মাছেও মিলছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা
মাছ বাংলাদেশের মানুষের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সেই মাছের শরীরেই এবার পাওয়া গেছে অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা। ময়মনসিংহের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ, চলন বিল, আড়িয়াল খাঁ বিল ও বিভিন্ন পুকুর থেকে সংগ্রহ করা মাছের অন্ত্র ও মাংসপেশিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন গবেষকরা। এ ধরনের প্লাস্টিক দূষণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গবেষক ও পরিবেশবিদরা।
ময়মনসিংহ প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৩৪ পিএম
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের একটি গবেষণায় বিভিন্ন জলাশয় থেকে সংগ্রহ করা মাছ পরীক্ষা করা হয়। গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরীক্ষায় কয়েকটি প্রজাতির মাছের শরীরের ভেতরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
গবেষক দলের প্রধান মো. শাহজাহান জানান, কই, পুঁটি, ট্যাংরা ও বাটা মাছের নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। তবে লইটকা ও ছুরি শুঁটকিতে তুলনামূলকভাবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।
গবেষকদের মতে, শরীরে প্রবেশ করা এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা নাও যেতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে এসব কণা শরীরে জমতে থাকলে এর সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
গবেষণা দলের সদস্য বিপাশা সাহা পড়শী বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয় না। মানুষের ব্যবহৃত বিভিন্ন প্লাস্টিকজাত পণ্য থেকেই এগুলোর উৎপত্তি।
যেভাবে মাছের শরীরে ঢোকে
নদী, খাল, বিল কিংবা অন্যান্য জলাশয়ে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে ভেঙে ছোট ছোট কণায় পরিণত হয়। সূর্যের আলো, পানির স্রোতসহ নানা কারণে বড় প্লাস্টিকের টুকরো ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়ে পানিতে ছড়িয়ে পড়ে।
পরে এসব কণা জলজ প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করতে পারে। মাছ খাবারের সঙ্গে কিংবা দূষিত পানির মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করলে তা তাদের পরিপাকতন্ত্রে জমা হতে পারে। গবেষণায় মাছের অন্ত্রের পাশাপাশি মাংসপেশিতেও এসব কণার উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
গবেষণা দলের সদস্য মোখলেছুর রহমান বলেন, মাছের শরীরে প্লাস্টিকের উপস্থিতির কারণে তাদের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে মাছের বেঁচে থাকা ও স্বাভাবিক বৃদ্ধির ওপরও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জলজ প্রাণীর জন্যও উদ্বেগ
মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাব শুধু মাছের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্লাস্টিক দূষণের কারণে নদী, খাল-বিল ও অন্যান্য জলাশয়ের বিভিন্ন জলজ প্রাণীও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে বলে মনে করছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের মুরাদ আহম্মেদ ফারুখ বলেন, পরিবেশে দীর্ঘদিন অবস্থান করা মাইক্রোপ্লাস্টিক বিভিন্ন ক্ষুদ্র আকারে থেকে যেতে পারে। এসব কণা জীবদেহে জমতে থাকলে নানা ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গবেষকদের মতে, জলাশয়ে প্লাস্টিক বর্জ্য জমতে থাকলে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ আরও বাড়তে পারে। এর প্রভাব একদিকে জলজ জীববৈচিত্র্যের ওপর পড়তে পারে, অন্যদিকে খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের কাছেও এর প্রভাব পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ কমাতে প্রথমেই প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে হবে। পাশাপাশি নদী, খাল-বিল, পুকুরসহ কোনো জলাশয়ে যাতে প্লাস্টিক ও পলিথিন ফেলা না হয়, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জলজ পরিবেশ ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
প্রতি / এডি / শাআ



















