সাইকেলে পুরো তাইওয়ান ঘোরেন হাজারো মানুষ, কেন এত জনপ্রিয় এই ভ্রমণ?
তাইওয়ানে প্রতিবছর হাজারো মানুষ সাইকেল নিয়ে পুরো দ্বীপ ঘুরে দেখেন। স্থানীয়দের কাছে এটি শুধু ভ্রমণ নয়, বরং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অভিজ্ঞতা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশি পর্যটকদের মধ্যেও এই দীর্ঘ সাইকেলযাত্রার জনপ্রিয়তা বাড়ছে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাইকেলে দ্বীপ ঘোরার এই অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তাইওয়ানের এমন অনেক অঞ্চল, সংস্কৃতি ও মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায়, যেগুলো সাধারণ পর্যটন ভ্রমণে অনেকটাই অদেখা থেকে যায়।
তাইপেইয়ের সাইক্লিস্ট ইথানের কাছেও এই যাত্রা বিশেষ অর্থ বহন করে। তিনি কয়েকবার পুরো দ্বীপ সাইকেলে ঘুরেছেন। প্রতিবারই ভিন্ন পথ বেছে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তার মতে, তাইওয়ানের বৈচিত্র্য এত বেশি যে একই দ্বীপে বারবার গেলেও নতুন কিছু আবিষ্কারের সুযোগ থাকে।
‘হুয়ানদাও’ কেন এত জনপ্রিয়
তাইওয়ানে সাইকেলে পুরো দ্বীপ ঘুরে আসার এই যাত্রাকে বলা হয় ‘হুয়ানদাও’। চীনা ভাষায় শব্দটির অর্থ হলো দ্বীপ প্রদক্ষিণ করা।
সাধারণত তাইপেই থেকে যাত্রা শুরু করে ঘড়ির কাঁটার দিকে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আবার রাজধানীতে ফিরে আসেন অনেকে। এই দীর্ঘ পথে উত্তরের পাহাড়ি উপকূল, পূর্বাঞ্চলের নির্জন সড়ক, দক্ষিণের সৈকত এবং পশ্চিমের ব্যস্ত শহর অতিক্রম করতে হয়।
তবে হুয়ানদাও করতে গাড়ি বা মোটরসাইকেলও ব্যবহার করা যায়। তারপরও অনেক তাইওয়ানিজের কাছে সাইকেলে পুরো দ্বীপ ঘোরা যেন বড় হয়ে ওঠার একটি প্রতীকী অভিজ্ঞতা। অনেকে স্কুলজীবন কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার আগেই বন্ধুদের সঙ্গে এই যাত্রায় বের হন।
চলচ্চিত্র থেকে জনপ্রিয়তার বিস্তার
তাইওয়ানে দীর্ঘপথে সাইকেল চালানোর সংস্কৃতি নতুন নয়। কয়েক দশক ধরেই স্থানীয়দের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা রয়েছে। তবে ২০০৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘আইল্যান্ড এত্যুদ’ চলচ্চিত্রটি এই ধারণাকে আরও ব্যাপকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়।
ছবির গল্পে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর সাত দিনের সাইকেলযাত্রার মাধ্যমে তাইওয়ানের বিভিন্ন প্রান্ত তুলে ধরা হয়। ঐতিহাসিক স্থান, আদিবাসী সংস্কৃতি, গ্রামীণ জীবন এবং স্থানীয় মানুষের আতিথেয়তা তার ভ্রমণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
চলচ্চিত্রটির প্রভাবের পর অনেক তরুণ নিজেরাও সাইকেলে দ্বীপ ঘুরে দেখার পরিকল্পনা শুরু করেন। লক্ষ্য ছিল পরিচিত শহুরে জীবনের বাইরে গিয়ে নিজেদের দেশকে অন্যভাবে চেনা।
পরবর্তীতে ২০১৫ সালে তাইওয়ান সরকার এই বৃত্তাকার পথকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘তাইওয়ান সাইকেল রুট নম্বর ১’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর ফলে দীর্ঘ সাইকেল ভ্রমণের জন্য নির্দিষ্ট পথ ও অবকাঠামো আরও সুসংগঠিত হয়।
পূর্ব উপকূলে অন্য এক তাইওয়ান
হুয়ানদাওর অন্যতম আকর্ষণ পূর্ব উপকূল। দ্বীপটির উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে বড় বড় শহর এবং ঘনবসতি থাকলেও পূর্বাঞ্চল তুলনামূলকভাবে শান্ত ও দুর্গম।
পাহাড় ও সমুদ্রের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া সরু সড়ক, ঘন সবুজ বন এবং বিস্তৃত প্রশান্ত মহাসাগরের দৃশ্য এই পথকে আলাদা করে তুলেছে। এখানে আধুনিক নগরজীবনের পরিবর্তে গ্রামীণ পরিবেশ ও স্থানীয় সংস্কৃতির উপস্থিতি বেশি চোখে পড়ে।
তাইওয়ানের পূর্বাঞ্চলে আমিস, ট্রুকু ও পুয়ুমার মতো আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের বসবাস রয়েছে। তাদের খাবার, স্থাপত্য, নকশা, লোকগান ও সামাজিক ঐতিহ্য সাইকেলযাত্রার পথে পর্যটকদের সামনে আসে।
এই অঞ্চলের সঙ্গে দ্বীপটির পশ্চিম অংশের পার্থক্যও স্পষ্ট। দুর্গম পাহাড়ের কারণে পূর্বাঞ্চলে বড় শহর ও যোগাযোগব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে কম বিস্তৃত হয়েছে। ফলে এখানকার অনেক ঐতিহ্য ও জীবনধারা এখনো স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ধরে রেখেছে।
পথে মেলে স্থানীয় মানুষের আতিথেয়তা
হুয়ানদাও শুধু প্রকৃতি দেখার সুযোগ দেয় না, স্থানীয় মানুষের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগও তৈরি করে। পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় পারিবারিক অতিথিশালা ও ছোট আবাসন রয়েছে, যেখানে পর্যটকরা স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে মিশে থাকার সুযোগ পান।
দুলান এলাকার একটি অতিথিশালা পরিচালনা করেন আমিস সম্প্রদায়ের সদস্য সিলোকো আকিলা। তার মতে, হুয়ানদাও জনপ্রিয় হলেও অনেক পর্যটক এখনো পূর্বাঞ্চলের আদিবাসী সংস্কৃতিকে কাছ থেকে দেখার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেন না।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো এখানকার মানুষ। তাদের আন্তরিকতা, সহযোগিতার মানসিকতা ও অতিথিপরায়ণতা পর্যটকদের জন্য আলাদা অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
ভ্রমণকারীরা অনেক সময় স্থানীয়দের সঙ্গে বসে খাবার খান, গান শোনেন এবং তাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানেন। এভাবেই সাইকেলযাত্রা শুধু একটি শারীরিক অভিযান না থেকে সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।
দীর্ঘ যাত্রায় প্রকৃতির বৈচিত্র্য
পূর্ব উপকূল পেরিয়ে দক্ষিণে গেলে হুয়ানদাওর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য কেন্টিং। এটি তাইওয়ানের প্রাচীনতম জাতীয় উদ্যানগুলোর একটি। চিরসবুজ বন, সাদা বালুর সৈকত এবং বৈচিত্র্যময় প্রাণবৈচিত্র্যের কারণে অঞ্চলটি পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়।
পুরো যাত্রাপথে কখনো পাহাড়ি উতরাই, কখনো দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, আবার কখনো শহরের ব্যস্ত রাস্তা পাড়ি দিতে হয়। ফলে কয়েকশ কিলোমিটার পথ অতিক্রমের পরও অভিজ্ঞতাটি একঘেয়ে হয়ে ওঠে না।
তাইওয়ানের অনেক তরুণের কাছে এই যাত্রার গুরুত্ব শুধু দূরত্ব পাড়ি দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং ক্লান্তি, বৃষ্টি, পাহাড়ি পথ কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়া সামলে গন্তব্যে পৌঁছানো আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
৩০ বছর বয়সী ইয়াফান চ্যাং কিশোর বয়সে স্কুলের একটি ভ্রমণের অংশ হিসেবে প্রথমবার হুয়ানদাও করেছিলেন। পরবর্তীতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আবারও এই যাত্রায় বের হন। তার কাছে পুরো দ্বীপ ঘুরে দেখা ছিল নিজের দেশ ও নিজের শিকড়কে নতুনভাবে জানার একটি সুযোগ।
কেউ কেউ আবার সাইকেলের বদলে হেঁটেও পুরো দ্বীপ অতিক্রম করেছেন। তাদের যুক্তি, তাইওয়ানের প্রকৃতি এত বৈচিত্র্যময় যে ধীরে ধীরে চললেই এর সৌন্দর্য ভালোভাবে অনুভব করা যায়।
সব মিলিয়ে হুয়ানদাও তাইওয়ানে এখন কেবল একটি সাইকেলভ্রমণ নয়। প্রকৃতি, ইতিহাস, আদিবাসী সংস্কৃতি, স্থানীয় মানুষের আতিথেয়তা এবং নিজের সীমা পরীক্ষা করার অভিজ্ঞতা একসঙ্গে পাওয়ার কারণে হাজারো মানুষের কাছে এটি হয়ে উঠেছে স্মরণীয় এক যাত্রা।
প্রতি / এডি / শাআ


















