প্রথম কোন জিনিস আবিষ্কার করেছিলেন বিজ্ঞানীরা

প্রকাশঃ মে ২, ২০২৬ সময়ঃ ১০:০৬ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১০:০৬ অপরাহ্ণ

ঘড়ির কাঁটা থেমে থাকে না। ৬০ সেকেন্ডে এক মিনিট, ৬০ মিনিটে এক ঘণ্টা। প্রতিদিনের এই পরিচিত সময়-হিসাবের পেছনে লুকিয়ে আছে মানবসভ্যতার প্রাচীনতম বৈজ্ঞানিক উত্তরাধিকার। কয়েক হাজার বছর আগে মেসোপটেমিয়ার ব্যাবিলনেই তৈরি হয়েছিল সেই ধারণা, যা আজও আমাদের সময় গণনার ভিত্তি হয়ে আছে। শুধু সময় মাপাই নয়, সেখানেই গড়ে উঠেছিল মানবজাতির প্রথম সংগঠিত বৈজ্ঞানিক চর্চা।

মানুষ বহু আগে থেকেই প্রকৃতির নানা ইঙ্গিত বুঝে জীবন চালাত। কৃষক বুঝতেন কখন বৃষ্টি নামতে পারে, শিকারি বুঝতেন প্রাণীর গতিবিধি। তবে এসব ছিল অভিজ্ঞতানির্ভর জ্ঞান। বিজ্ঞান শুরু হয় তখনই, যখন মানুষ পর্যবেক্ষণকে নিয়মে বাঁধে, হিসাব করে, পরীক্ষা করে এবং তা লিখে সংরক্ষণ করে। সেই অর্থে পৃথিবীর প্রথম সুসংগঠিত বৈজ্ঞানিক প্রয়াস ছিল ব্যাবিলনীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান।

প্রাচীন ব্যাবিলনে আধুনিক ঘড়ি বা ক্যালেন্ডার ছিল না। আকাশই ছিল তাদের সময় মাপার প্রধান উপায়। চাঁদের পরিবর্তন দেখে তারা মাস গুনত, সূর্যের পুনরাবৃত্ত অবস্থান দেখে বছর হিসাব করত। কিন্তু তাদের আকাশ-পর্যবেক্ষণ কেবল সময় জানার জন্য ছিল না। তারা বিশ্বাস করত, আকাশে যা ঘটছে তা পৃথিবীর ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

ব্যাবিলনের মানুষ লক্ষ্য করেছিল, অধিকাংশ নক্ষত্র নির্দিষ্ট নিয়মে চললেও কিছু গ্রহ আচমকা ভিন্ন আচরণ করে। মঙ্গল বা বৃহস্পতির মতো গ্রহ কখনো আকাশে ধীরে যায়, কখনো থামে, আবার কখনো উল্টো দিকে চলতে দেখা যায়। আজ আমরা একে রেট্রোগ্রেড গতি বলি। একইভাবে সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণও তাদের কাছে ছিল গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। এসব ঘটনার সঙ্গে পৃথিবীর দুর্ভিক্ষ, বন্যা, মহামারি কিংবা রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্পর্ক খুঁজতে শুরু করে তারা।

এই পর্যবেক্ষণগুলো মুখে মুখে নয়, লিখে সংরক্ষণ করা হতো। ব্যাবিলনীয় লিপিকারেরা কাদা-মাটির ফলকে কিউনিফর্ম লিপিতে আকাশের ঘটনা ও তার ব্যাখ্যা লিখে রাখতেন। পরে সেগুলো পোড়ানো হতো, যাতে দীর্ঘদিন টিকে থাকে। আকাশের লক্ষণ ও তার ব্যাখ্যা নিয়ে তাদের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ছিল ‘এনুমা আনু এনলিল’। আর নক্ষত্র, ঋতু ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক নিয়ম নিয়ে তৈরি হয়েছিল ‘মুল.আপিন’, যা প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্যতম ভিত্তিপাঠ।

এরপর ব্যাবিলনীয়রা শুরু করে এক বিস্ময়কর কাজ। তারা আকাশ পর্যবেক্ষণের নিয়মিত দিনলিপি তৈরি করতে থাকে। প্রতিদিন চাঁদ, সূর্য ও গ্রহের অবস্থান নথিভুক্ত করা হতো। শুধু তাই নয়, আবহাওয়া, নদীর অবস্থা, এমনকি শস্যের দামও লেখা থাকত সেই নথিতে। এই তথ্য সংগ্রহ এক-দুই বছর নয়, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলেছিল। প্রায় ৭০০ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে এমন তথ্য সংরক্ষণ মানব ইতিহাসে এক অনন্য উদাহরণ।

দীর্ঘদিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে ব্যাবিলনীয়রা বুঝতে শুরু করে যে আকাশের ঘটনাগুলোরও নির্দিষ্ট গাণিতিক ছন্দ আছে। তারা গ্রহের পুনরাবৃত্ত অবস্থান হিসাব করতে শেখে, গ্রহণের সময় আগেভাগে অনুমান করতে পারে, এমনকি ভবিষ্যতের আকাশচিত্রও পূর্বাভাস দিতে শুরু করে। এই কাজের জন্য তারা গাণিতিক ছক ও পূর্বাভাসভিত্তিক সারণি তৈরি করেছিল, যা পরবর্তীকালে জ্যোতির্বিজ্ঞানের বড় ভিত্তি হয়ে ওঠে।

পরবর্তী গ্রিক জ্যোতির্বিদেরা ব্যাবিলনীয়দের এই দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ ও গাণিতিক তথ্য ব্যবহার করেই আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তি আরও শক্ত করেন। আজকের গ্রহণপঞ্জি, গ্রহের গতিপথ বা আকাশের হিসাবের পেছনে সেই ব্যাবিলনীয় জ্ঞানের ছাপ এখনো স্পষ্ট।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, সময় মাপার যে ৬০-ভিত্তিক নিয়ম আমরা আজও ব্যবহার করি, সেটিও ব্যাবিলনীয়দের উত্তরাধিকার। তারা দশমিক নয়, ৬০-ভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতিতে হিসাব করত। সময়, কোণ ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পরিমাপে এই পদ্ধতি এতটাই কার্যকর ছিল যে হাজার বছর পরও মানবসভ্যতা সেটি বদলানোর প্রয়োজন বোধ করেনি।

তাই বলা যায়, আধুনিক বিজ্ঞানের সূচনা কোনো আধুনিক গবেষণাগারে নয়, বরং প্রাচীন ব্যাবিলনের ধুলোমাখা মাটিতে। আকাশের দিকে তাকিয়ে, সংখ্যা গুনে, নিয়ম খুঁজে মানুষ প্রথম সেখানে বুঝতে শুরু করেছিল, প্রকৃতিরও নিজস্ব ভাষা আছে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

মন্তব্য করুনঃ

পাঠকের মন্তব্য

20G