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। ঢাকায় এ হার ২২ এবং চট্টগ্রামে ১২ জন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এসব মৃত্যুর বেশিরভাগই ঘটবে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে, যেখানে স্বাস্থ্যব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে দুর্বল।

তাপপ্রবাহের প্রভাব শুধু সরাসরি নয়, পরোক্ষভাবেও মারাত্মক। হিটস্ট্রোক, ডিহাইড্রেশন ও হৃদরোগজনিত জটিলতা বাড়ছে। একই সঙ্গে কর্মক্ষমতা কমে যাচ্ছে, খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবিকায় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। নির্মাণশ্রমিক, রিকশাচালক ও কৃষিশ্রমিকদের মতো খোলা আকাশের নিচে কাজ করা মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। দীর্ঘ সময় উচ্চ তাপমাত্রায় কাজ করার ফলে শরীরে পানি ও লবণের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।

শহরের বস্তি ও নিম্নআয়ের মানুষের বসবাসের পরিবেশ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ঘনবসতি, বাতাস চলাচলের সীমাবদ্ধতা এবং নিরাপদ পানির অভাব—সব মিলিয়ে তাপপ্রবাহ সেখানে আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকটের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এর নীরবতা। ঝড় বা বন্যার মতো তাৎক্ষণিক ধ্বংসযজ্ঞ না থাকায় বিষয়টি অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়। কিন্তু হাসপাতালের রোগীর সংখ্যা, ক্লান্ত মানুষের অবস্থা এবং পরিসংখ্যানে এর ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এ পরিস্থিতিতে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। আগাম সতর্কতা জারি, শহরে সবুজায়ন বৃদ্ধি, জলাধার সংরক্ষণ, তাপ সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলা—এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষের জন্য কাজের সময়সূচি পরিবর্তন, বিশ্রামের ব্যবস্থা এবং বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা জরুরি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাছপালা কমে যাওয়া, নগরায়নের চাপ এবং এসির ব্যবহার বৃদ্ধিও তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। ফলে শহর ও গ্রাম উভয় এলাকাতেই ঝুঁকি বাড়ছে। তাই জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তারা আরও সতর্ক করেছেন, এই সংকট শুধু স্বাস্থ্য খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি অর্থনীতি, শ্রমবাজার এবং সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলবে। কর্মক্ষমতা হ্রাস পেলে উৎপাদন কমবে, স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়বে এবং অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের মত, জলবায়ু পরিবর্তনের এই প্রভাব এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়—এটি বর্তমান বাস্তবতা। যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ধীরে ধীরে এক বড় মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে, যেখানে প্রতিটি অতিরিক্ত ডিগ্রি তাপমাত্রা মানে আরও কিছু অদৃশ্য মৃত্যু।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G