পুরোনো বইয়ের পাতার গন্ধে মন ভালো হয়ে যায় যে কারণে

প্রকাশঃ আগস্ট ১৭, ২০২৬ সময়ঃ ৮:১৪ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ৮:১৪ অপরাহ্ণ

পুরোনো কোনো বই হাতে নিয়ে পাতা উল্টালেই অনেকের নাকে ভেসে আসে এক বিশেষ ঘ্রাণ। সেই গন্ধে কখনো মাটির সোঁদা ভাব, কখনো হালকা মিষ্টি সুবাস, আবার কখনো পুরোনো কাগজের পরিচিত আমেজ পাওয়া যায়। অদ্ভুত হলেও সত্যি, এই গন্ধ অনেকের কাছেই বেশ প্রশান্তিদায়ক। পুরোনো বইয়ের ঘ্রাণ পেলে কারও মনে ফিরে আসে শৈশবের স্মৃতি, কারও মনে পড়ে স্কুলের লাইব্রেরি, আবার কেউ ফিরে যান প্রিয় কোনো মানুষের কাছে।

পুরোনো বইয়ের গন্ধের প্রতি এই আকর্ষণেরও একটি নাম রয়েছে, ‘বিব্লিওসমিয়া’। শব্দটি বই ও গন্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত গ্রিক শব্দ থেকে তৈরি। ইংরেজ অধ্যাপক অলিভার টিয়ার্ল ২০১৪ সালে শব্দটি ব্যবহারের মাধ্যমে পুরোনো বইয়ের ঘ্রাণের প্রতি মানুষের বিশেষ আকর্ষণকে একটি নাম দেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, পুরোনো বইয়ের গন্ধে এমন কী আছে, যা আমাদের এত সহজেই আকৃষ্ট করে?

গন্ধের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে স্মৃতি

পুরোনো বইয়ের ঘ্রাণ ভালো লাগার অন্যতম কারণ হলো স্মৃতি। কোনো নির্দিষ্ট গন্ধ অনেক সময় আমাদের বহু বছর আগের ঘটনা বা অনুভূতির কথা মনে করিয়ে দিতে পারে।

ছোটবেলায় স্কুলের লাইব্রেরিতে বসে বই পড়া, বাড়ির পুরোনো আলমারি থেকে বই বের করা কিংবা পরিবারের কারও সংগ্রহে থাকা বই পড়ার স্মৃতি সেই একই ধরনের গন্ধের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। ফলে অনেক বছর পর আবার পুরোনো বইয়ের ঘ্রাণ পেলে মস্তিষ্ক সেই পুরোনো অনুভূতিগুলোকে যেন নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।

গন্ধের সঙ্গে মানুষের আবেগের সম্পর্কও বেশ গভীর। নাক দিয়ে কোনো ঘ্রাণ গ্রহণ করার পর তার সংকেত মস্তিষ্কের এমন কিছু অংশে পৌঁছায়, যেগুলো স্মৃতি ও আবেগের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই কোনো পুরোনো বইয়ের গন্ধ মুহূর্তের মধ্যেই আমাদের মন ভালো করে দিতে পারে বা অতীতের কোনো ঘটনা মনে করিয়ে দিতে পারে।

পুরোনো বইয়ে গন্ধ তৈরি হয় কীভাবে

এর পেছনে রয়েছে রসায়নেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বইয়ের কাগজ তৈরিতে মূলত কাঠজাত উপাদান ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে সেলুলোজ ও লিগনিন গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাগজের এসব উপাদান ধীরে ধীরে রাসায়নিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়।

এই প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ধরনের উদ্বায়ী রাসায়নিক যৌগ তৈরি হয়। সেগুলো বাতাসে ছড়িয়ে পড়ার পরই আমরা পুরোনো বইয়ের পরিচিত গন্ধ অনুভব করি।

পুরোনো কাগজের ঘ্রাণে ভ্যানিলার মতো মিষ্টি আমেজ পাওয়ার পেছনে ভ্যানিলিনের ভূমিকা রয়েছে। আবার বেনজালডিহাইড বাদামের মতো হালকা গন্ধ তৈরি করতে পারে। ফারফিউরাল থেকে পাওয়া যেতে পারে সেঁকা রুটি বা মিষ্টি ধরনের ঘ্রাণ। অন্যদিকে গুয়াইয়াকল পুরোনো কাঠ বা হালকা পোড়া কাঠের মতো গন্ধের অনুভূতি দিতে পারে।

অর্থাৎ, আমরা যে ‘পুরোনো বইয়ের গন্ধ’ বলে চিনি, সেটি আসলে একাধিক রাসায়নিক উপাদানের সম্মিলিত ফল।

নতুন বইয়ের ঘ্রাণ কেন আলাদা

নতুন বই হাতে নিলে যে গন্ধ পাওয়া যায়, সেটি পুরোনো বইয়ের ঘ্রাণের চেয়ে বেশ ভিন্ন। নতুন কাগজ, মুদ্রণের কালি এবং বই তৈরিতে ব্যবহৃত আঠাসহ বিভিন্ন উপাদান থেকে সেই গন্ধ তৈরি হয়।

নতুন বইয়ের ঘ্রাণ সাধারণত তুলনামূলকভাবে তীব্র ও সতেজ। সময়ের সঙ্গে কাগজের রাসায়নিক উপাদানগুলো পরিবর্তিত হতে থাকলে সেই গন্ধও বদলে যায়। কয়েক বছর বা তারও বেশি সময় পর বইয়ের পাতায় তৈরি হতে পারে সেই পরিচিত পুরোনো কাগজের মিষ্টি ও কাঠের মতো ঘ্রাণ।

পুরোনো বইয়ের গন্ধ শোঁকা কি নিরাপদ?

শুকনা ও পরিষ্কার পুরোনো বইয়ের স্বাভাবিক ঘ্রাণ নিয়ে সাধারণত উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। তবে বই দীর্ঘদিন আর্দ্র পরিবেশে পড়ে থাকলে বিষয়টি আলাদা।

স্যাঁতস্যাঁতে বইয়ে ছত্রাক জন্মাতে পারে। সেই ছত্রাকের কণা ও ধুলাবালি শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করলে সংবেদনশীল মানুষের হাঁচি, কাশি বা অ্যালার্জির মতো সমস্যা হতে পারে। তাই বইয়ের গন্ধ যদি স্বাভাবিক কাগজের মতো না হয়ে স্যাঁতস্যাঁতে বা ছত্রাকের মতো লাগে, তাহলে বইটি পরিষ্কার ও শুকনা জায়গায় রাখা জরুরি।

পুরোনো বইয়ের পাতায় মুখ এগিয়ে নিয়ে সেই পরিচিত ঘ্রাণ নেওয়ার আনন্দ তাই শুধু আবেগের বিষয় নয়। এর পেছনে রয়েছে মানুষের স্মৃতি, মস্তিষ্কের আবেগপ্রক্রিয়া এবং কাগজের দীর্ঘদিনের রাসায়নিক পরিবর্তনের চমৎকার সমন্বয়।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

August 2026
SSMTWTF
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031 
20G