নতুন বিশ্বমানচিত্রে ফুটে উঠবে আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন
বিশ্বের প্রচলিত মানচিত্রে এবার বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। ষোড়শ শতকে তৈরি মারকেটর প্রজেকশনের বদলে দেশগুলোর প্রকৃত আয়তন তুলনামূলকভাবে সঠিকভাবে তুলে ধরতে নতুন ধরনের মানচিত্র ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে আফ্রিকা মহাদেশকে প্রচলিত মানচিত্রে বাস্তবের তুলনায় ছোট দেখানোর যে সমস্যা রয়েছে, তা দূর করাই এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
আফ্রিকান ইউনিয়নের নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরেই এ বিষয়ে পরিবর্তনের দাবি জানানো হচ্ছিল। উদ্যোগটির পেছনে অন্যতম সক্রিয় দেশ পশ্চিম আফ্রিকার টোগো। তাদের বক্তব্য, কয়েক শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত মানচিত্রে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের আকারের যে বিকৃতি তৈরি হয়েছে, সেটি সংশোধনের সময় এসেছে।
মারকেটর প্রজেকশনে বিষুবরেখা থেকে যত দূরে যাওয়া যায়, মানচিত্রে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলোর আকার তত বেশি বড় হয়ে দেখা দেয়। এর ফলে বাস্তব আয়তনের সঙ্গে মানচিত্রের চিত্রের বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হয়। সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ গ্রিনল্যান্ড ও আফ্রিকা। মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ডকে আফ্রিকার কাছাকাছি আকারের মনে হলেও বাস্তবে আফ্রিকা মহাদেশ গ্রিনল্যান্ডের তুলনায় প্রায় ১৪ গুণ বড়।
এই বিকৃতির বিষয়টি সংশোধনের দাবি আফ্রিকার দেশগুলো বহুদিন ধরেই জানিয়ে আসছে। তাদের উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নতুন বিশ্বমানচিত্র ব্যবহারের বিষয়ে প্রস্তাব আনা হয়। এতে ১৬৪টি দেশ সমর্থন জানায়। ছয়টি দেশ ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকে এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবটির বিপক্ষে ভোট দেয়।
বিশ্বের মানচিত্রে অঞ্চলগুলোর প্রকৃত আয়তন তুলে ধরাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। সমালোচকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত মানচিত্র মানুষের মধ্যে বিভিন্ন দেশের আকার ও গুরুত্ব সম্পর্কে এক ধরনের ভুল ধারণা তৈরি করেছে। বিশেষ করে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার মতো অঞ্চলগুলোকে মানচিত্রে বাস্তবের তুলনায় ছোট মনে হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মারকেটর প্রজেকশন তৈরি করেছিলেন ইউরোপীয় মানচিত্রকার জেরার্ডাস মারকেটর। ১৫৬৯ সালে প্রকাশিত এই প্রজেকশন নৌযাত্রায় দিকনির্দেশনা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বেশ কার্যকর ছিল। কিন্তু পৃথিবীর গোলাকার পৃষ্ঠকে সমতল মানচিত্রে তুলে ধরতে গিয়ে এতে বিভিন্ন অঞ্চলের আয়তন ও আকৃতিতে বিকৃতি তৈরি হয়।
এই কারণে গ্রিনল্যান্ডকে মানচিত্রে অত্যন্ত বড় দেখা যায়। অথচ বাস্তবে এর আয়তন আফ্রিকার বিশাল ভূখণ্ডের সঙ্গে তুলনীয় নয়। এমনকি গ্রিনল্যান্ডের প্রকৃত আয়তন মধ্য আফ্রিকার গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের কাছাকাছি।
গবেষকদের একটি অংশ মনে করেন, মানচিত্রের এই বিকৃতির প্রভাব শুধু ভূগোলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাকে তুলনামূলকভাবে বড় এবং মানচিত্রের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে দেখানোর কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল সম্পর্কে মানুষের ধারণায় এর প্রভাব পড়তে পারে। আফ্রিকার দেশগুলো মনে করে, এই ধরনের উপস্থাপন তাদের মহাদেশের প্রকৃত ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বকে আড়াল করেছে।
নতুন প্রস্তাবে তাই মারকেটর প্রজেকশনের পরিবর্তে ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। এই ধরনের মানচিত্রে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের ক্ষেত্রফলকে তুলনামূলকভাবে নির্ভুলভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়। এতে ইউরোপ কিছুটা ছোট, ব্রাজিল অপেক্ষাকৃত বিস্তৃত এবং গ্রিনল্যান্ড অনেক ছোট আকারে দেখা যায়। বিপরীতে আফ্রিকার বিশাল আয়তন স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
২০১৮ সালের উত্তর আমেরিকান কার্টোগ্রাফিক ইনফরমেশন সোসাইটির সম্মেলনে ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন নিয়ে আলোচনা সামনে আসে। পরবর্তী সময়ে এর বিভিন্ন সংস্করণ তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো সংস্করণে পৃথিবীর মানচিত্রের কেন্দ্র হিসেবে ওশেনিয়া অঞ্চলকেও সামনে আনা হয়েছে। এতে প্রচলিত গ্রিনিচ-কেন্দ্রিক মানচিত্রের ধারণা থেকে ভিন্ন একটি দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যায়।
চলতি বছরের মার্চে আফ্রিকান ইউনিয়ন ইকুয়াল আর্থ ম্যাপ গ্রহণ করে। এর পরের মাসে টোগো আফ্রিকান ইউনিয়নের হয়ে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর কাছে নতুন মানচিত্র ব্যবহারের আহ্বান জানায়। জুলাইয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এ নিয়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়। এরপরই প্রস্তাবটি ভোটের জন্য উপস্থাপন করা হয়।
আফ্রিকার স্বাস্থ্য, মানবিক বিষয় ও সামাজিক উন্নয়ন বিভাগের কমিশনার আম্মা টুম-আমোআহও এই উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তার মতে, মানচিত্রে এত দিন আফ্রিকার যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, সেটি পরিবর্তন করে মহাদেশটির প্রকৃত ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব সামনে আনা প্রয়োজন।
শুধু আফ্রিকাই নয়, বিশ্বের আরও কিছু দেশ দীর্ঘদিন ধরে মারকেটর মানচিত্রের সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। নিউজিল্যান্ডও এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে। ২০১৮ সালে দেশটির পর্যটন প্রচারণায় রসিকতা করে দেখানো হয়েছিল, বিশ্বের মানচিত্রের এক প্রান্তে অবস্থানের কারণে নিউজিল্যান্ডকে যেন মানচিত্র থেকেই বাদ পড়ে যেতে দেখা যায়।
তবে নতুন মানচিত্র গ্রহণের উদ্যোগ এলেও ডিজিটাল দুনিয়ায় পরিবর্তন আনতে আরও সময় লাগতে পারে। গুগল ম্যাপসের মতো জনপ্রিয় ডিজিটাল মানচিত্রসেবাগুলো এখনো মূলত মারকেটরভিত্তিক প্রজেকশন ব্যবহার করে। তাই নতুন প্রস্তাবে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাতিসংঘ ও আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করে আরও বাস্তবসম্মত মানচিত্র তৈরির আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশ্বের মানচিত্র শুধু দেশগুলোর অবস্থান দেখায় না, মানুষের কাছে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল সম্পর্কে একটি দৃশ্যমান ধারণাও তৈরি করে। তাই মানচিত্রে আকারের এই দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর হলে আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রকৃত আয়তন ও অবস্থান সম্পর্কে মানুষের ধারণাতেও পরিবর্তন আসতে পারে।
প্রতি / এডি / শাআ























