জাপানি শিশুরা ঘরে ঢুকেই কেন গরগরা করে, জানলে অবাক হবেন!

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৬ সময়ঃ ৯:৩২ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৯:৩২ অপরাহ্ণ

জাপানে অনেক শিশুর মধ্যেই বাইরে থেকে বাড়ি ফেরার পর গরগরা করার একটি অভ্যাস রয়েছে। দেশটিতে প্রচলিত এই রীতিকে বলা হয় ‘উগাই’। সুস্থ থাকার অভ্যাস হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে এটি চর্চা করা হলেও প্রশ্ন উঠতে পারে, নিয়মিত গরগরা করলে আদৌ কি রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ে?

বিষয়টি নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. কাকলী হালদার এবং মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শিশুবিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক ডা. তাসনুভা খানের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে।

গরগরা করলে শরীরে কী ঘটে?

গরগরা করার সময় মুখ ও গলার ভেতরের কিছু অংশ পরিষ্কার হয়। মুখ থেকে পানি বের করে দেওয়ার সঙ্গে খাবারের ক্ষুদ্র কণা, ধুলা এবং কিছু অণুজীবও বেরিয়ে যেতে পারে। ফলে সাময়িকভাবে মুখ ও গলার ওই অংশে জীবাণুর পরিমাণ কিছুটা কমতে পারে।

বিশেষ করে বাইরে থাকার সময় নাক ও মুখের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের অণুজীব শরীরে প্রবেশের সুযোগ পায়। বাড়ি ফেরার পর গরগরা করলে মুখ ও গলার কিছু অংশে থাকা এসব অণুজীবের একটি অংশ দূর হতে পারে। নিয়মিত কুলি বা গরগরা করার ফলে মুখের দুর্গন্ধ কমাতেও কিছুটা সহায়তা মিলতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে গরগরা করলেই সংক্রমণ থেকে নিশ্চিতভাবে সুরক্ষা পাওয়া যাবে। শরীরে প্রবেশ করা সব ধরনের জীবাণু শুধু গরগরা করার মাধ্যমে দূর করা সম্ভব নয়।

রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কি বাড়ে?

উগাইকে স্বাস্থ্যকর একটি অভ্যাস হিসেবে বিবেচনা করা যায়। বাইরে থেকে ফিরে মুখ পরিষ্কার করার জন্য পানি দিয়ে গরগরা বা কুলি করায় সাধারণভাবে ক্ষতির আশঙ্কা নেই। কিছু গবেষণায় নিয়মিত উগাইয়ের সঙ্গে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি কমার সম্ভাব্য সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

তবে এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। বিভিন্ন গবেষণার ফলও এক রকম নয়। তাই শুধু উগাই করলেই শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বেড়ে যায়, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বর্তমানে নেই।

অর্থাৎ উগাই মুখ ও গলার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার একটি অভ্যাস হতে পারে, কিন্তু এটিকে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর নিশ্চিত পদ্ধতি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

উপকারী জীবাণু কি নষ্ট হয়?

শিশুদের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে আলোচনায় ‘হাইজিন হাইপোথিসিস’ এবং এর আধুনিক ব্যাখ্যা ‘ওল্ড ফ্রেন্ডস হাইপোথিসিস’-এর কথাও আসে।

এই ধারণা অনুযায়ী, শিশুর বেড়ে ওঠার সময়ে প্রাকৃতিক পরিবেশের কিছু অণুজীব ও বিভিন্ন ধরনের জীবজগতের সংস্পর্শে থাকা তার রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার স্বাভাবিক বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে। মাটি, প্রাকৃতিক পরিবেশ কিংবা প্রাণীর আশপাশে থাকার মতো অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে অ্যালার্জি ও কিছু রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাসংশ্লিষ্ট সমস্যার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে বলে গবেষণায় ধারণা পাওয়া গেছে।

তবে এই ধারণা থেকে এমনটা বলা যায় না যে শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে রাখতে হবে বা সংক্রমণ হতে দিতে হবে। আবার পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়ে তোলাও এর বিরোধী নয়।

সাধারণ পানি দিয়ে গরগরা করলে মুখের উপকারী অণুজীবের স্বাভাবিক ভারসাম্য উল্লেখযোগ্যভাবে নষ্ট হয়, এমন শক্ত প্রমাণও নেই। তবে প্রয়োজন ছাড়া বারবার জীবাণুনাশক দ্রবণ দিয়ে গরগরা করা উচিত নয়। এতে মুখের স্বাভাবিক জীবাণুসমষ্টির ভারসাম্যে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকতে পারে।

শিশুদের সুস্থ রাখতে যেসব অভ্যাস জরুরি

শুধু উগাইয়ের ওপর নির্ভর না করে শিশুদের দৈনন্দিন পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তোলা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাইরে থেকে ফেরার পর সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধোয়া এর মধ্যে অন্যতম।

খাওয়ার আগে এবং শৌচকর্মের পর হাত পরিষ্কার করা জরুরি। অপরিষ্কার হাতে নাক, মুখ ও চোখ স্পর্শ না করার অভ্যাসও শিশুদের শেখানো প্রয়োজন। মেয়েদের ক্ষেত্রে অপরিষ্কার হাতে শৌচকর্মের অভ্যাস মূত্রনালির সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

এ ছাড়া শিশুর খাবারে পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করা, নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুম, বয়স অনুযায়ী টিকা নেওয়া এবং শাকসবজি ও ফলমূল ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। খাবার তৈরি থেকে পরিবেশন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাও জরুরি।

শ্বাসতন্ত্রের কোনো সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে পরিস্থিতি অনুযায়ী মাস্ক ব্যবহারসহ প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেওয়া যেতে পারে।

উগাই করা যাবে কীভাবে?

সাধারণ পানি দিয়ে গরগরা করা যেতে পারে। চাইলে পানিতে অল্প পরিমাণ লবণ মিশিয়েও কুলি করা যায়। তবে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া জীবাণুনাশক দ্রবণ ব্যবহার না করাই ভালো।

শিশুকে সব ধরনের পশুপাখি থেকে দূরে রাখারও প্রয়োজন নেই। সুস্থ ও নিরাপদ প্রাণীর সঙ্গে নিয়ন্ত্রিতভাবে সময় কাটানোর সুযোগ শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। একইভাবে ঘরের মেঝে সব সময় জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করারও প্রয়োজন নেই।

শিশু একটু বড় হলে তাকে খোলা জায়গায় আলো-বাতাসে খেলাধুলা ও দৌড়ঝাঁপের সুযোগ দেওয়া উচিত। অর্থাৎ পরিচ্ছন্নতা যেমন জরুরি, তেমনি শিশুকে স্বাভাবিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে, বাড়ি ফেরার পর পানি দিয়ে গরগরা করা একটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস হিসেবে রাখা যেতে পারে। এতে মুখ ও গলার কিছু অণুজীব ও ময়লা সাময়িকভাবে কমতে পারে। তবে উগাই সরাসরি রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়, এমন নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তাই শিশুর সুস্থতার জন্য হাত ধোয়া, পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম, টিকা এবং স্বাভাবিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

September 2026
SSMTWTF
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930 
20G