সোনালু ফুলে সেজেছে সড়ক, মুগ্ধ করছে পথচারীদের
বৈশাখের তীব্র গরমে যখন পাহাড়ি জনপদ পুড়ছে খরতাপে, ঠিক তখনই খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় প্রকৃতি সাজিয়েছে এক অনন্য রূপ। সড়কের দুই পাশে ঝুলে থাকা সোনালু ফুলের সোনালি মঞ্জরি যেন পথজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে অন্যরকম প্রশান্তি।
ঢাকা-চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি-ঢাকা আঞ্চলিক সড়কের মাটিরাঙ্গা অংশ, বিশেষ করে হর্টিকালচার সেন্টারের আশপাশে, এখন চোখে পড়ছে সারি সারি সোনালু গাছ। গাছভর্তি ঝুলন্ত হলুদ ফুলে পথ যেন সোনালি আভায় মোড়া। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, পাহাড়ি এই পথ প্রকৃতির নিজস্ব অলংকারে সেজে উঠেছে।
গ্রীষ্মের শুরুতে সবুজ পাহাড়ের বুকজুড়ে সোনালু ফুলের এই রঙিন উপস্থিতি পরিবেশে এনে দিয়েছে আলাদা মাত্রা। লম্বা মঞ্জরিতে ঝুলে থাকা হলুদ ফুলগুলো বাতাসে দুলে তৈরি করছে দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতি বছর বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে সোনালু ফুটলেও এবার যেন এর সৌন্দর্য আরও বেশি নজর কাড়ছে।
সোনালু ফুলের বৈজ্ঞানিক নাম ক্যাসিয়া ফিস্টুলা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এটি সোনালু, সোনাইল, বান্দরলাঠি, বাঁদরলাঠি কিংবা কর্ণিকার নামেও পরিচিত। বাংলা সাহিত্যে এই ফুল ‘অমলতাস’ নামেও সুপরিচিত। থাইল্যান্ডে এটি জাতীয় ফুল হিসেবে স্বীকৃত।
সাধারণত ১৫ থেকে ২০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয় এই গাছ। শীত শেষে নতুন পাতার সঙ্গে গ্রীষ্মজুড়ে ফুটে ওঠে ঝুলন্ত সোনালি ফুল। প্রতিটি ফুলে থাকে পাঁচটি পাপড়ি ও দশটি পুংকেশর। পরে গাছে ধরে লম্বা ফল, যা দেখতে কিছুটা সজিনার মতো। ফল ও পাতা বানরের প্রিয় হওয়ায় অনেক এলাকায় এর নাম হয়েছে বান্দরলাঠি।
শুধু সৌন্দর্য নয়, ভেষজ গুণেও সোনালু গাছের রয়েছে আলাদা পরিচিতি। এর পাতা, বাকল, ফুল, বীজ ও মূল নানা ধরনের ভেষজ ব্যবহারে কাজে লাগে। লোকজ চিকিৎসায় ডায়রিয়া ও বহুমূত্রজনিত সমস্যায়ও এর ব্যবহার রয়েছে বলে জানা যায়।
একসময় গ্রামবাংলার মাঠ, পথ ও জনপদে সোনালু গাছ ছিল পরিচিত দৃশ্য। তবে সময়ের সঙ্গে এই গাছের সংখ্যা কমে এসেছে। ধীরে বেড়ে ওঠা এবং কাঠের বাণিজ্যিক মূল্য কম থাকায় নতুন করে সোনালু রোপণের আগ্রহও কম। ফলে প্রাকৃতিকভাবে টিকে থাকা গাছগুলোই এখন সৌন্দর্যের শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাটিরাঙ্গার সড়কপাড়ের এই সোনালু গাছগুলো তাই শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বরং জীববৈচিত্র্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সবুজ পাহাড়ের পটভূমিতে হলুদ সোনালুর এই দীপ্তি যেন পথচারীদের নীরবে মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতি এখনো তার সেরা রূপে বেঁচে আছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিদিনের যাতায়াতের ক্লান্তির মধ্যেও এই ফুলের দৃশ্য মনে আনে প্রশান্তি। অনেকেই চলার পথে কিছু সময় থেমে এই সৌন্দর্য উপভোগ করেন। কেউ ছবি তোলেন, কেউ শুধু দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকেন।
প্রকৃতিপ্রেমী ও পরিবেশকর্মীদের মতে, সোনালু কেবল শোভাবর্ধক গাছ নয়, এটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ। তাই সড়কের পাশে ও উন্মুক্ত জায়গায় আরও বেশি সোনালু গাছ রোপণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এতে যেমন প্রকৃতি আরও সমৃদ্ধ হবে, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মও দেখতে পাবে এই সোনালি সৌন্দর্য।
প্রতি / এডি / শাআ













